খুঁজুন
                               
, ,
           

বাংলার আকাশে জে-১০সি-ই: ঢাকার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ায় কেন অস্বস্তি দিল্লিতে?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
বাংলার আকাশে জে-১০সি-ই: ঢাকার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ায় কেন অস্বস্তি দিল্লিতে?

বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। চীন থেকে ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান জে-১০সি-ই কেনার বিষয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে চুক্তির খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সম্ভব না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এসব যুদ্ধবিমান বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যুক্ত হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি জে-১০সি-ই কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা, মূল্য, অস্ত্র প্যাকেজ ও সরবরাহের সময়সূচি চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ শুধু নতুন যুদ্ধবিমান কেনার কারণে নয়; বরং দীর্ঘ বিরতির পর বিমানবাহিনীতে আধুনিক মাল্টিরোল কমব্যাট প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কারণেও। সর্বশেষ ২০০০ সালে রাশিয়া থেকে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করেছিল বাংলাদেশ।

কেন জে-১০সি-ই?
একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে শুধু বিমানটির দাম নয়—রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা, সেন্সর, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অস্ত্র প্যাকেজ মিলিয়ে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হয়। এই জায়গায় জে-১০সি-ই বাংলাদেশের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তুলনামূলক কম ব্যয়ে একটি আধুনিক মাল্টিরোল প্ল্যাটফর্ম, সক্রিয় ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে বা এইএসএ রাডার এবং দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের বিদ্যমান যুদ্ধবিমান বহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হতে পারে। অন্যদিকে, ইউরোফাইটার টাইফুন বা রাফালের মতো পশ্চিমা প্ল্যাটফর্মের ক্রয় ও পরিচালন ব্যয় সাধারণত বেশি। ফলে বাংলাদেশের মতো সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেটের দেশের জন্য শুধু ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ বিমান নয়, বরং দাম, সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই জে-১০সি-ইকে সম্ভাব্য একটি ‘কস্ট-ইফেকটিভ’ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২৬ বছর পর নতুন মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে বর্তমানে মিগ-২৯ ও ইয়াক-১৩০-এর পাশাপাশি বিভিন্ন পুরোনো এফ-৭ সিরিজের যুদ্ধবিমান রয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু যুদ্ধবিমানের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। একটি কার্যকর বিমানবাহিনীর জন্য প্রয়োজন আধুনিক রাডার, ডেটা-লিংক, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমন্বিত কমান্ড ও কন্ট্রোল আল্লাহ কাঠামো। জে-১০সি-ই সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে এই সক্ষমতার একটি নতুন স্তর তৈরি হতে পারে। এটি তাই শুধু নতুন একটি ফাইটার স্কোয়াড্রন সংযোজন নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামো আধুনিকায়নের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তাহলে ভারতের উদ্বেগ কোথায়?
ঢাকা যদি নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত করার জন্য যুদ্ধবিমান কেনে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—এতে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি ভূরাজনীতির দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা ও সামরিক পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত, বঙ্গোপসাগর এবং ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলকে ঘিরে যেকোনো সামরিক সক্ষমতার পরিবর্তন ভারতীয় কৌশলবিদদের নজরে আসা স্বাভাবিক।

জে-১০সি-ই যদি দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধের জন্য উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রসহ বাংলাদেশে যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশকারী যেকোনো বিমানকে মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের আকাশসীমাকে ঘিরে সামরিক হিসাবও কিছুটা পরিবর্তিত হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান নিচ্ছে। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আক্রমণাত্মক নীতি—দুটি এক বিষয় নয়।

পিএল-১৫ : উদ্বেগের অন্যতম কারণ?
জে-১০সি-ই নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে চীনের পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম। দূরপাল্লার এই এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলকে আধুনিক আকাশযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর উপস্থিতি একটি যুদ্ধবিমানের ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ বা বিভিআর যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের বিমানকে চোখে দেখার আগেই শনাক্ত, ট্র্যাক এবং আক্রমণের সক্ষমতা আধুনিক আকাশযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের হাতে এমন সক্ষমতা এলে দেশের আকাশসীমা রক্ষার ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন হবে। একই সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোর সামরিক পরিকল্পনাতেও নতুন হিসাব যুক্ত হতে পারে।

ভারতের তেজাস কি বিকল্প হতে পারত?
ভারতের জন্য আরেকটি প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ যদি আধুনিক যুদ্ধবিমান কিনতেই চায়, তাহলে ভারতীয় তেজাস কেন নয়? তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি সম্ভাব্য বিকল্প। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধবিমান বিক্রি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহের সময়সূচি, অস্ত্র ও সেন্সর প্যাকেজ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রেতার আস্থাও বড় বিষয়। ভারত নিজেই তেজাসের উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে দ্রুত বড় সংখ্যায় যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা কতটা বাস্তবসম্মত—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর বিপরীতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। ফলে নতুন চীনা যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বিদ্যমান কাঠামো কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে।

চীন-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় একটি অংশ বহু বছর ধরে চীন থেকে এসেছে। যুদ্ধবিমান, নৌযান, সাবমেরিন ও স্থলবাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। এই বাস্তবতায় জে-১০সি-ই যুক্ত হলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চীনা প্রযুক্তির উপস্থিতি আরও গভীর হবে। এখানেই ভারতের কৌশলগত উদ্বেগের জায়গাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু ২০টি যুদ্ধবিমানের হিসাব নয়। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক কতটা গভীর হচ্ছে। কারণ, ভারত ও চীনের নিজেদের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে ভারতের প্রতিবেশী কোনো দেশে চীনা সামরিক প্রযুক্তির বড় ধরনের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লির কৌশলগত পর্যবেক্ষণের বিষয় হতে পারে।

বঙ্গোপসাগরের সমীকরণেও কি পরিবর্তন আসবে?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে। ফলে বাংলাদেশের বিমান ও নৌ সক্ষমতা বাড়লে এর প্রভাব শুধু স্থলভিত্তিক আকাশসীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নজরদারির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে ২০টি জে-১০সি-ই দিয়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ভারতের সামরিক আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অতিরঞ্জিত হবে। বরং বলা যায়, এটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতা বা ডিটারেন্স বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা। একটি ছোট বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া—আকাশসীমা লঙ্ঘন বা সামরিক চাপ প্রয়োগের মূল্য দিতে হবে।

ইউরোফাইটার থেকে জেএফ-১৭—বিকল্প ছিল একাধিক
বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনায় শুধু জে-১০সি-ই নয়, বিভিন্ন সময়ে ইউরোফাইটার টাইফুন ও পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডারের কথাও এসেছে। ইউরোফাইটার টাইফুন প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত সক্ষম একটি প্ল্যাটফর্ম হলেও এর ক্রয়, অস্ত্র প্যাকেজ, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাংলাদেশের জন্য বড় বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। অন্যদিকে, জেএফ-১৭ তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও সক্ষমতার দিক থেকে জে-১০সি-ইয়ের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে বিষয়টি আরও জটিল। ফলে ঢাকার সামনে প্রশ্নটি শুধু ‘কোন বিমান ভালো?’ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—কোন বিমান বাংলাদেশের বাজেটের মধ্যে থেকে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সুবিধা দিতে পারবে? এই হিসাবেই জে-১০সি-ই এগিয়ে থাকলে সেটি বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তববাদী পছন্দ হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ যুদ্ধবিমান কেনা নয়
তবে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার পরই একটি দেশের বিমানবাহিনী আধুনিক হয়ে যায় না। জে-১০সি-ইয়ের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে আধুনিক বিভিআর মিসাইল, প্রশিক্ষিত পাইলট, গ্রাউন্ড ক্রু, সিমুলেটর, রাডার, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, ডেটা-লিংক, হ্যাঙ্গার ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে আধুনিক যুদ্ধবিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে লাইফ-সাইকেল কস্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিমান কেনার প্রাথমিক মূল্য কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে খুচরা যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিন, রক্ষণাবেক্ষণ, আপগ্রেড ও প্রশিক্ষণের খরচ বড় অঙ্কে দাঁড়াতে পারে। তাই ২০টি বিমান কেনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সেগুলোকে আগামী দুই-তিন দশক কার্যকর রাখার সক্ষমতা তৈরি করা।

