গান-কবিতার বাইরে চলচ্চিত্রেও নজরুল ছিলেন বহুমুখী এক স্রষ্টা
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য’—কাজী নজরুল ইসলামের এই বহুল উচ্চারিত পঙ্ক্তি যেন তাঁর সমগ্র শিল্পীসত্তারই প্রতিচ্ছবি। এক হাতে প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবতার বাঁশি; অন্য হাতে অন্যায়, শোষণ ও অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের তূর্য।
বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলকে আমরা প্রধানত কবি ও গীতিকার হিসেবেই চিনি। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল আরও অনেক বিস্তৃত। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সাংবাদিকতার পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তিনি ছিলেন এক অসাধারণ বহুমুখী শিল্পী।
চলচ্চিত্রে তিনি কখনো অভিনেতা, কখনো পরিচালক, কখনো কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার, আবার কখনো গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। এমনকি শিল্পীদের গান শেখানো, উচ্চারণ ঠিক করা এবং অভিনয়ের প্রস্তুতিতেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতেন। গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন তালিকায় দেখা যায়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০–২১টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
চলচ্চিত্রে নজরুলের প্রবেশ: শুধু গান নয়, সবকিছুতেই
ত্রিশের দশকে কলকাতার চলচ্চিত্রজগৎ তখন সবাক সিনেমার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। এই সময় পার্সি মালিকানাধীন ম্যাডান থিয়েটার্সে নজরুল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হন। ‘সুর ভাণ্ডারী’ বা ‘সুর ভাঙারি’ হিসেবে তাঁর কাজের মধ্যে ছিল চলচ্চিত্রের শিল্পীদের গান শেখানো, সুর ও উচ্চারণ ঠিক করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গান ও সংগীত নিয়ে কাজ করা।
অর্থাৎ, চলচ্চিত্রে নজরুলের ভূমিকা শুরু থেকেই কেবল ‘গান লিখে দেওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি সিনেমার দৃশ্য, চরিত্র, সংলাপ, গান ও অভিনয়—সবকিছুর সমন্বিত শিল্পরূপ নিয়ে তিনি ভাবতেন।
ম্যাডান থিয়েটার্সের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার সময় ‘জ্যোৎস্নার রাত’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘ঋষির প্রেম’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘চিরকুমারী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘কলঙ্ক ভঞ্জন’, ‘রাধাকৃষ্ণ’ ও ‘জয়দেব’-এর মতো চলচ্চিত্রের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়।
‘ধ্রুব’: একই সিনেমায় অভিনেতা, পরিচালক ও সুরকার
নজরুলের চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোর একটি ‘ধ্রুব’। গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে নির্মিত এই পৌরাণিক চলচ্চিত্রটি ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পায়। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির পরিচালনায় ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দে ও কাজী নজরুল ইসলাম, প্রযোজনা করেছিল পাইওনিয়ার ফিল্মস এবং সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল।
এই সিনেমায় নজরুল নিজেই অভিনয় করেন দেবর্ষি নারদ চরিত্রে।
আর এখানেই তাঁর অভিনবত্ব।
পুরাণের নারদকে সাধারণত জটাধারী, দীর্ঘ দাড়ি-গোঁফওয়ালা বয়স্ক ঋষি হিসেবে দেখানো হলেও নজরুলের নারদ ছিলেন তরুণ, সুদর্শন ও প্রাণবন্ত। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গলায় মালা, পরনে লম্বা পোশাক—পর্দায় তাঁর উপস্থিতি সে সময় দর্শকের কাছে ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।
তাঁর এই রূপ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল। কিন্তু নজরুল নিজের শিল্পীসত্তার ব্যাখ্যায় অনড় ছিলেন—তিনি নারদের ‘চিরতরুণ ও চিরসুন্দর’ রূপ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
‘ধ্রুব’-এর সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য
‘ধ্রুব’ শুধু নজরুলের অভিনয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; সংগীতের দিক থেকেও এটি অসাধারণ।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টি গানই নজরুল রচনা ও সুর করেন। তিনি নিজেও ছবিতে গান করেন।
অর্থাৎ একই চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন—
