থামছে না চায়না দুয়ারি জালের বিস্তার
নিষেধাজ্ঞা আছে, অভিযানও চলছে—তবু থামছে না চায়না দুয়ারি জালের বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, আইডি ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ্যেই চলছে এই জালের প্রচার ও বিক্রি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারেও মিলছে জালটি। ফলে একদিকে যেমন আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে নির্বিচার মাছ শিকারের এই উপকরণ দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য তৈরি করছে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি।
ফাঁদে মাছের সঙ্গে পোনা ও জলজ প্রাণী
চায়না দুয়ারি বা চায়না রিং জাল মূলত এক ধরনের ফাঁদ। জালের দুই পাশে প্রবেশপথ থাকে। মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ভেতরে ঢোকার পর সহজে বের হতে পারে না। কয়েক হাত থেকে শত হাত পর্যন্ত লম্বা এই জালে নির্দিষ্ট দূরত্বে রিং বসানো থাকে।
মৎস্য অধিদপ্তরের প্রচারপত্রেও বলা হয়েছে, দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে মাছের পাশাপাশি পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও নির্বিচারে আটকা পড়ে। ফলে প্রজনন ও স্বাভাবিক বংশবিস্তারের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আইনে নাম নেই, নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি অন্য জায়গায়
চায়না দুয়ারি জালকে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে আলাদাভাবে নাম উল্লেখ করে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে আইনে ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ স্থাপন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে।
আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, মাছ ধরার জন্য মাটিতে গেঁথে বা অন্য কোনো উপায়ে স্থির করা জাল, খাঁচা, ফাঁদ কিংবা অন্য কোনো কৌশল ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’-এর আওতায় পড়ে। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চায়না দুয়ারি জাল এই বিধানের আওতায় অবৈধ। অর্থাৎ জালের নাম আইনে না থাকলেও এর ব্যবহার পদ্ধতিই নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি।
ফেসবুক-ইউটিউবে যেন খোলা বাজার
নিষেধাজ্ঞার বাস্তব চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে। ‘চায়না রিং জাল’ নামেই একাধিক পেজ রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন নামে আরও বহু পেজে পাইকারি ও খুচরা বিক্রির প্রচার চলছে।
ইউটিউবেও রয়েছে জালটির বিক্রয়সংক্রান্ত ভিডিও। কিছু ভিডিওতে কারখানায় উৎপাদনের দৃশ্য, যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমোর তথ্য এবং জালের দাম পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে বিপণন—পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার সামনে উন্মুক্ত।
রাজধানীর বাজারেও মিলছে
অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নয় চায়না দুয়ারি জালের বাজার। রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারেও এর বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর সেখানে এক দোকানদার জানান, তাঁর কাছে জালটি রয়েছে এবং কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা থেকে এনে তিনি বিক্রি করেন।
এতে বোঝা যায়, অনলাইন প্রচারের পাশাপাশি সরবরাহের একটি বাস্তব বাজারও গড়ে উঠেছে। ফলে শুধু ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা কঠিন। উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির উৎস শনাক্ত করাও জরুরি।
অভিযান আছে, পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই
চায়না দুয়ারি জালের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে গত ১৩ এপ্রিল দেশের সব বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়। অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
তবে এরপর বা চলতি বছরে কতটি অভিযান হয়েছে, কত জাল জব্দ হয়েছে কিংবা কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এর পূর্ণাঙ্গ তথ্য অধিদপ্তরে নেই। অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক মোতালেব হোসেন অবশ্য জানিয়েছেন, ব্যাপকভাবে জাল জব্দ করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি কারখানার বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
প্রশ্নটা শুধু একটি জালের নয়
মৎস্য কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়ে মাছের প্রাপ্যতা আরও কমে যেতে পারে। কারণ চায়না দুয়ারি জালের ক্ষতি শুধু ধরা পড়া মাছের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও।
তাই সমস্যাটিকে কেবল অবৈধ জাল জব্দের অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না। উৎপাদনকারী কারখানা, সরবরাহকারী, বাজার ও অনলাইন বিক্রয়—পুরো শৃঙ্খলকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনের প্রয়োগ কতটা নিয়মিত ও কার্যকর হচ্ছে, তার পরিমাপযোগ্য তথ্য প্রকাশ করাও জরুরি। কারণ পানিতে একবার জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু অভিযান চালিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।
কালের আলো/এম/এএএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array