ভারতের উদ্বেগ—স্বাভাবিক, কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্তও সার্বভৌম
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থ জড়িত। তাই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এলে ভারতের কৌশলগত মহলে আলোচনা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই উদ্বেগকে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মৌলিক যুক্তি হওয়া উচিত—কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন নয়, বরং নিজস্ব আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি করা। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই নীতির সঙ্গে আধুনিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই।

জে-১০সি-ই কতটা বদলে দেবে বাংলাদেশের আকাশ?
বাংলাদেশ সত্যিই যদি ২০টি জে-১০সি-ই সংগ্রহ করে, তাহলে এটি দেশের সামরিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হবে। তবে এর গুরুত্ব শুধু যুদ্ধবিমানের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এই ক্রয়ের আসল তাৎপর্য হবে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে একটি আধুনিক নেটওয়ার্ক সেন্ট্রিক এয়ার কমবেট কাঠামোর দিকে কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়, তার ওপর। অন্যদিকে, ভারতের জন্য এটি হয়তো নতুন কৌশলগত বাস্তবতা। বিশেষ করে বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হলে দিল্লিকে তার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন কিছু হিসাব যোগ করতে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি ভিন্ন—নিজের আকাশসীমা রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়; এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা প্রয়োজন। জে-১০সি-ই তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান নয়। এটি হতে পারে দীর্ঘ ২৬ বছরের বিরতির পর দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

কালের আলো/এম/এএইচ

শীতের আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত চান্দিনার কৃষকরা

কুমিল্লা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
শীতের আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত চান্দিনার কৃষকরা

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লার চান্দিনায় আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। মৌসুমের শুরুতে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় টমেটোসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষে ঝুঁকছেন তারা। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ চারা রোপণ করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত রয়েছেন পরিচর্যায়। তবে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাদের।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি বছর চান্দিনায় ১ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ৪৩ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৫৮ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে।

উপজেলার এতবারপুর, বাড়েরা, মাইজখার, চিলোড়া, এওয়াজবন্দ ও পূর্ব অম্বরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠজুড়ে এখন কৃষকদের কর্মব্যস্ততা। টমেটো, শিম, ফুলকপি ও বাঁধাকপির আবাদে বেশি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে জমিতে নেমে পড়ছেন পরিচর্যার কাজে।

কৃষকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। এ সময় সরবরাহ কম থাকায় চাহিদাও বেশি থাকে। ফলে উৎপাদন ভালো হলে লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে আসতে শুরু করবে এসব সবজি। তবে বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাদের।

বাড়েরা ইউনিয়নের চিলোড়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, এ বছর তিনি ২৫২ শতক জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে লাভবান হওয়ার আশা করছেন তিনি। তবে সার ও কীটনাশকের দাম নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

টমেটোচাষি আবুল খায়ের বলেন, প্রতি শতকে টমেটো উৎপাদনে আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। ফলন ভালো হলে প্রতি শতকের উৎপাদিত ফসল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হতে পারে। তবে পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিলে লাভের পরিমাণ খুব সামান্য থাকতে পারে।

কেরণখাল ইউনিয়নের পূর্ব অম্বরপুর গ্রামের কৃষক তাজুল গাজী বলেন, ১২০ শতক জমিতে টমেটো চাষ করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ফসলের অবস্থা ভালো। গত বছরের তুলনায় এবার আগেই জমি প্রস্তুত করতে পেরেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।

পূর্ব মাইজখার গ্রামের কৃষক শরীফ মোল্লা বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আগাম শীতকালীন সবজি দ্রুত বাজারে আসবে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি হচ্ছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন।

চান্দিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, আগাম শীতকালীন সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ আবাদ বাড়ছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত হিলির কৃষকরা

দিনাজপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত হিলির কৃষকরা

গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় দিনাজপুরের হিলিতে আগাম জাতের আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে বাড়তি আয়ের আশায় আলু রোপণ করছেন তারা। অনুকূল আবহাওয়ায় ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বীজ, সার, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে হিলির খট্টামাধবপাড়া এলাকায় আগাম আলুর আবাদ শুরু হয়। আমন ধান কাটার পর জমি প্রস্তুত করে আলু রোপণ করেন কৃষকরা। এ সময়ে বাজারে অন্যান্য আলুর সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় আগাম জাতের আলু ভালো দামে বিক্রির সুযোগ থাকে। তবে গত বছর প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষককে লোকসান গুনতে হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার আগেভাগেই জমি প্রস্তুত করে চাষাবাদ শুরু করেছেন তারা।

কৃষকরা জানান, গত বছর ৮০০ টাকায় কেনা আলুবীজের দাম এবার বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। এর পাশাপাশি সার, জ্বালানি তেল ও কৃষিশ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বাড়ছে। ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে এবারও লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

এদিকে আগাম আলু রোপণকে ঘিরে এলাকায় কৃষিশ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। আমন ধান কাটার পর জমি প্রস্তুত, আলু রোপণ ও পরিচর্যার কাজে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারের সুযোগ পাচ্ছেন শ্রমিকরা।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম জানান, গত সপ্তাহ থেকে উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে আলু রোপণ করা হয়েছে। এ জাতের আলু ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে উত্তোলন করা যায়। কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চাষাবাদ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষকদের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন তারা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

পর্যটনের শহর কক্সবাজারে নিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিতে পর্যটকের জীবন

কক্সবাজার সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
পর্যটনের শহর কক্সবাজারে নিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিতে পর্যটকের জীবন

আগুনে প্রাণহানি, পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, সৈকতে ছিনতাই ও ডুবে মৃত্যু; অনুমোদনহীন স্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর ৮০ থেকে ৯০ লাখ পর্যটক ছুটে আসেন কক্সবাজারে। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড় আর নীল জলরাশির আকর্ষণে মুখর থাকে দেশের প্রধান এই পর্যটন গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, সৈকতে ডুবে মৃত্যু এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে দুর্ঘটনার ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনুমোদনহীন স্থাপনা, পর্যাপ্ত উদ্ধারসেবার অভাব এবং নজরদারির দুর্বলতা দূর করা না গেলে পর্যটনশিল্পের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। তিনতলা কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ হারান ভেতরে থাকা ১০ জন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন ছিল না। এর আগে সতর্কতা বা নোটিস দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডে অবহেলার অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রিসোর্টের ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত হওয়ার পরও সেখানে পর্যটকদের অবস্থানের সুযোগ ছিল কীভাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু পরিদর্শন ও নোটিস নয়, নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুই শতাধিক স্থাপনা পরিদর্শন ও নোটিস দেওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনেছে, কতটির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে এবং কতটিতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন।

পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, শহরে ছিনতাইয়ের অভিযোগ

রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের শোক কাটতে না কাটতেই ১৯ অক্টোবর ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের হিমছড়ি ঢালায় একই দিনে দুই দফা ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়ায়। সকালে সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক যাত্রীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে দুপুরে অস্ত্রধারীদের তৎপরতায় কয়েকটি যানবাহনের যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের কেউ ১ লাখ ২০ হাজার, কেউ দেড় লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

পরে অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া মালামাল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি দুজনকে আটকের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তবে দিনের আলোয় এমন ঘটনার কারণে সড়কটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কক্সবাজারে ডাকাতির ১৪টি, দস্যুতার ২৩টি এবং চুরির ১৬০টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডাকাতির মামলা ছিল ১৬টি, দস্যুতার ২৫টি এবং চুরির ১৫৭টি। অর্থাৎ ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা কমলেও চুরির মামলা বেড়েছে।

এ ছাড়া কক্সবাজার শহরে পর্যটকদের ছিনতাই, হয়রানি ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। অপরিচিত এলাকায় যাতায়াত ও হোটেল খোঁজার জন্য অনেক পর্যটক অটোরিকশা ও টমটমচালকদের ওপর নির্ভর করেন। এই সুযোগে কাউকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া বা হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়। তবে সব ঘটনা থানায় নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণ কঠিন।

