প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ৩ বছর, পিটিআইয়ের সক্ষমতা বাড়বে ৬ গুণ
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি, সহকারী শিক্ষক নিয়োগ, মিড-ডে মিল, ডিজিটাল শিক্ষা এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগের বিষয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রশিক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণব্যবস্থার নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করার বর্তমান ধারায় পরিবর্তন আনতে চায় সরকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাসের আবাসিক বা ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করবেন। এরপর শ্রেণিকক্ষে ফিরে পাঠদান শুরু করবেন। বাকি প্রশিক্ষণ নির্ধারিত সিলেবাস ও মডিউল অনুযায়ী অনলাইন ও অফলাইন পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রশিক্ষণের মডিউল ও পরীক্ষাগুলো পর্যায়ক্রমে শেষ করার জন্য আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তবে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির কাজও এগিয়েছে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এ মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে বলে জানান তিনি। এ ব্যবস্থায় প্রথম দুই মাস পিটিআইতে সরাসরি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বাকি ১০ মাস অনলাইন ও অফলাইন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে।
অর্থাৎ, একদিকে নতুন শিক্ষকদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ মডিউল চালুর প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কাঠামো আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার।
পিটিআইয়ের সক্ষমতা বাড়বে ছয় গুণ
বর্তমানে দেশের পিটিআইগুলোতে বছরে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় ছয় গুণ বেশি শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে শুধু পিটিআইয়ের ওপর নির্ভর করা হবে না। প্রয়োজনে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগকেও এ কাজে যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়তে পারে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, নীতিগতভাবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে স্থায়ীভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে নিয়োজিত রাখা যাবে না।
২০২৭ সালের মধ্যে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের লক্ষ্য
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, বাকি উপজেলাগুলোতেও কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। এ জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে।
সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার নিশ্চিত করা।
কর্মসূচিটি দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হলে বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি ধরে রাখা এবং পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, খাবারের মান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও স্মার্ট ক্লাসরুম
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেওয়ার প্রকল্প নয়; বরং শ্রেণিকক্ষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ।
ববি হাজ্জাজ জানান, গুগলসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করা, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রতিমন্ত্রী জানান, যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন এবং ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
৩৬ হাজার ৯৬০ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, পদোন্নতির অপেক্ষা
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার বিষয়টিও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন আদালতের রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছে। রায়ের চূড়ান্ত কপি হাতে পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পথও উন্মুক্ত হবে। তখন বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ করা গেলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বইয়ের বোঝা কমিয়ে আনন্দদায়ক শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বইয়ের চাপ কমিয়ে পাঠদানকে আনন্দদায়ক করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
পরিকল্পনায় গল্প বলার মাধ্যমে শেখানো এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শেখার আগ্রহ তৈরি এবং শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানোকে এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাওর, চর ও পাহাড়ে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ সুবিধার ভাবনা
দেশের দুর্গম অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ধরে রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করাও সরকারের পরিকল্পনার অংশ। হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য এলাকার শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে এসব এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা কমাতে প্রয়োজনে আবাসিক বা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যায় কি না, তা নিয়েও নীতিগতভাবে ভাবছে সরকার।
দুর্গম এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে যাতায়াত বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার যোগাযোগব্যবস্থা ও বসবাসের অসুবিধার কারণে এসব অঞ্চলে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনও কঠিন হয়। বিশেষ ভাতা ও আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ
শিক্ষক প্রশিক্ষণের মেয়াদ ও সক্ষমতা বাড়ানো, সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালু, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলা এবং শিক্ষকস্বল্পতা কমানোর পরিকল্পনা প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশিক্ষিত জনবল, মানসম্মত খাবার সরবরাহ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং কার্যকর তদারকি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোকে সমান সুযোগের আওতায় আনা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের বাস্তব দক্ষতা বাড়ানো হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সরকারের পরিকল্পনাগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। এখন এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন, অগ্রগতি এবং শিক্ষার্থীদের শেখার মানে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেদিকেই নজর থাকবে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array