খুঁজুন
                               
, ,
           

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে সংসদে আলোচনা, ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধের আশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে সংসদে আলোচনা, ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধের আশ্বাস

দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক সাধারণ আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই শুধু আশ্বাস নয়, সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন।

তিনি বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের সমালোচনা করে বলেন, জনগণের অর্থে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবিলা করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ছয় মাসে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে সংকট সমাধানে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন করে অনুমোদন দেওয়া তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ থাকবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না—‘নো পাওয়ার, নো মানি’ নীতিতে এগুলো পরিচালিত হবে।

তিনি বলেন, আগের সময়ে গ্যাসের উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। পুরোনো বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি রাতারাতি বাতিল করাও সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত চলমান সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ নেই। ভুল নীতি, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব মিলিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পাশাপাশি এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকা ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ১০৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে ৩০টির কাজ চলছে। পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ স্থাপন ও মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংসদে আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বিদ্যুৎ ও গ্যাসকে জনগণের অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ বন্ধের দাবি জানান। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

বৈদ্যুতিক শক মেশিনে মাছ শিকার, হুমকিতে নিকলীর জীববৈচিত্র্য

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
বৈদ্যুতিক শক মেশিনে মাছ শিকার, হুমকিতে নিকলীর জীববৈচিত্র্য

কিশোরগঞ্জের নিকলীর নদী ও হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত ‘বৈদ্যুতিক শক মেশিন’ ব্যবহার করে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। নিষিদ্ধ এ পদ্ধতিতে মাছ ধরার কারণে ছোট-বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ডিম ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় জেলেদের। এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়েছেন মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলেরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোদারপুড্ডা, সিংপুর, ছাতিরচর, দামপাড়া, আলিয়াপাড়া ও কারপাশাসহ বিভিন্ন এলাকার নদী-হাওরে এভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে। সরেজমিনে রোদারপুড্ডা এলাকায় রাজেল ও খাইরুলকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় জেলে নুরু মিয়া বলেন, কয়েক বছর আগেও নদীতে জাল ফেললে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। তার অভিযোগ, কারেন্ট জাল ও চায়না চাইয়ের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মেশিনে মাছ শিকারের কারণে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে।

আরেক জেলে শুভাষ দাস বলেন, সারাদিন জাল নিয়ে বসে থেকেও অনেক সময় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মাছ পাওয়া যায় না। কখনো আয় নেমে আসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। তার অভিযোগ, বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে ছোট-বড় সব মাছ মেরে ফেলা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জেলে পরিবারগুলো আরও সংকটে পড়বে।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, নদী ও হাওরে কারেন্ট জাল, রিং জাল ও চায়না চাইয়ের ব্যবহার আগে থেকেই মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারে বাধা সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে বৈদ্যুতিক শক মেশিনের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে এসব নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ শিকার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে শুধু মাছের মজুতই কমবে না, জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোও আরও বড় সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ব্যাটারির সাহায্যে বিদ্যুৎ শক দিয়ে মাছ ধরার বিষয়টি নিকলীতে তিনি প্রথমবার শুনেছেন। এ পদ্ধতিতে মাছ শিকার করলে মাছ, রেণু, ডিম, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যায়। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবৈধভাবে এ পদ্ধতিতে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

পার্কিংয়ের জায়গা নেই, যানজটে স্থবির কুড়িগ্রাম শহর

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
পার্কিংয়ের জায়গা নেই, যানজটে স্থবির কুড়িগ্রাম শহর

কুড়িগ্রাম পৌরসভার প্রধান সড়কগুলোতে যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ভ্যান পার্কিং এবং যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। শহরের ব্যস্ত বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারী, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে।

বিশেষ করে দাদা মোড়, শাপলা চত্বর, কলেজ মোড় (দোয়েল চত্বর), জর্জ কোর্ট মোড়, বিজিবি মোড়, পৌর বাজার থেকে হাসপাতাল মোড় এবং হাসপাতাল-ঘোষপাড়া সড়কে প্রায়ই যানজট দেখা যায়। ভ্যাপসা গরমে দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান সড়কের পাশে ইজিবাইক, ভ্যান ও অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখা, চালকদের ইচ্ছেমতো ইউটার্ন নেওয়া এবং সড়কের ওপর যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। যানজটের মধ্যে মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম পৌরসভায় যানবাহন রাখার জন্য নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে দাদা মোড়, শাপলা চত্বর, কলেজ মোড়, জর্জ কোর্ট মোড় ও পৌর বাজারসংলগ্ন প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশে অটোরিকশা, ইজিবাইক, ভ্যান, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহন পার্ক করে রাখা হয়। এতে সড়কের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল হয়ে গিয়ে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের মতো ভারী যানবাহন প্রধান সড়কে প্রবেশ করলে যানজট আরও তীব্র হয়। কখনো কখনো সড়কের দুই পাশেই যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

