খুঁজুন
                               
, ,
           

পাঁচ ছেলে থাকতেও আশ্রয় মেলেনি ৮৫ বছরের জয়নব ভানুর

চাঁদপুর সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
পাঁচ ছেলে থাকতেও আশ্রয় মেলেনি ৮৫ বছরের জয়নব ভানুর

পাঁচ ছেলে থাকলেও বার্ধক্যে এসে কারও ঘরে আশ্রয় পাননি ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানু। দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে ছেলেদের ঘরে ঠাঁই না পেয়ে দরজার সামনে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আকুতি জানান। শেষ পর্যন্ত মেয়ে ঝর্ণা বেগম মাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান।

ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের। জয়নব ভানু ওই গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, পাঁচ ছেলে থাকা সত্ত্বেও বার্ধক্যে এসে তাঁদের কারও ঘরেই তাঁর ঠাঁই হয়নি।

জয়নব ভানুর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে তিনি ছেলেদের ঘরে ঢুকতে পারেননি। একের পর এক দরজায় টোকা দিয়ে ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে দরজার সামনেই বসে থাকেন তিনি। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁকে দেখতে পেয়ে খোঁজখবর নেন। তাঁদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

তবে জয়নব ভানুর অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ছেলেদের পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, তাঁর মা দীর্ঘ এক বছর কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তবে মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলে জানান তিনি।

বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, জয়নব ভানু তাঁদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না। সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও দাবি করেন, জয়নব ভানু কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন।

মায়ের এমন পরিস্থিতির খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝর্ণা বেগম। তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁর মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে। ছেলেরা মাকে নিজেদের বাড়িতে নিতে চান না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে মাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান ঝর্ণা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের খান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল বলেন, তিনি আগে এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। একজন বৃদ্ধা মায়ের এমন পরিস্থিতির কথা শুনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। সামাজিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ছেলেদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবর রহমান বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে এসআই আব্দুল বাতেনকে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিল পাওয়া যায়নি। ওই নারীর পাঁচ সন্তানই প্রবাসে থাকেন বলে জানান তিনি। এরপরও ছেলে-মেয়েদের কারও অবহেলা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জয়নব ভানুকে থানায় ডাকা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য শোনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৮৫ বছর বয়সে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও পরিবারের সান্নিধ্য। জয়নব ভানুর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁর নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

পানির ওপর চাষ, বছরে আয় ১০ কোটি টাকা!

পিরোজপুর, সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ণ
পানির ওপর চাষ, বছরে আয় ১০ কোটি টাকা!

বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি-দোবরা ও নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্ষায় জলাবদ্ধতা যেখানে অনেকের জীবিকা ও কৃষিকাজের জন্য বড় বাধা, সেখানে সেই পানিকেই কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে উৎপাদন করছেন বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত প্রায় এক কোটি চারা বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ কৃষিকাজকে ঘিরে জীবিকার পথ তৈরি হয়েছে হাজারো পরিবারের।

প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই চাষপদ্ধতি স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পুরুষের পাশাপাশি এতে যুক্ত হয়েছেন নারীরাও। তবে পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক নারী শ্রমিক ও উদ্যোক্তা নিজেদের উদ্যোগ বড় করতে পারছেন না। সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে এ খাতে কর্মসংস্থান ও আয় আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নাজিরপুরের দেউলবাড়ি-দোবরা এবং নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। জলাবদ্ধ জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ কঠিন হলেও পানির ওপর তৈরি বেডে বীজ বুনে চারা উৎপাদন করছেন কৃষকেরা।

লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, বেগুন ও মরিচসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা উৎপাদিত হচ্ছে এসব বেডে। পরে চারা সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। পিরোজপুর ছাড়াও খুলনা, যশোর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এসব চারা কিনে নেন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের সমন্বয়ে এই চাষপদ্ধতি টিকে আছে। সময়ের সঙ্গে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন এলেও এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। তবু ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ে একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেখানে কৃষক, নারী শ্রমিক ও চারার ব্যবসায়ীরা যুক্ত রয়েছেন। নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের কাজের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় অসহায় ও কর্মহীন নারীদেরও যুক্ত করেছেন এই কাজে। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন নারী।

কাজের জায়গায় কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদার ভেতর বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বুনছেন, কেউ আবার অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে রাখছেন। পানির ওপর তৈরি বেডে এভাবেই বেড়ে উঠছে নতুন চারা। এই কাজ নুরজাহানের নিজের আয়ের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও উপার্জনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে উদ্যোগটি আরও বড় করার স্বপ্ন থাকলেও পুঁজির অভাবে এগোতে পারছেন না তিনি। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার ঘাটতিও তাঁর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজ করে আসছি। অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোতে পারতাম। নারীদের কাজ দিতে পারতাম, তারা ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারত। আমি ঘরে বসে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।’

ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে নারীরা শ্রম দেন। কেউ বীজ বোনেন, কেউ চারা তৈরির উপকরণ প্রস্তুত করেন, আবার কেউ অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে রাখেন। কাজের পরিমাণ ও ধরন অনুযায়ী তাঁদের আয় হয়। প্রাথমিক কাজের অংশ হিসেবে এক হাজার দুলালী লতা দিয়ে ম্যাদা তৈরি করলে মজুরি মেলে ১৫০ টাকা।

বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিশ্রম করেও অনেক সময় ২০০ টাকা আয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাধ্য হয়েই তাঁরা এ কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করি। সারাদিন এত পরিশ্রম করেও ২০০ টাকা আয় করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে!’

স্থানীয় নারী শ্রমিকদের মতে, কাজের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁদের অনেকেই নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারবেন। এতে শুধু ব্যক্তিগত আয় বাড়বে না, গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব নারী ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ পান না, তাঁদের জন্য এ খাত বিকল্প জীবিকার পথ খুলে দিতে পারে।

ভাসমান বেডে উৎপাদিত চারার বাজার শুধু পিরোজপুরে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা এসব চারা কিনে নিয়ে নিজেদের জমিতে চাষ করেন। ফলে স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষিকাজেরও যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, ‘এখানে সকাল ছয়টায় কাজ করতে আসি। বেডে চারা রোপণ করি, ওষুধ দিই, লতা পরিষ্কার করি। এখানকার চারা ঢাকা, খুলনা, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ অনেক জায়গায় যায়। প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন জাতের সবজির চারা প্রতিটি ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।’ চারা উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রির কাজেও অনেকে যুক্ত রয়েছেন। এতে উৎপাদক কৃষকদের বাইরেও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পিরোজপুর পৌর শহরে এসব চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে বিভিন্ন জাতের চারা কিনে এনে বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি চারা ৫ থেকে ৭ টাকা দরে কিনে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। তবে পরিবহন খরচ, অবিক্রীত চারা ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে এই দামের পুরো ব্যবধান তাঁর লাভ নয়।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। কৃষি অফিস থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রতি মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় হয়। এই পরিসংখ্যান ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক এবং শ্রমিকদের আয় এক রকম নয়। চারার দাম, উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে তাঁদের প্রকৃত আয় নির্ধারিত হয়।

প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করা ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন এখন স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলাবদ্ধ এলাকাকে কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা যেমন আয়ের পথ তৈরি করেছেন, তেমনি এ উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি, আধুনিক উৎপাদনকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ না থাকায় অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ ছোট পরিসরেই আটকে আছে।

বিশেষ করে নুরজাহানের মতো নারী উদ্যোক্তারা যদি প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পান, তাহলে তাঁরা আরও বেশি নারীকে কাজে যুক্ত করতে পারবেন। এতে নারীদের নিজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে। ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের এই ঐতিহ্যকে টেকসই করতে উৎপাদনের মান উন্নয়ন, বাজারসংযোগ, প্রশিক্ষণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য উপযোগী ঋণসুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। জলাবদ্ধতাকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া এই কৃষিপদ্ধতি প্রমাণ করছে, স্থানীয় জ্ঞান ও শ্রমের সঙ্গে যথাযথ সহায়তা যুক্ত হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

মুচি-ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে অপরাধের খোঁজ, কেন খুন হলেন আলিফ?

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
মুচি-ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে অপরাধের খোঁজ, কেন খুন হলেন আলিফ?

কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন সীমান্ত এলাকায়। উদ্দেশ্য ছিল মাদক কারবার, চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা। অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির সম্পর্কে এমন তথ্য জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রগুলো। অপরাধের তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দেওয়ার পর গুলিতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় এখন তাঁর শেষ অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য শত্রুদের নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

হত্যার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলিফ লিখেছিলেন, ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ……’। কিন্তু সেই তথ্য আর প্রকাশ করা হয়নি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে তাঁর মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছে, কোন অপরাধের তথ্য সামনে আনতে যাচ্ছিলেন তিনি? তাঁর অনুসন্ধান কি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিল?

মাদক কারবার, সীমান্তে চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে আলিফ হত্যার সরাসরি কোনো যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হত্যার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যে কারা রয়েছেন, তা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।

ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ

সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চলে মাদক কারবার, চোরাচালান এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন আলিফ। অপরাধচক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পেতে তিনি কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশ ধারণ করতেন বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। আলিফের মৃত্যুর আগে তাঁর ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজেও অপরাধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত ছিল। হত্যার আগের দিন দেওয়া পোস্টটি এ কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সহকর্মীদের মতে, পোস্টে উল্লেখ করা ‘অপরাধের গডফাদার’ এবং অপ্রকাশিত তথ্যের বিষয়বস্তু শনাক্ত করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে

এ ক্ষেত্রে আলিফের ব্যবহৃত মুঠোফোন, কললিস্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, ব্যক্তিগত নোট এবং সংরক্ষিত প্রতিবেদন পরীক্ষা করে তাঁর শেষ অনুসন্ধানের সূত্র পাওয়া যেতে পারে। তবে এসব তথ্যের কোনোটি এখন পর্যন্ত হত্যার কারণ বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করে না।

আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ

পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কারণে আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

এসব হামলার সঙ্গে তাঁর সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে আগের ঘটনাগুলো এবং হত্যার আগে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ঘোষণা—দুটিকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের মতে, শুধু সরাসরি হামলাকারীকে শনাক্ত করলেই হবে না; আলিফের আগের অনুসন্ধান, তাঁর ওপর হামলার ঘটনাগুলো এবং হত্যার আগে-পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। আগের হামলার ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত হয়ে থাকলে তার নথিও বর্তমান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন

আলিফ হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কিছু অসংগতি পাওয়া যায়।

এর আগে একই নির্বাচন কার্যালয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকের এনআইডি তৈরির অভিযোগে কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। আলিফের ফেসবুক পেজে তাঁর মৃত্যুর আগে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলন নিয়েও পোস্ট করেছিলেন তিনি।

জাতীয় পরিচয়পত্রের অপব্যবহারের প্রভাব ভোটার নিবন্ধনের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। ব্যাংক হিসাব খোলা, মুঠোফোনের সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে পরিচয়পত্র ব্যবহৃত হয়। ফলে ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি তৈরির অভিযোগের সত্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে আলিফের হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে—এমন প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি কারা আবেদন করেছেন, কীভাবে নথি যাচাই হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কারও অনিয়ম ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পুরোনো তথ্যও আলোচনায়

সীমান্ত অপরাধ ও রোহিঙ্গাদের পরিচয়সংক্রান্ত অভিযোগের আলোচনায় কয়েক বছর আগের একটি মাদক মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের বিরুদ্ধে অতীতে মাদকসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক অভিযানে বাবুল, তাঁর রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, মাদক ব্যবসার সুবিধা নিতে বাবুল ওই নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও আত্মীয়দের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।

বর্তমানে বাবুলকে ঘিরে যেসব অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে, তার মধ্যে রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তাঁর আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। তবে অতীতের মাদক মামলার তথ্য কিংবা এসব অভিযোগের কোনোটিই আলিফ হত্যার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে না। এ কারণে পৃথক অভিযোগ ও ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তা অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি।

হত্যার পরিকল্পনায় কারা, তদন্তে সেই প্রশ্ন

সাংবাদিক আলিফ হত্যার ঘটনায় মাঠপর্যায়ের হামলাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সহকর্মীদের মতে, শুধু গুলি চালানো ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; হত্যার পরিকল্পনা, নির্দেশদাতা, অর্থের জোগান এবং ঘটনার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলিফের সহকর্মীরা বলছেন, তাঁর শেষ অনুসন্ধান, আগের হামলার ঘটনা এবং হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার। তাঁদের মতে, আলিফ কোন তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন, তাঁর অনুসন্ধানের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন এবং আগের হামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ, মাদক সরবরাহ ও সীমান্ত অপরাধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

গ্রেপ্তার আসামির এক দিনের রিমান্ড

এদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বর এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এ আদেশ দেন। এর আগে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুর্গাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত ছিল। ঘটনার পর শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরোনো সিনেমা হলের পাশ থেকে সাজিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমশের আলীর ছেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্গাপুরে পুলিশের উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলাতেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ বলেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যার কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পরিবার

আলিফের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে তাঁর সহকর্মীরা অপেক্ষা করছেন, তদন্তে তাঁর শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু এবং হত্যার পেছনের কারণ স্পষ্ট হবে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে সরাসরি হামলাকারীর পাশাপাশি সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে আলিফের আগের ওপর হামলার ঘটনাগুলো, তাঁর শেষ পোস্ট এবং অপ্রকাশিত অনুসন্ধানের তথ্য যাচাই করলে তদন্তে নতুন সূত্র মিলতে পারে। তবে মাদক কারবার, চোরাচালান, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন কিংবা রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ—কোনটির সঙ্গে আলিফ হত্যার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ওপর।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

বাতি-ফ্যান চালিয়েই লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল!

নোয়াখালীর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
বাতি-ফ্যান চালিয়েই লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল!

কয়েকটি বাতি, দুটি ফ্যান, একটি ফ্রিজ আর একটি আইপিএস—একটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ ব্যবহারের সরঞ্জাম বলতে এটুকুই। এসব ব্যবহার করে প্রতি মাসে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসত গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসের বিল এসেছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৯৬ টাকা। বিলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ইউনিট। এমন অস্বাভাবিক বিল হাতে পেয়ে হতবাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারটি।

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নের হরিকৃষ্ণপুর গ্রামের বড় তফদার বাড়িতে ঘটেছে এ ঘটনা। নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাঠানো এই বিলকে ‘ভুতুড়ে’ বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক শহীদুল ইসলাম ওরফে রনি। তাঁর দাবি, নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আসার পরও হঠাৎ এত বড় অঙ্কের বিল পাঠানো হয়েছে, যা তাঁদের স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পাঁচ মাসে গড় ব্যবহার ১৮৭ ইউনিট, সেপ্টেম্বরে দেখানো ৬ হাজার

ভুক্তভোগী শহীদুল ইসলাম জানান, গত পাঁচ মাস ধরে তাঁদের বাড়িতে প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৮৭ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। সেই হিসাবে সাধারণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে নিয়মিত বিলও এসেছে তুলনামূলক কম। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের বিলে হঠাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ইউনিট।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মিটারটি নিবন্ধিত রয়েছে ওই বাড়ির মৃত আবু তাহেরের নামে। বর্তমানে মিটারটি ব্যবহার করছেন তাঁর নাতি শহীদুল ইসলাম। সেপ্টেম্বর মাসের বিলের সঙ্গে ভ্যাট ও বিলম্ব মাশুল যোগ করে মোট পাওনা দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৯৬ টাকা। শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আসছি। চলতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের কপি হাতে পেয়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। সাধারণ বাতি-ফ্যান চালিয়ে কীভাবে এক লাখ টাকার বেশি বিল আসতে পারে?’ তাঁর অভিযোগ, বিল প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এমন অস্বাভাবিক বিল তৈরি হয়েছে।

বিল সংশোধনে গ্রাহককেই কার্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ

অস্বাভাবিক বিল হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি বিদ্যুৎ বিল বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্মীকে জানান শহীদুল ইসলাম। এ সময় তাঁকে চাটখিল আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে বিল সংশোধন করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ পরামর্শে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, বিল তৈরিতে কর্তৃপক্ষের ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য গ্রাহককে কেন বারবার কার্যালয়ে যেতে হবে? শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘তারা ভুল করবে, আর আমরা তা সংশোধনের জন্য তাদের দরজায় দরজায় ঘুরব—এটি কোন ধরনের কথা? আমি চাই, এই গাফিলতির জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

ভুল স্বীকার পল্লী বিদ্যুতের, মিটার পরীক্ষার আশ্বাস

এ বিষয়ে নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাটখিল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জুনায়েদুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি প্রথমে বিলের কপি না দেখে মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে গ্রাহকের মূল বিলের কপি পাঠানো হলে তিনি বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে বলে স্বীকার করেন। তিনি জানান, শিগগিরই সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে মিটার পরীক্ষা করা হবে। এরপর দ্রুত বিল সংশোধন করে দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

ভুল বিলের দায় ও গ্রাহক ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন

সাধারণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে লাখ টাকার বেশি বিল আসার ঘটনায় বিল প্রস্তুত ও মিটার রিডিংয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আগের মাসগুলোর গড় ব্যবহার যেখানে ১৮৭ ইউনিট, সেখানে এক মাসে ৬ হাজার ইউনিট ব্যবহারের হিসাব কীভাবে তৈরি হলো, তা যাচাই করা জরুরি। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মিটার পরীক্ষা ও বিল সংশোধনের আশ্বাস দিলেও সংশোধিত বিল কবে দেওয়া হবে এবং এ ঘটনায় কোনো কর্মীর গাফিলতি ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। অস্বাভাবিক বিলের কারণে গ্রাহককে যেন অযথা আর্থিক চাপ ও ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা ভুক্তভোগী পরিবারের।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি