খুঁজুন
                               
, ,
           

স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে ধোঁয়াশা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে ধোঁয়াশা

সড়কে ছুটছে শত শত স্লিপার বাস। যাত্রী শুয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারছেন, ব্যবসায়ীরা দেখছেন নতুন বাজার। কিন্তু যে বাসকে ঘিরে এত আয়োজন, তার আইনগত পরিচয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাস মালিকদের দাবি, তারা বিআরটিএর নিবন্ধন, ফিটনেস ও রুট পারমিট নিয়েই ব্যবসা করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অবস্থান—‘স্লিপার বাস’ নামে কোনো যানকে তারা অনুমোদন বা নিবন্ধন দেয়নি। বরং সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার বানানোর অভিযোগে বেশ কিছু বাসের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে।

গত বুধবার (০৯ সেপ্টেম্বর) এক রিটের শুনানি শেষে হাই কোর্ট বলেছে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন ও ২০২২ সালের সড়ক পরিবহন বিধিমালা মেনে বিআরটিএর অনুমোদন পাওয়া বাসই কেবল রাস্তায় চলতে পারবে। অনুমোদনহীন বা আইনবহির্ভূত বাসের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও বাধা নেই। আদালতের এই অবস্থানের পর স্লিপার বাস নিয়ে মূল আলোচনাটি এখন আরও স্পষ্ট—চলমান বাসগুলোর কাগজপত্রের বৈধতা কী এবং সেই কাগজে অনুমোদিত কাঠামোর সঙ্গে বাস্তব বাসের মিল কতটা?

বিরোধটা আসলে কোথায়?
বিআরটিএর ১৯ আগস্ট হাই কোর্টে দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংস্থাটির তিন সদস্যের কমিটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। বিআরটিএর ডাটাবেজে থাকা ৮২৯টি ডাবল-ডেকার বাস সাধারণ ডাবল-ডেকার, স্লিপার নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু মালিক সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে নিবন্ধন নেওয়ার পর পরে বডির ধরন পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস বানিয়ে রাস্তায় চালাচ্ছেন। এমন ৪১টি রূপান্তরিত বাসের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। এসব গাড়ির ফিটনেস নবায়ন করা হচ্ছে না এবং রুট পারমিটও দেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ একটি বাসের মূল নিবন্ধন বৈধ থাকা আর সেটিকে কাঠামো পরিবর্তন করে ‘স্লিপার বাস’ হিসেবে পরিচালনার অনুমোদন থাকা—দুটি ভিন্ন বিষয়। বিআরটিএর আইনজীবী রাফিউল ইসলামের বক্তব্য, সিঙ্গেল-ডেকার বাসের অনুমোদন নিয়েও সেটিকে পরিবর্তন করে স্লিপার হিসেবে পরিচালনা করা আইনসম্মত নয়। বাসটি একতলা কিংবা দোতলা—যাই হোক, ‘স্লিপার’ নামে পরিচালনার সুযোগ প্রচলিত আইনে নেই।

মালিকদের দাবি: বিআরটিএর কাগজ নিয়েই তো চলছি
বিআরটিএর অবস্থানের সঙ্গে একমত নন বাস মালিকেরা। বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবুর দাবি, যেসব বাসের নিবন্ধন, ফিটনেস ও রুট পারমিট রয়েছে, সেগুলো বৈধভাবেই চলছে। তার প্রশ্ন, ‘যেগুলোর রুট পারমিট আছে, বিআরটিএ ফিটনেস দিয়েছে সেগুলো কেন বন্ধ হবে?’ মালিকদের দাবি, তারা ইচ্ছেমতো কোনো গাড়ি রাস্তায় নামাননি। বিআরটিএর প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই গাড়ি নিবন্ধন করা হয়েছে, ফিটনেস নেওয়া হয়েছে এবং রুট পারমিটের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে।

‘৪৬ এক্সপ্রেস’-এর কর্ণধার আনিসুর রহমান শিল্পীর ভাষ্য, তাদের গাড়ির উচ্চতা সাধারণ বাসের মতো। বিআরটিএ থেকেই নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। ফলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী অনুমোদিত গাড়ি চলতে বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—বিআরটিএর দেওয়া কাগজে বাসটি কী হিসেবে নিবন্ধিত? সেটির বডি বা অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তনের অনুমোদন ছিল কি না? আর ‘স্লিপার’ হিসেবে যাত্রী পরিবহনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে মালিকদের ‘বৈধ’ দাবিটি কতটা টেকসই।