সচেতন মহলের মতে, সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকির অভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় কাজে হাজার হাজার মানুষ কুড়িগ্রাম শহরে আসেন। ফলে যানজট কখনো কখনো প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগে।

এ পরিস্থিতিতে জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরি সেবার যানবাহনও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসব সেবা যানজটে আটকে গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান বকসী বলেন, জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার সঙ্গে জনদুর্ভোগও বাড়ছে।

জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, যানজট নিরসনে দ্রুত রাস্তার দুই পাশে যাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি পার্ক করে রাখা না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও চালকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা দ্রুত নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালু, সড়কে যত্রতত্র যানবাহন দাঁড় করানো বন্ধ এবং নিয়মিত ট্রাফিক মনিটরিং জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম পৌরসভার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

নদীর বুকজুড়ে দখল, হারাচ্ছে রংপুরের জলধারা

রংপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
নদীর বুকজুড়ে দখল, হারাচ্ছে রংপুরের জলধারা

একসময় রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য ও নৌযোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল নদনদী। সময়ের সঙ্গে সেই নদীর বুকেই কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও স্থাপনা, কোথাও চলছে চাষাবাদ। আবার কোথাও নদী সংকুচিত হয়ে পরিণত হয়েছে সরু জলধারায়। দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় রংপুর বিভাগের বহু নদনদী এখন অস্তিত্ব সংকটে।

রংপুর বিভাগের আট জেলায় সরকারি ও স্থানীয় বিভিন্ন তালিকায় তিন শতাধিক নদনদীর তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে রংপুরে ৪৩টি, লালমনিরহাটে ২৫টি এবং কুড়িগ্রামে অর্ধশতাধিক নদীর উল্লেখ রয়েছে। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া, আত্রাই ও ইছামতীর পাশাপাশি মানস, টেপা, ধাইজান, বুলাই, আখিরা ও ফুলকুমারসহ অসংখ্য ছোট নদী ও শাখানদী রয়েছে এ অঞ্চলে।

তবে কাগজে নদীর নাম থাকলেও বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। কোথাও নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও কমেছে নাব্যতা। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দেশের নদনদীর সংখ্যা নির্ধারণ ও তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগীয় পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য পুনঃযাচাই করে খসড়া তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর অবস্থান, সীমানা ও মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি নতুন করে যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রংপুর অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে এ নদীর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। ঘাঘট রংপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পানি নিষ্কাশন ও কৃষিতে ভূমিকা রাখছে। যমুনেশ্বরী বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। করতোয়াও উত্তরবঙ্গের প্রাচীন নদীগুলোর একটি।

তবে এসব নদীর বিভিন্ন অংশে নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর অনেক অংশ জেগে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেগে ওঠা এসব এলাকার কিছু অংশ ধীরে ধীরে দখলে চলে যাচ্ছে।

লালমনিরহাটের সতী নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় প্রশস্ত নদীটির কোনো কোনো অংশ এখন কয়েক ফুটে সংকুচিত হয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর খনন ও কচুরিপানার আধিক্যের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সীমান্তবর্তী খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নদীর অস্তিত্ব ও সরকারি তালিকাভুক্তি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলার গিরাই নদী নিয়েও দখলের অভিযোগ রয়েছে। নদীর জমির কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন অভিযোগের সত্যতা থাকলে নদীর সীমানা নির্ধারণ, ভূমি রেকর্ড ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নদীর সংকট শুধু পানির সংকট নয়। একটি নদীর সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, পানি নিষ্কাশন ও স্থানীয় অর্থনীতি সরাসরি যুক্ত। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র এবং নদীনির্ভর কৃষি।

শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে নদীঘেঁষা মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পরিবর্তন আসছে। একসময় যে নদী ছিল নৌপথ, সেচ ও মাছের উৎস, অনেক জায়গায় সেটি এখন বর্ষায় পানি বহনকারী সংকুচিত জলধারায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ নদীভাঙন, নদী খনন, বাঁধ মেরামতসহ পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ করে থাকে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী রক্ষার উদ্যোগ শুধু বাঁধ নির্মাণ বা ভাঙন ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

সচেতন সমাজের সদস্য, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক আলামীন বলেন, নদী রক্ষায় সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ ও পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা জরুরি। নদী রক্ষা করা গেলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, নদনদীকে অবহেলা করলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় পড়বে। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নদী ও জলাভূমির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তন বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে ‘২০৫০ সালের মধ্যে পুরো বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে’—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত পূর্বাভাস নয়। বরং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।

রংপুর বিভাগের নদনদীগুলো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের দখল ও অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে অনেক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারি নথি, পুরোনো মানচিত্র, স্যাটেলাইট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে প্রতিটি নদীর সীমানা নির্ধারণ জরুরি।

একই সঙ্গে দখল ও ভরাট বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা কঠিন।

নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি একটি অঞ্চলের প্রাণ, কৃষির সহায়ক, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। তাই রংপুরের নদনদী রক্ষায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি