দেবদাস থেকে শ্রীকান্ত, ১৫০ বছরেও কেন ফুরোয়নি শরৎচন্দ্রর গল্প?
দেবদাস প্রেমে ব্যর্থ হন, পার্বতীকে হারান। শ্রীকান্ত পথে বেরিয়ে পড়েন, ললিতা আবার দাঁড়ান শেখরের সামনে। সময় বদলায়, পর্দার ভাষা বদলায়, অভিনেতাদের মুখ বদলে যায়—কিন্তু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প যেন শেষ হয় না।
দেবদাস কখনো প্রমথেশ বড়ুয়া, কখনো কুন্দনলাল সায়গল, দিলীপ কুমার, শাহরুখ খান কিংবা শাকিব খান। পার্বতীর চরিত্রেও এসেছেন যমুনা বড়ুয়া, সুচিত্রা সেন, কবরী, ঐশ্বরিয়া রাই ও অপু বিশ্বাস। ‘পরিণীতা’র ললিতা হয়েছেন মীনা কুমারী, অঞ্জনা, মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় ও বিদ্যা বালান। অর্থাৎ মুখ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রগুলো হারিয়ে যায়নি।
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭৬ সালের এই দিনে হুগলির দেবানন্দপুরে জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই কথাশিল্পী। প্রেম, বিরহ, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অবস্থান, পারিবারিক টানাপোড়েন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সহজ ভাষায় গল্পে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
সম্ভবত এ কারণেই চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই নির্মাতারা বারবার ফিরে গেছেন শরৎচন্দ্রের কাছে। ‘দেবদাস’, ‘পরিণীতা’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দত্তা’, ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘পথের দাবী’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘মেজদিদি’সহ তাঁর বহু রচনা সিনেমা ও পরবর্তী সময়ে ওয়েব সিরিজে রূপ পেয়েছে।
সিনেমার শুরুতেই শরৎচন্দ্র
শরৎচন্দ্রের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল সবাক সিনেমারও আগে। ১৯২৮ সালে নরেশ মিত্র ‘দেবদাস’কে নির্বাক চলচ্চিত্রে রূপ দেন। এরপর ১৯৩১ সালে আসে ‘দেনা-পাওনা’। বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগেই শরৎচন্দ্র হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের অন্যতম নির্ভরতার জায়গা।
১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়া নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’। বাংলায় দেবদাসের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি নিজেই। একই বছর হিন্দি সংস্করণেও দেবদাস হন কুন্দনলাল সায়গল। এরপর গল্পটি বাংলা-হিন্দির গণ্ডি পেরিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে।
যে দেবদাসের মৃত্যু নেই
উপন্যাসে দেবদাসের মৃত্যু হয়েছে বহু আগেই। কিন্তু সিনেমার পর্দায় তাঁর মৃত্যু নেই। এক প্রজন্মের দেবদাস বিদায় নিয়েছেন, আরেক প্রজন্মে অন্য অভিনেতা এসে চরিত্রটির নতুন রূপ দিয়েছেন।
১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের ‘দেবদাস’-এ নামভূমিকায় দিলীপ কুমার। পার্বতী সুচিত্রা সেন, চন্দ্রমুখী বৈজয়ন্তীমালা। সংযত অভিনয় ও বিষণ্ন আবহে তৈরি এই ছবি দেবদাস চরিত্রকে নতুন মাত্রা দেয়। ছবিটির জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কারও পান দিলীপ কুমার।
প্রায় পাঁচ দশক পর ২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালি আবার ফিরিয়ে আনেন ‘দেবদাস’। এবার দেবদাস শাহরুখ খান, পার্বতী ঐশ্বরিয়া রাই এবং চন্দ্রমুখী মাধুরী দীক্ষিত। বিমল রায়ের সংযত বিষণ্নতার বদলে বানসালির ছবিতে দেখা যায় বিশাল সেট, ঝলমলে পোশাক, গান ও নাচের জমকালো আয়োজন।
এর সাত বছর পর অনুরাগ কশ্যপের ‘দেব.ডি’ একই গল্পকে নিয়ে যায় সমকালীন ভারতের বাস্তবতায়। অভয় দেওলের দেব হয়ে ওঠে আধুনিক শহুরে তরুণ, পারো ও চন্দাও পায় নতুন পরিচয়।
বাংলাদেশেও ‘দেবদাস’ দুইবার বড় পর্দায় এসেছে। ১৯৮২ সালে চাষী নজরুল ইসলামের ছবিতে দেবদাস ছিলেন বুলবুল আহমেদ, পার্বতী কবরী এবং চন্দ্রমুখী আনোয়ারা। তিন দশকের বেশি সময় পর ২০১৩ সালে একই পরিচালক আবার নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’। এবার দেবদাস শাকিব খান, পার্বতী অপু বিশ্বাস ও চন্দ্রমুখী মৌসুমী।
তাই ‘দেবদাস’-এর ইতিহাস শুধু একটি উপন্যাসের বারবার চলচ্চিত্রায়ণের ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি প্রজন্ম কীভাবে একই গল্পকে নিজেদের সময়ের মতো করে নিয়েছে, তারও ইতিহাস।
ললিতাও বদলেছেন, গল্প বদলায়নি
শরৎচন্দ্রের ‘পরিণীতা’ও বারবার ফিরেছে পর্দায়। ১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের হিন্দি ছবিতে ললিতা হন মীনা কুমারী, শেখর অশোক কুমার। পরে বাংলা ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও চরিত্রটি নতুন রূপ পেয়েছে।
২০০৫ সালে প্রদীপ সরকারের ‘পরিণীতা’য় ললিতা হন বিদ্যা বালান। পুরোনো কলকাতার আবহে শরৎচন্দ্রের গল্প নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে আবার পৌঁছে যায়।
ললিতার বয়স যেন বাড়ে না—শুধু তাঁকে পর্দায় ধারণ করা অভিনেত্রীরা বদলে যান।
উত্তম-সুচিত্রার শরৎচন্দ্র
বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় জুটি উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনও একাধিকবার শরৎচন্দ্রের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
‘চন্দ্রনাথ’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘গৃহদাহ’ ও ‘কমললতা’য় তাঁদের দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ও চরিত্রে। ফলে শরৎচন্দ্রের গল্পে তাঁদের জনপ্রিয় রোমান্টিক জুটির পরিচিত রূপের বাইরে আরও পরিণত ও জটিল সম্পর্কও দর্শক দেখেছেন।
উত্তমকুমারের শরৎচন্দ্র-যাত্রায় ‘সব্যসাচী’ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে তিনি প্রেমিক নায়ক নন, বিপ্লবী সব্যসাচী।
৭২ বছর পরও ফিরে এলেন বিজয়া
শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ও দীর্ঘ সময় ধরে পর্দায় ফিরে এসেছে। ১৯৫১ সালে প্রথম চলচ্চিত্ররূপের পর ১৯৭৬ সালে অজয় কর নির্মাণ করেন নতুন ‘দত্তা’; বিজয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন।
এরও প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ২০২৩ সালে আবার ‘দত্তা’ নির্মিত হয়। এবার বিজয়া চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।
অর্থাৎ ১৯৫১ থেকে ২০২৩—৭২ বছরের ব্যবধানে একই চরিত্র নতুন অভিনেত্রী, নতুন নির্মাতা ও নতুন দর্শকের সামনে হাজির হয়েছে।
শ্রীকান্তের পথচলাও থামেনি
শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ যেন নিজেই এক দীর্ঘ যাত্রা। রাজলক্ষ্মী, অন্নদাদিদি, অভয়া, কমললতা—একেক পর্বে একেক সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন শ্রীকান্ত।
১৯৫৮ সালে ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-এ উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন এই চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’, ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’, ‘কমললতা’সহ একাধিক চলচ্চিত্রে শ্রীকান্তের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশেও ১৯৮৭ সালে বুলবুল আহমেদের পরিচালনায় ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ নির্মিত হয়। শ্রীকান্তের ভূমিকায় ছিলেন বুলবুল আহমেদ, রাজলক্ষ্মী শাবানা।
২০০৪ সালে অঞ্জন দাস নির্মাণ করেন ‘ইতি শ্রীকান্ত’। পরে এই চরিত্র সিনেমা পেরিয়ে পৌঁছে যায় টেলিভিশন ও ওটিটিতেও।
ওটিটিতেও নতুন শরৎচন্দ্র
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যুগেও শরৎচন্দ্রের গল্প থেমে নেই। বরং নতুন নির্মাতারা অনেক সময় মূল গল্পকে হুবহু অনুসরণ না করে চরিত্র ও সম্পর্কগুলোকে সমকালীন জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন।
‘চরিত্রহীন’ ওয়েব সিরিজে শতবর্ষের বেশি পুরোনো গল্প নতুন প্রজন্মের ভাষা পেয়েছে। একইভাবে ‘শ্রীকান্ত’ও ওটিটিতে এসে সমকালীন সময়ের মানুষের গল্পে রূপ নিয়েছে। ফলে শরৎচন্দ্র এখন শুধু অতীতের সাহিত্যিক নন; তাঁর চরিত্রগুলো নতুন সময়ের সঙ্গেও কথা বলছে।
কেন ফুরোয় না শরৎচন্দ্র?
শরৎচন্দ্রের গল্প বারবার পর্দায় ফিরে আসার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত তাঁর চরিত্রগুলোর মানবিক সংকট।
প্রেম আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে অভিমান। সম্পর্ক আছে, কিন্তু আছে সামাজিক বাধা। ভালোবাসা আছে, কিন্তু আছে আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার দ্বন্দ্ব আছে। সমাজ বদলেছে, জীবনযাপন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু মানুষের এই অনুভূতিগুলো বদলায়নি।
এ কারণেই দেবদাসকে আজকের দর্শকও বুঝতে পারেন। ললিতার অভিমান আজও অচেনা নয়। রাজলক্ষ্মীর আত্মপরিচয়ের লড়াই, বিজয়ার আত্মমর্যাদা কিংবা অচলার মানসিক দ্বন্দ্বও নতুন প্রজন্মের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়নি।
শরৎচন্দ্রের গল্পের শক্তি এখানেই—সময়ের সঙ্গে তার বাইরের পৃথিবী বদলালেও ভেতরের মানুষটি বদলায় না।
দেড় শ বছরেও পর্দা ছাড়েননি
১৮৭৬ সালে জন্ম, ১৯৩৮ সালে মৃত্যু। অথচ শরৎচন্দ্রের চরিত্রেরা এখনো জীবন্ত। ১৯২৮ সালের নির্বাক ‘দেবদাস’ থেকে ২০২৩ সালের ‘দত্তা’, সিনেমা হল থেকে টেলিভিশন, কম্পিউটার থেকে স্মার্টফোন—মাধ্যম বদলেছে, বদলেছে দর্শকও।
বদলেছে দেবদাসের মুখ, পার্বতীর মুখ, ললিতার মুখ, শ্রীকান্তের মুখ। কিন্তু তাঁদের প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা, অভিমান ও আত্মমর্যাদার গল্প রয়ে গেছে।
দেড় শ বছর পরও তাই শরৎচন্দ্র পর্দা ছাড়েননি। বরং প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তাঁকে নিজেদের মতো করে নতুন করে আবিষ্কার করছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array