পরিচালক + অভিনেতা + গীতিকার + সুরকার + সংগীত পরিচালক + কণ্ঠশিল্পী।
বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগে একজন শিল্পীর এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই সঙ্গে পালন করা নিঃসন্দেহে নজরুলের অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ।
‘ধূপছায়া’: ক্যামেরার পেছনে নজরুল
‘ধ্রুব’-এর পাশাপাশি নজরুল নিজে ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এই ছবিতে তিনি দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রেও অভিনয় করেন। বিভিন্ন গবেষণামূলক সূত্রে ‘ধূপছায়া’কে নজরুলের পরিচালিত চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র গবেষকদের একাংশের মতে, নজরুলই ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলিম চলচ্চিত্র পরিচালক। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনার ইতিহাস শুধু নজরুল-গবেষণার জন্য নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম সবাক যুগেও নজরুল
বাংলা চলচ্চিত্র যখন সবাক যুগে প্রবেশ করছে, তখনও নজরুল সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন।
১৯৩১ সালে অমর চৌধুরী পরিচালিত ‘জামাইষষ্ঠী’ চলচ্চিত্রে তিনি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে ‘জলসা’ চলচ্চিত্রে নিজের গান গাওয়ার পাশাপাশি ‘নারী’ কবিতা আবৃত্তি করেন।
অর্থাৎ চলচ্চিত্রে শব্দের ব্যবহার যখন একেবারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তখন নজরুল সাহিত্য ও সংগীতের অভিজ্ঞতাকে সিনেমার নতুন ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছিলেন।
‘পাতালপুরী’: বাস্তব জীবন থেকে সিনেমার গান
১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন নজরুল। ছবির বিষয় ছিল কয়লাখনি অঞ্চলের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম।
নজরুলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করলে তিনি সেটিকে দূর থেকে কল্পনা করে থেমে থাকতেন না। বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করতেন।
‘পাতালপুরী’র ক্ষেত্রেও কয়লাখনি অঞ্চলের জীবন সম্পর্কে জানতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকসংগীতের আবহ, বিশেষ করে ঝুমুরের সুর, তাঁর সৃষ্টিতে জায়গা করে নেয়।
এই প্রবণতা থেকেই বোঝা যায়, নজরুলের চলচ্চিত্রসংগীত ছিল কেবল স্টুডিওনির্ভর নয়; তিনি পরিবেশ, মানুষ ও জীবন থেকে সংগীতের উপাদান সংগ্রহ করতেন।
‘গ্রহের ফের’, ‘গৃহদাহ’ থেকে ‘বিদ্যাপতি’
চলচ্চিত্রে নজরুলের কাজের পরিধি দ্রুত বাড়তে থাকে।
‘গৃহদাহ’-এ তিনি সুরকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের সংগীতের সঙ্গে রাইচাঁদ বড়ালও যুক্ত ছিলেন।
১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’-এও নজরুল সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে কাজ করেন।
কিন্তু একই সময়ের ‘বিদ্যাপতি’ তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের আরেকটি বড় অধ্যায়।
‘বিদ্যাপতি’: সাহিত্য, ইতিহাস ও সংগীতের মেলবন্ধন
মধ্যযুগের মৈথিলি কবি বিদ্যাপতির জীবন ও কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে দেবকী বসুর পরিচালনায় নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’।
ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির গল্পের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের নাম যুক্ত; চিত্রনাট্য/স্ক্রিনপ্লেতে দেবকী বসুর সঙ্গে তাঁরও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
ছবিটিতে অভিনয় করেন পাহাড়ি সান্যাল, কানন দেবী, ছায়া দেবী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়সহ সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা। ছবিটি বাংলা ও হিন্দি-দুই ভাষাতেই নির্মিত হয়।
‘বিদ্যাপতি’র সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কবিতা ও সংগীতকে গল্প বলার অংশ করে তোলা। বিদ্যাপতির পদাবলির আবেগ, প্রেম ও ভক্তিকে চলচ্চিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নজরুলের সাহিত্যিক ও সংগীতবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলা সংস্করণ সফল হওয়ার পর হিন্দি সংস্করণও নির্মিত হয়। ফলে নজরুলের সৃষ্টিশীলতা বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছেও পৌঁছে যায়।
‘গোরা’: রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে নজরুলের ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পান নজরুল।
