ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
পোশাকের দাম কমিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে রপ্তানি আয় ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের দাম কমানোর পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। এতে দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ আট মাসে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৫৭ কোটি ৬৫ লাখ ইউরো।
দাম কমিয়েও বাড়েনি রপ্তানি
রপ্তানি আয় ধরে রাখতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা পোশাকের গড় দাম কমিয়েছেন। গত বছরের প্রথম আট মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে দাম কমানোর পরও রপ্তানির পরিমাণ বাড়েনি। বরং গত বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইউরোপে বাংলাদেশ ৯০ কোটি ৮৩ লাখ ৭০ হাজার কেজি পোশাক রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজিতে। এতে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে মন্দা, বাংলাদেশের পতন বেশি
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি পোশাক আমদানির মোট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে সামগ্রিকভাবে পোশাকের চাহিদা ও আমদানি কমেছে। তবে বৈশ্বিক আমদানি মূল্য কমার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতন অনেক বেশি।
ইউরোপের বাজারে সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী চীনের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পঞ্চম বৃহত্তম সরবরাহকারী ভিয়েতনামের আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি পোশাকের গড় দামও বাড়িয়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী তুরস্কের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতের আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া কম্বোডিয়ার রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, পাকিস্তানের ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশ। তবে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বাড়লেও বাংলাদেশের আয় কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ব্যবধান আরও বেড়েছে।
কম দামের কৌশল কেন কাজে আসছে না
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম এখনো ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ভারতের তুলনায় কম। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নে সব দেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের গড় দামও বাংলাদেশের পোশাকের চেয়ে বেশি। এরপরও কম দাম দিয়ে বাজার ধরে রাখার কৌশল প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের আমদানি ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রেতারা দাম কমানোর সুযোগ নিচ্ছেন। অন্য দেশগুলোও কম দামে পোশাক সরবরাহ করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল দাম কমিয়ে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে চীন ইউরোপের বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং আক্রমণাত্মক দামে পোশাক সরবরাহ করছে। চীনের সঙ্গে এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং সংকটে উৎপাদন ব্যাহত
দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন ফজলুল হক। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা এবং কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পোশাকের নকশা ও ধরনে বৈচিত্র্য আনা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। ফজলুল হক সতর্ক করে বলেন, আগামী দিনে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিন্যাসসহ আরও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তাই তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে এখন থেকেই সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
বাজারে পুনরুদ্ধারের আভাস, তবে রয়েছে শঙ্কা
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএএই) ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রধান নির্বাহী মো. মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বছরের শুরুতে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি আয় কমার যে প্রবণতা ছিল, জুলাই-আগস্টে তা কিছুটা কমেছে।
বিএভির পর্যালোচনা তুলে ধরে তিনি জানান, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছিল। তবে সংস্থাটির হিসাবে, মে-আগস্ট সময়ে ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় আমদানি প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। তাঁর মতে, বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও তীব্র ও বিস্তৃত হলে এই পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মহিউদ্দিন রুবেলের আশঙ্কা, যুদ্ধের প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক পোশাকবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। বাজার ধরে রাখতে শুধু দাম কমানো নয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং নীতিগত সহায়তা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]