ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দর্শনে ভক্তদের ঢল
শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যে মর্ত্যে দেবী দুর্গার আবাহন। ধূপ-ধুনোর সুবাস, সন্ধ্যার প্রদীপের আলো এবং ভক্তদের প্রার্থনায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে শারদীয় দুর্গোৎসবের পূজামণ্ডপগুলো। মহাষষ্ঠীর সকালে দেবী ষষ্ঠীর আরাধনা, বোধন ও আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার উৎসব। সন্ধ্যায় প্রতিমা উন্মোচনের পর দেবীদর্শনে ভক্তদের ভিড় জমে রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে।
দেবীর মুখদর্শন, অঞ্জলি নিবেদন এবং পরিবার-পরিজনের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ মন্দিরে সমবেত হন। আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপ, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ এবং ঢাক-কাঁসরের সম্মিলিত ধ্বনি শারদীয় উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবীদর্শনে ভক্তদের ঢল
মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। দেবীর মুখদর্শনের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মন্দিরে আসেন ভক্তরা। সন্ধ্যারতি, ধূপ-দীপ ও কর্পূরের আলোয় পূজামণ্ডপের পরিবেশ হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তরা করজোড়ে প্রণাম জানান। কেউ অঞ্জলি নিবেদন করেন, কেউ পরিবারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে মন্দির চত্বর পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়। শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি ও ঢাকের তালে তালে দেবীকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় ধর্মীয় আবেগ ও আনন্দের আবহ। সন্ধ্যার এই আয়োজন দুর্গোৎসবের ঐতিহ্য ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক পরিচিত চিত্র তুলে ধরে।
বেলতলায় ষষ্ঠীপূজা ও দেবীর বোধনের আনুষ্ঠানিকতা
এর আগে মহাষষ্ঠীর সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে দেবী ষষ্ঠীর আরাধনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। পুরোহিতদের সংকল্প ও মন্ত্রোচ্চারণে সম্পন্ন হয় ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। মন্দির প্রাঙ্গণের বেলতলায় আয়োজন করা হয় বিল্ববৃক্ষ বা বেলগাছ পূজার বিশেষ আচার। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বেলবৃক্ষে দেবীর আবাহনের মধ্য দিয়ে তাঁর জাগরণ ও মর্ত্যে আগমনের সূচনা হয়। তাই ষষ্ঠীর পূজায় বেলতলার আচার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পূজার বেদি সাজানো হয় গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার হলুদ-কমলা মালায়। সেখানে রাখা হয় তাম্রপাত্র, কাঁসার ঘণ্টা, শঙ্খ, পুষ্পাদানি, পঞ্চপল্লব, আম্রপল্লব, আতপ চাল, নারকেল, ঘট ও বিভিন্ন ফুল। দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয় নানা ধরনের ফল ও মিষ্টি।
পুরোহিতরা পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে এবং কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে পূজার উপাচার সম্পন্ন করেন। এরপর শঙ্খধ্বনি ও ঢাক-কাঁসরের বাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। ভক্তরা হাতে ফুল ও আম্রপল্লব নিয়ে দেবীর কৃপা কামনায় প্রার্থনা করেন।
কৈলাস থেকে মর্ত্যে কন্যারূপে দেবী দুর্গা
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী দুর্গা বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে বেড়াতে আসেন। এই আগমনকে ঘিরেই প্রতিবছর ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় আনন্দ, আবেগ ও উৎসবের প্রত্যাশা। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, অসুরশক্তির কাছে পরাজিত দেবতারা যখন স্বর্গলোক থেকে বিতাড়িত হন, তখন অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে দেবতারা সম্মিলিতভাবে এক মহাশক্তির আবির্ভাব কামনা করেন। দেবতাদের তেজ থেকে আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। সেই বিশ্বাসের ধারাবাহিকতায় দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছে অশুভের বিনাশ ও শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এবারের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং প্রস্থান নৌকায়। দেবীর আগমন ও প্রস্থানের এই প্রতীকী তাৎপর্যকে সামনে রেখে ভক্তরা দেশ, সমাজ ও সব জীবের কল্যাণ কামনা করছেন।
ঢাক-ঢোলের তালে ছয় দিন উৎসবের আমেজ
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে পূজামণ্ডপগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। প্রতিমা দর্শন, অঞ্জলি, সন্ধ্যারতি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি আলোকসজ্জা এবং মানুষের সমাগমে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে মন্দির ও মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। ভক্তদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া এবং সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করারও উপলক্ষ। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি ও শঙ্খনাদে উৎসবের পরিবেশ বজায় থাকবে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array