অপরিশোধিত বর্জ্যে বিপন্ন সান্তাহারের কৃষি ও জলজ পরিবেশ
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে পরিবেশগত নিয়মনীতি না মেনে কয়েকটি অটোমেটিক চালকল পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্য পরিশোধন না করেই খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। এতে পানির উৎস দূষিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও জলজ পরিবেশ।
স্থানীয়রা জানান, আদমদীঘির অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য ও অপরিশোধিত তরল পদার্থের কারণে দিন দিন কৃষি ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সান্তাহার এলাকায় কয়েকটি অটোরাইস মিলের বর্জ্য সরাসরি খাল ও ফসলি জমিতে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বুশরা অটো রাইস মিল, সুন্দরী অটো রাইস মিল, ইছামতী, ফুলজান, সালমান, এমবি, বৈশাখীসহ প্রায় ১৪টি অটোরাইস মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে নির্গত তরল বর্জ্য সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্য পানি পরিশোধনের জন্য ইটিপি স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে তা দৃশ্যমান নয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুশরা অটো রাইস মিলের বর্জ্য পানি রেলের জায়গা দিয়ে ফসলি জমির পাশ দিয়ে ইরামতি খালে গিয়ে পড়ছে। এমবি এগ্রো ফুডস ও সালমান অটো রাইস মিলের বর্জ্য পানি ড্রেনের মাধ্যমে ফসলি জমি পেরিয়ে খাড়িতে গিয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, অন্যান্য চালকলেও একইভাবে অপরিশোধিত বর্জ্য পানি খাল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মিলের বর্জ্য পানি ও খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করে সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় মিলের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। স্বাভাবিক মাত্রা হিসেবে ৩ থেকে ৬ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে।
পানির পিএইচের স্বাভাবিক মাত্রা ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষায় মিলের পানিতে তা পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৩ এবং খালের পানিতে ৬ দশমিক ৮। অ্যামোনিয়ার স্বাভাবিক মাত্রা শূন্য দশমিক ০৫ থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম হলেও মিলের পানিতে এর পরিমাণ ১০ মিলিগ্রামের বেশি এবং খালের পানিতে ১২ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে। অ্যালকালিনিটির স্বাভাবিক মাত্রা ২০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম হলেও মিলের পানিতে তা শূন্য দশমিক ৩ এবং খালের পানিতে শূন্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কৃষক লতিফুর রহমান বলেন, খাড়ির দুর্গন্ধে এখন আশপাশে যাওয়া যায় না। জমিতে ফসলের ফলন কমেছে। পচা পানিতে মাছও বাঁচে না। একসময় খালের মাছেই পরিবারের আমিষের চাহিদা মিটলেও এখন মাছ কিনে খেতে হচ্ছে।
তবে বর্জ্য খালে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বুশরা অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী হাফেজ বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের পেছনের একটি পুকুরে বর্জ্য পানি ফেলা হয়। তবে ড্রেন দিয়ে খালে যে পানি পড়ে, সেটি পরিষ্কার। অন্য মিল মালিকরাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
সান্তাহার নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এস রোশদানী বলেন, একসময় খাল-বিলের মাছ অত্যন্ত সুস্বাদু ছিল। কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য পানিতে ইরামতি খালের পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ভরাট ও কচুরিপানায় খালটি এখন মৃতপ্রায়। বর্জ্য পানি ফেলা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিশির কুমার দে বলেন, নমুনা পরীক্ষায় মিল ও ইরামতি খালের পানি প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে দেখা গেছে। নমুনায় ছাই ও ধাতব উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হেভি মেটাল পরীক্ষা করা হলে ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান জানান, উল্লেখ করা ছয়টি মিলের মধ্যে বুশরা অটো রাইস মিলের ছাড়পত্র নবায়ন করা রয়েছে। তবে মিলের দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত তরল বর্জ্য ড্রেন দিয়ে সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে পড়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array