এখানে ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা।
ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের ধরন নিয়ে আপত্তি উঠলে নজরুল সরাসরি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কবিগুরু তাঁকে সমর্থন করেন এবং তাঁর গান ব্যবহারের ক্ষেত্রে নজরুলের সংগীতবোধের ওপর আস্থা রাখেন।
এই ঘটনা শুধু নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের পারস্পরিক শ্রদ্ধার উদাহরণ নয়; বাংলা সংস্কৃতির দুই প্রধান স্রষ্টার মধ্যে সৃজনশীল স্বাধীনতা ও পারস্পরিক আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও এটি স্মরণীয়।
‘সাপুড়ে’: গবেষণা করে সিনেমার গল্প
১৯৩৯ সালের ‘সাপুড়ে’ নজরুলের চলচ্চিত্রজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ছবিটির গল্পের সঙ্গে নজরুলের নাম যুক্ত এবং পরিচালনা করেন দেবকী বসু। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভও ছবিটির গল্পের কৃতিত্ব নজরুলকে দিয়েছে।
এই ছবির জন্য নজরুল বেদে সম্প্রদায়ের জীবন সম্পর্কে কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি কিছু সময় বেদে দলের সঙ্গে থেকেছেন—এমন তথ্য বিভিন্ন জীবনী ও চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখায় পাওয়া যায়।
এখানেও তাঁর কাজের ধরনটি লক্ষ করার মতো।
তিনি আগে জীবনকে দেখেছেন, তারপর সেটিকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন।
‘মদিনা’: অসুস্থতার কারণে থেমে গেল এক অসমাপ্ত স্বপ্ন
চলচ্চিত্রে নজরুলের সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায়গুলোর একটি ‘মদিনা’।
১৯৪১-৪২ সালের দিকে এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, গান, সুর ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ছবিটির জন্য প্রায় ১৫টি গান লেখার কথাও জানা যায়।
কিন্তু ১৯৪২ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নজরুল। তাঁর অসুস্থতার কারণে ‘মদিনা’ আর মুক্তির আলো দেখতে পারেনি।
এ যেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া একটি সম্ভাবনা—নজরুলের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র-স্বপ্নের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়।
‘চৌরঙ্গী’ ও ‘দিলরুবা’
১৯৪২ সালে ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন নজরুল। পরবর্তী হিন্দি সংস্করণের জন্যও তাঁর লেখা গান ব্যবহৃত হয়।
‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গেও গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততার উল্লেখ পাওয়া যায়।
এ সময়ের কাজগুলো দেখলে বোঝা যায়, অসুস্থতার আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিল।
চলচ্চিত্র ব্যবসাতেও নজরুল
শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রের প্রযোজনা ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও নজরুল প্রবেশ করেছিলেন।
১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বেরসহ আরও অনেকে।
অর্থাৎ নজরুল শুধু সিনেমার সৃজনশীল দিক নয়, চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়েও ভাবছিলেন।
নজরুলের চলচ্চিত্রযাত্রা কতটা বিস্তৃত ছিল?
নজরুলের সঙ্গে যুক্ত চলচ্চিত্রের সঠিক সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণামূলক তালিকা মিলিয়ে দেখা যায়, তিনি প্রায় ২০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
- জলসা
- ধূপছায়া
- প্রহ্লাদ
- বিষ্ণুমায়া
- ধ্রুব
- পাতালপুরী
- গ্রহের ফের
- বিদ্যাপতি (বাংলা ও হিন্দি)
- গোরা
- নন্দিনী
- সাপুড়ে
- সাপেড়া
- চৌরঙ্গী
- দিকশূল
- অভিনয় নয়সহ আরও কিছু চলচ্চিত্র।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে প্রায় ৫০টি নজরুলগীতি ব্যবহৃত হয়েছিল।
পর্দায় নজরুলের গান: মৃত্যুর পরও অমলিন
১৯৭৬ সালে নজরুলের জীবনাবসান হলেও চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি শেষ হয়নি। বরং তাঁর গান ও সাহিত্যকর্ম পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বারবার আকৃষ্ট করেছে।
‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’-তে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর ব্যবহার দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
‘লায়লা-মজনু’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রেও তাঁর গান ব্যবহৃত হয়েছে।
নজরুলের গান চলচ্চিত্রে শুধু ‘গান’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; অনেক সময় তা চরিত্রের আবেগ, দৃশ্যের নাটকীয়তা এবং গল্পের বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।