কাগজের বৈধতা বনাম কাঠামোর বৈধতা
সরেজমিনে চলাচলকারী বেশ কিছু স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একতলা বাসের অনুমোদন নিয়ে পরে তার ভেতরে ওপর-নিচ করে শোয়ার বার্থ তৈরি করা হয়েছে। কিছু বাসের কাঠামো আবার ডাবল-ডেকারের আদলে পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে মূল নিবন্ধনের কাগজ থাকলেও পরবর্তী পরিবর্তনের জন্য আলাদা অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিআরটিএ বলছে, এই ধরনের পরিবর্তন অনুমোদন ছাড়া করা হয়েছে। মালিকেরা বলছেন, তাদের নিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজপত্র রয়েছে। এই দুই বক্তব্যের মাঝেই তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন—যার সমাধান এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নথি ও নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে।

হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
স্লিপার বাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা তাই শুধু আইনি নয়, বড় অর্থনৈতিক প্রশ্নও তৈরি করেছে। মালিক সমিতির হিসাবে মহাসড়কে এখন ৮০০ থেকে ৮৫০টি স্লিপার বাস চলছে। একটি বাসের বডি তৈরিতে প্রায় ৪০ লাখ এবং চেসিসে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়। ঋণ, কিস্তি, কাউন্টার, গ্যারেজ ও কর্মীসহ পুরো খাতে বিনিয়োগ দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বলে দাবি মালিকদের। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি নামিয়েছেন। কেউ কেউ পারিবারিক সঞ্চয়ও বিনিয়োগ করেছেন। ফলে বাস বন্ধ হলে ঋণ পরিশোধ ও কর্মসংস্থান—দুই দিকেই সংকট তৈরি হতে পারে। এই কারণেই মালিকেরা নিষেধাজ্ঞার বদলে একটি নীতিমালা চান। তাদের দাবি, জরুরি বহির্গমনসহ যেসব নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো সংশোধনের সুযোগ দিয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে স্লিপার বাস চালানোর অনুমতি দেওয়া হোক।

আরামের সঙ্গে নিরাপত্তা
স্লিপার বাসের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ কম খরচে শুয়ে দীর্ঘপথ যাওয়ার সুবিধা। নিয়মিত ঠাকুরগাঁও যাওয়া যাত্রী আহসান হাবিবের মতে, বাস ধীরগতিতে চললে এটি আরামদায়ক। কিন্তু অতিরিক্ত গতিতে চালালে সেই আরামই আতঙ্কে পরিণত হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথে স্লিপার বাস দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন সাংবাদিক আতাউর রহমান। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কুয়াকাটার কাছে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পুকুরে পড়ে যায়। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা কাঁচ ভেঙে যাত্রীদের উদ্ধার করেন। ঘটনাটি স্লিপার বাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও সামনে এনেছে। যাত্রী শুয়ে থাকায় আকস্মিক ব্রেক বা সংঘর্ষে আঘাতের ঝুঁকি কতটা? বাস উল্টে গেলে জরুরি বহির্গমন কতটা কার্যকর? আগুন লাগলে যাত্রীরা কত দ্রুত বের হতে পারবেন? বিআরটিএর কমিটিও এসব নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নীতিমালা বা গাইডলাইন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা
স্লিপার বাসের সংকট তাই শুধু মালিক বনাম বিআরটিএর বিরোধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বিনিয়োগ এবং যাত্রীনিরাপত্তা। যদি স্লিপার বাসের অনুমোদন না থাকে, তাহলে চলমান বাসগুলোর নিবন্ধন ও ফিটনেসের সময় তাদের কাঠামো কী হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল—তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। আবার মালিকেরা যদি বিআরটিএর কাগজপত্রের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে থাকেন, সেই কাগজে ঠিক কী অনুমোদন ছিল, সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। হাই কোর্টের আদেশের আলোকে এখন মূল দায়িত্ব হলো বৈধ ও অবৈধ যান আলাদা করা এবং যাত্রীনিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকার চাইলে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্লিপার বাসের জন্য আলাদা কারিগরি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। সেই মানদণ্ডে চলমান বাসগুলো পরীক্ষা করে যেগুলো নিরাপদ ও নিয়মসম্মত, সেগুলোকে কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানগুলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কারণ স্লিপার বাস এখন আর নিছক একটি নতুন পরিবহনসেবা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৮০০ থেকে ৮৫০টি বাস, দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ, বিপুল কর্মসংস্থান এবং প্রতিদিনের হাজারো যাত্রীর যাতায়াত।

কালের আলো/এম/এএইচ

বৈদ্যুতিক শক মেশিনে মাছ শিকার, হুমকিতে নিকলীর জীববৈচিত্র্য

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
বৈদ্যুতিক শক মেশিনে মাছ শিকার, হুমকিতে নিকলীর জীববৈচিত্র্য

কিশোরগঞ্জের নিকলীর নদী ও হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত ‘বৈদ্যুতিক শক মেশিন’ ব্যবহার করে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। নিষিদ্ধ এ পদ্ধতিতে মাছ ধরার কারণে ছোট-বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ডিম ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় জেলেদের। এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়েছেন মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলেরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোদারপুড্ডা, সিংপুর, ছাতিরচর, দামপাড়া, আলিয়াপাড়া ও কারপাশাসহ বিভিন্ন এলাকার নদী-হাওরে এভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে। সরেজমিনে রোদারপুড্ডা এলাকায় রাজেল ও খাইরুলকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় জেলে নুরু মিয়া বলেন, কয়েক বছর আগেও নদীতে জাল ফেললে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। তার অভিযোগ, কারেন্ট জাল ও চায়না চাইয়ের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মেশিনে মাছ শিকারের কারণে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে।

আরেক জেলে শুভাষ দাস বলেন, সারাদিন জাল নিয়ে বসে থেকেও অনেক সময় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মাছ পাওয়া যায় না। কখনো আয় নেমে আসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। তার অভিযোগ, বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে ছোট-বড় সব মাছ মেরে ফেলা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জেলে পরিবারগুলো আরও সংকটে পড়বে।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, নদী ও হাওরে কারেন্ট জাল, রিং জাল ও চায়না চাইয়ের ব্যবহার আগে থেকেই মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারে বাধা সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে বৈদ্যুতিক শক মেশিনের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে এসব নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ শিকার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে শুধু মাছের মজুতই কমবে না, জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোও আরও বড় সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ব্যাটারির সাহায্যে বিদ্যুৎ শক দিয়ে মাছ ধরার বিষয়টি নিকলীতে তিনি প্রথমবার শুনেছেন। এ পদ্ধতিতে মাছ শিকার করলে মাছ, রেণু, ডিম, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যায়। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবৈধভাবে এ পদ্ধতিতে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

পার্কিংয়ের জায়গা নেই, যানজটে স্থবির কুড়িগ্রাম শহর

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
পার্কিংয়ের জায়গা নেই, যানজটে স্থবির কুড়িগ্রাম শহর

কুড়িগ্রাম পৌরসভার প্রধান সড়কগুলোতে যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ভ্যান পার্কিং এবং যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। শহরের ব্যস্ত বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারী, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে।

বিশেষ করে দাদা মোড়, শাপলা চত্বর, কলেজ মোড় (দোয়েল চত্বর), জর্জ কোর্ট মোড়, বিজিবি মোড়, পৌর বাজার থেকে হাসপাতাল মোড় এবং হাসপাতাল-ঘোষপাড়া সড়কে প্রায়ই যানজট দেখা যায়। ভ্যাপসা গরমে দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান সড়কের পাশে ইজিবাইক, ভ্যান ও অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখা, চালকদের ইচ্ছেমতো ইউটার্ন নেওয়া এবং সড়কের ওপর যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। যানজটের মধ্যে মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম পৌরসভায় যানবাহন রাখার জন্য নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে দাদা মোড়, শাপলা চত্বর, কলেজ মোড়, জর্জ কোর্ট মোড় ও পৌর বাজারসংলগ্ন প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশে অটোরিকশা, ইজিবাইক, ভ্যান, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহন পার্ক করে রাখা হয়। এতে সড়কের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল হয়ে গিয়ে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের মতো ভারী যানবাহন প্রধান সড়কে প্রবেশ করলে যানজট আরও তীব্র হয়। কখনো কখনো সড়কের দুই পাশেই যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

সচেতন মহলের মতে, সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকির অভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় কাজে হাজার হাজার মানুষ কুড়িগ্রাম শহরে আসেন। ফলে যানজট কখনো কখনো প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগে।

এ পরিস্থিতিতে জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরি সেবার যানবাহনও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসব সেবা যানজটে আটকে গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান বকসী বলেন, জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার সঙ্গে জনদুর্ভোগও বাড়ছে।

জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, যানজট নিরসনে দ্রুত রাস্তার দুই পাশে যাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি পার্ক করে রাখা না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও চালকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা দ্রুত নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালু, সড়কে যত্রতত্র যানবাহন দাঁড় করানো বন্ধ এবং নিয়মিত ট্রাফিক মনিটরিং জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম পৌরসভার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

নদীর বুকজুড়ে দখল, হারাচ্ছে রংপুরের জলধারা

রংপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
নদীর বুকজুড়ে দখল, হারাচ্ছে রংপুরের জলধারা

একসময় রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য ও নৌযোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল নদনদী। সময়ের সঙ্গে সেই নদীর বুকেই কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও স্থাপনা, কোথাও চলছে চাষাবাদ। আবার কোথাও নদী সংকুচিত হয়ে পরিণত হয়েছে সরু জলধারায়। দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় রংপুর বিভাগের বহু নদনদী এখন অস্তিত্ব সংকটে।

রংপুর বিভাগের আট জেলায় সরকারি ও স্থানীয় বিভিন্ন তালিকায় তিন শতাধিক নদনদীর তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে রংপুরে ৪৩টি, লালমনিরহাটে ২৫টি এবং কুড়িগ্রামে অর্ধশতাধিক নদীর উল্লেখ রয়েছে। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া, আত্রাই ও ইছামতীর পাশাপাশি মানস, টেপা, ধাইজান, বুলাই, আখিরা ও ফুলকুমারসহ অসংখ্য ছোট নদী ও শাখানদী রয়েছে এ অঞ্চলে।

তবে কাগজে নদীর নাম থাকলেও বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। কোথাও নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও কমেছে নাব্যতা। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দেশের নদনদীর সংখ্যা নির্ধারণ ও তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগীয় পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য পুনঃযাচাই করে খসড়া তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর অবস্থান, সীমানা ও মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি নতুন করে যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রংপুর অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে এ নদীর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। ঘাঘট রংপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পানি নিষ্কাশন ও কৃষিতে ভূমিকা রাখছে। যমুনেশ্বরী বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। করতোয়াও উত্তরবঙ্গের প্রাচীন নদীগুলোর একটি।

তবে এসব নদীর বিভিন্ন অংশে নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর অনেক অংশ জেগে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেগে ওঠা এসব এলাকার কিছু অংশ ধীরে ধীরে দখলে চলে যাচ্ছে।

লালমনিরহাটের সতী নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় প্রশস্ত নদীটির কোনো কোনো অংশ এখন কয়েক ফুটে সংকুচিত হয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর খনন ও কচুরিপানার আধিক্যের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সীমান্তবর্তী খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নদীর অস্তিত্ব ও সরকারি তালিকাভুক্তি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলার গিরাই নদী নিয়েও দখলের অভিযোগ রয়েছে। নদীর জমির কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন অভিযোগের সত্যতা থাকলে নদীর সীমানা নির্ধারণ, ভূমি রেকর্ড ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নদীর সংকট শুধু পানির সংকট নয়। একটি নদীর সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, পানি নিষ্কাশন ও স্থানীয় অর্থনীতি সরাসরি যুক্ত। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র এবং নদীনির্ভর কৃষি।

শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে নদীঘেঁষা মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পরিবর্তন আসছে। একসময় যে নদী ছিল নৌপথ, সেচ ও মাছের উৎস, অনেক জায়গায় সেটি এখন বর্ষায় পানি বহনকারী সংকুচিত জলধারায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ নদীভাঙন, নদী খনন, বাঁধ মেরামতসহ পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ করে থাকে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী রক্ষার উদ্যোগ শুধু বাঁধ নির্মাণ বা ভাঙন ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

সচেতন সমাজের সদস্য, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক আলামীন বলেন, নদী রক্ষায় সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ ও পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা জরুরি। নদী রক্ষা করা গেলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, নদনদীকে অবহেলা করলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় পড়বে। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নদী ও জলাভূমির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তন বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে ‘২০৫০ সালের মধ্যে পুরো বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে’—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত পূর্বাভাস নয়। বরং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।

রংপুর বিভাগের নদনদীগুলো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের দখল ও অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে অনেক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারি নথি, পুরোনো মানচিত্র, স্যাটেলাইট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে প্রতিটি নদীর সীমানা নির্ধারণ জরুরি।

একই সঙ্গে দখল ও ভরাট বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা কঠিন।

নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি একটি অঞ্চলের প্রাণ, কৃষির সহায়ক, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। তাই রংপুরের নদনদী রক্ষায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি