ইসির ভোটযাত্রায় হঠাৎ ব্রেক
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে কয়েক সপ্তাহ ধরে দৃশ্যমান প্রস্তুতি চালালেও হঠাৎ করেই সেই তৎপরতায় ছন্দপতন ঘটেছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিলের পর এবার নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘোষিত সংলাপও স্থগিত করেছে কমিশন। ফলে নির্বাচন আয়োজনের দৃশ্যমান প্রস্তুতি এগোলেও বাস্তবে ভোটের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
- তফসিলের আগেই দুই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি স্থগিত
- মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
- চূড়ান্ত সময়সূচি এখনও অনিশ্চিত
প্রস্তুতির বড় অংশ শেষ, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অধরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ ইতোমধ্যে এগিয়ে নিয়েছিল ইসি। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন, বাজেট প্রস্তুত এবং ভোটের সামগ্রী কেনাকাটার মতো কার্যক্রম শেষের দিকে নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতিও ছিল সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
গত ২৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বরের শেষ দিকে বা ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে ভোটের তারিখ সমন্বয়ের কথাও তখন জানানো হয়েছিল।
সাত ধাপে ভোটের প্রাথমিক ছক
এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের বৈঠকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আরও নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা সামনে আসে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ৮০টি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। শেষ ধাপের ভোট গত ২৭ মে শেষ করার পরিকল্পনাও ছিল। আইনি জটিলতামুক্ত ও নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়নগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ৬৪ জেলায় একযোগে ভোট শুরু করার লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিতও ছিল কমিশনের বক্তব্যে।
সরকারের বক্তব্যে প্রকাশ পেল সমন্বয়ের ঘাটতি
তবে এই পরিকল্পনার পরদিনই তৈরি হয় নতুন প্রশ্ন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিছু জানে না। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ঘোষিত সময়সূচি ছিল প্রাথমিক। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনার পরই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়।
জুনের আগেই ভোট, কিন্তু তারিখ নেই
১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সানাউল্লাহ জানান, আগামী বছরের জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তবে বন্যায় শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষতি এবং পরীক্ষার সময়সূচি বিবেচনায় নিয়ে ভোট শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ তখনও ঘোষণা করা হয়নি। এই পর্যায় থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতির গতি দৃশ্যত কমতে শুরু করে। ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নির্ধারিত সভা বাতিল করে কমিশন। এরপর ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্ধারিত তিন দিনের সংলাপও স্থগিত করা হলো।
সামনে সমন্বয় নাকি নতুন সময়সূচি?
ইসির জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. আব্দুল মমিন সরকার জানিয়েছেন, আপাতত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ স্থগিত রয়েছে; পরবর্তী নির্দেশনা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরপর দুই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কমিশন কি কেবল প্রস্তুতির সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করছে, নাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পুরো পরিকল্পনাতেই পরিবর্তন আসছে? এখন পর্যন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে এর স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। ফলে ভোটের আয়োজন নিয়ে প্রস্তুতি যতটা এগিয়েছে, চূড়ান্ত সময়সূচি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্নটি ততটাই অনির্ধারিত রয়ে গেছে।
কালের আলো/এএইচ/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array