নজরুলের গল্প-উপন্যাসও উঠেছে বড় পর্দায়
শুধু গান নয়, তাঁর সাহিত্যও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
২০০৬ সালে নজরুলের গল্প ‘মেহের নেগার’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। মৌসুমী ও ফেরদৌস অভিনীত এই ছবিটি নজরুলের গল্পকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
এ ছাড়া তাঁর ‘রাক্ষসী’, ‘জ্বিনের বাদশাহ’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
শিশুদের জন্য তাঁর ‘লিচু-চোর’ ও ‘খুকী ও কাঠবেরালি’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হারিয়ে যাচ্ছে ‘ধ্রুব’-চলচ্চিত্র সংরক্ষণেও এক বড় ক্ষতি
নজরুলের চলচ্চিত্র-ঐতিহ্যের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়গুলোর একটি হলো তাঁর পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘ধ্রুব’-এর সংরক্ষণ।
মূল ছবিটি ছিল সাদা-কালো ৩৫ মিমি চলচ্চিত্র। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রটির মূল নেগেটিভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণ ছবি আর সহজলভ্য নেই; কেবল কিছু অংশ টিকে থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
এটি শুধু নজরুল-গবেষকদের জন্য নয়, উপমহাদেশের চলচ্চিত্র-ইতিহাসের জন্যও বড় ক্ষতি। কারণ ‘ধ্রুব’ আমাদের জানায়—বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগেই একজন কবি কীভাবে একই সঙ্গে পরিচালক, অভিনেতা ও সংগীতস্রষ্টার ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কেন চলচ্চিত্রের নজরুল এত গুরুত্বপূর্ণ?
নজরুলের চলচ্চিত্রকর্মকে শুধু তাঁর জীবনের একটি ‘অতিরিক্ত অধ্যায়’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন—
প্রথমত, সাহিত্য ও সংগীতকে দৃশ্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, পৌরাণিক কাহিনি থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের জীবন—বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করেছিলেন।
তৃতীয়ত, লোকসংগীত ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে চলচ্চিত্রের সংগীতে ব্যবহার করেছিলেন।
চতুর্থত, বাস্তব জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গল্প ও সংগীত নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন।
পঞ্চমত, অভিনয়, পরিচালনা ও সংগীত—তিনটি ক্ষেত্রেই নিজেকে পরীক্ষা করেছিলেন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি চলচ্চিত্রকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করেননি। একজন মুসলিম কবি হয়েও তিনি হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক ‘ধ্রুব’-তে নারদ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তার গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় তাঁর সামগ্রিক মানবতাবাদী দর্শনেরই প্রতিফলন।
কবির পরিচয়ের বাইরে যে নজরুলকে আমরা কম দেখি
কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা বিদ্রোহী কবি বলি, প্রেমের কবি বলি, সাম্যের কবি বলি। তাঁকে গানের স্রষ্টা হিসেবেও জানি। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নজরুল ছিলেন আরও অনেক কিছু।
তিনি ছিলেন অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, প্রশিক্ষক এবং প্রযোজনা-উদ্যোক্তা।
আর তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—তিনি কোনো একটি পরিচয়ে নিজেকে আটকে রাখেননি।
তাঁর অস্থিরতা ছিল সৃষ্টির অস্থিরতা। নতুন কিছু করার তাগিদ তাঁকে কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো মঞ্চে, আবার কখনো ক্যামেরার সামনে কিংবা পেছনে নিয়ে গেছে।
তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নজরুলকে শুধু ‘চলচ্চিত্রের গীতিকার’ হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিশাল একটি অংশ অদেখাই থেকে যায়।
বরং তাঁকে দেখা উচিত বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগের একজন বহুমুখী, নিরীক্ষাপ্রবণ ও আধুনিক চিন্তার শিল্পী হিসেবে—যিনি কবিতার শব্দ, গানের সুর, অভিনয়ের শরীর এবং ক্যামেরার ভাষাকে একই সৃষ্টিশীল জগতে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
নজরুলের বাঁশরী যেমন প্রেমের কথা বলেছে, তাঁর রণ-তূর্য যেমন বিদ্রোহের ডাক দিয়েছে—তেমনি তাঁর চলচ্চিত্রকর্মও বাংলা সংস্কৃতির বহুত্ব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array