সৈকতে ডুবে তিন বছরে ৪০ জনের মৃত্যু

কক্সবাজারের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত হলেও গোসল করতে নেমে প্রাণ হারাচ্ছেন পর্যটকেরা। প্রবল স্রোত, সমুদ্রের তলদেশের গর্ত, গুপ্তখাল এবং ঢেউয়ের আচরণ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকে বিপদে পড়েন। বিস্তীর্ণ সৈকতের সব এলাকায় সমানভাবে উদ্ধারসেবা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের সৈকতের নির্দিষ্ট এলাকায় ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ১২ জন, ২০২৫ সালে ২০ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটজন মারা যান। একই সময়ে সমুদ্রে বিপদে পড়া ৪৭৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ডুবে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৭৭ জনকে।

প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মধ্যে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মধ্যে নিরাপদে গোসলের জন্য লাইফগার্ডের আওতাভুক্ত এলাকা প্রায় দেড় কিলোমিটার। সি-সেফের ২৭ জন লাইফগার্ডকর্মী পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।

সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হাসপাতালে নেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি। কয়েক মিনিটের বিলম্বও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। পর্যটকের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদ্ধারসেবার পরিধি ও জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।

অনুমোদনহীন প্যারাসেইলিংয়েও প্রাণহানি

সমুদ্রসৈকতে গোসলের পাশাপাশি প্যারাসেইলিংয়ের মতো বিনোদন কার্যক্রমেও নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গত ১ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে সাগরে পড়ে মারা যান খুলনার পর্যটক শৌভিক রায়। ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই সময়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনার অনুমোদন ছিল না। প্রতিকূল আবহাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা অমান্য করে তা চালানোর অভিযোগও ওঠে।

একই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং কার্যক্রমে গত ১০ বছরে অন্তত ১৯ জন পর্যটক আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কেউ রশি ছিঁড়ে সাগরে পড়েছেন, কেউ ঝাউবাগানে আটকে পড়েছেন, আবার কেউ বালুচরে পড়ে আহত হয়েছেন।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টুয়াক) উপদেষ্টা মফিজুর রহমানের অভিযোগ, প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছে। সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার কামালের মতে, এ ধরনের বিনোদন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে পরিচালনা করা জরুরি।

সড়ক ও রেলপথেও উদ্বেগ

পর্যটকের নিরাপত্তা শুধু হোটেল, সৈকত কিংবা বিনোদনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়; যাতায়াতের পথও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজার জেলার মহাসড়কে ১০৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭৪ জনের। এ ছাড়া রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ৫০টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যাতে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পর্যটন ব্যবসায়ও পড়ে। ইনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর মেরিন ড্রাইভের পাশের কিছু রিসোর্টে বুকিং কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও শহরের হোটেলগুলোতে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ার তথ্যও রয়েছে, তবু নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়লে পুরো পর্যটন গন্তব্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সমন্বিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যটনকে নিরাপদ করতে বিচ্ছিন্ন অভিযান কিংবা দুর্ঘটনার পর তদন্ত যথেষ্ট নয়। অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল-রিসোর্টের তালিকা প্রকাশ, অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, নিয়ম ভাঙলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে টহল বাড়ানো এবং সৈকতে লাইফগার্ডের পরিধি সম্প্রসারণ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ছাড়া শুধু নির্দেশনা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সামাজিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের মতে, পর্যটন এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল, হোটেল-মোটেল জোন ও নির্জন সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে নিরাপত্তাচৌকি এবং সৈকতে পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়মিত যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও মানসম্মত সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

পর্যটকেরা যাতে সহজে জানতে পারেন কোন হোটেল বা রিসোর্ট অনুমোদিত, কোন বিনোদন কার্যক্রম বৈধ এবং কোথায় লাইফগার্ডের সহায়তা পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থাও গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে এসে কোনো পর্যটক যেন প্রাণ হারিয়ে কিংবা আতঙ্কের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িত। তাই পর্যটকের জীবন রক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত, অনুমোদিত স্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত উদ্ধারসেবা চালুর মাধ্যমে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারলেই কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ টেকসই হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি