খুঁজুন
                               
, ,
           

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৬ অপরাহ্ণ
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

পোশাকের দাম কমিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে রপ্তানি আয় ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের দাম কমানোর পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। এতে দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ আট মাসে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৫৭ কোটি ৬৫ লাখ ইউরো।

দাম কমিয়েও বাড়েনি রপ্তানি
রপ্তানি আয় ধরে রাখতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা পোশাকের গড় দাম কমিয়েছেন। গত বছরের প্রথম আট মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে দাম কমানোর পরও রপ্তানির পরিমাণ বাড়েনি। বরং গত বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইউরোপে বাংলাদেশ ৯০ কোটি ৮৩ লাখ ৭০ হাজার কেজি পোশাক রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজিতে। এতে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

বিশ্ববাজারে মন্দা, বাংলাদেশের পতন বেশি
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি পোশাক আমদানির মোট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে সামগ্রিকভাবে পোশাকের চাহিদা ও আমদানি কমেছে। তবে বৈশ্বিক আমদানি মূল্য কমার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতন অনেক বেশি।

ইউরোপের বাজারে সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী চীনের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পঞ্চম বৃহত্তম সরবরাহকারী ভিয়েতনামের আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি পোশাকের গড় দামও বাড়িয়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী তুরস্কের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতের আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া কম্বোডিয়ার রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, পাকিস্তানের ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশ। তবে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বাড়লেও বাংলাদেশের আয় কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ব্যবধান আরও বেড়েছে।

কম দামের কৌশল কেন কাজে আসছে না
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম এখনো ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ভারতের তুলনায় কম। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নে সব দেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের গড় দামও বাংলাদেশের পোশাকের চেয়ে বেশি। এরপরও কম দাম দিয়ে বাজার ধরে রাখার কৌশল প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের আমদানি ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রেতারা দাম কমানোর সুযোগ নিচ্ছেন। অন্য দেশগুলোও কম দামে পোশাক সরবরাহ করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল দাম কমিয়ে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে চীন ইউরোপের বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং আক্রমণাত্মক দামে পোশাক সরবরাহ করছে। চীনের সঙ্গে এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং সংকটে উৎপাদন ব্যাহত
দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন ফজলুল হক। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা এবং কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পোশাকের নকশা ও ধরনে বৈচিত্র্য আনা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। ফজলুল হক সতর্ক করে বলেন, আগামী দিনে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিন্যাসসহ আরও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তাই তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে এখন থেকেই সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

বাজারে পুনরুদ্ধারের আভাস, তবে রয়েছে শঙ্কা
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএএই) ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রধান নির্বাহী মো. মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বছরের শুরুতে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি আয় কমার যে প্রবণতা ছিল, জুলাই-আগস্টে তা কিছুটা কমেছে।

বিএভির পর্যালোচনা তুলে ধরে তিনি জানান, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছিল। তবে সংস্থাটির হিসাবে, মে-আগস্ট সময়ে ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় আমদানি প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। তাঁর মতে, বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও তীব্র ও বিস্তৃত হলে এই পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মহিউদ্দিন রুবেলের আশঙ্কা, যুদ্ধের প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক পোশাকবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।  ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। বাজার ধরে রাখতে শুধু দাম কমানো নয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং নীতিগত সহায়তা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

অফিসের চাপে এই ৫ অভ্যাস অজান্তেই বাড়াতে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

লাইফস্টাইল ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৯ অপরাহ্ণ
অফিসের চাপে এই ৫ অভ্যাস অজান্তেই বাড়াতে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

সকালে তাড়াহুড়ো করে অফিসে যাওয়া, কাজের চাপে দুপুরের খাবার বাদ দেওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকা—ব্যস্ত কর্মজীবনে এমন অভ্যাস অনেকেরই নিত্যদিনের সঙ্গী। দিনের কাজ শেষ হতে হতে রাত হয়ে যায়। এরপর দেরিতে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়াও নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়। সময়ের অভাবে এসব অভ্যাসকে স্বাভাবিক মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং অপর্যাপ্ত ঘুমসহ কিছু জীবনযাপন-সংক্রান্ত বিষয় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, ওজন বেশি কিংবা অন্যান্য ঝুঁকির কারণ আছে, তাঁদের দৈনন্দিন অভ্যাসের বিষয়ে আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

শুধু কী খাচ্ছেন, তা-ই নয়; কখন খাচ্ছেন, কতটা নড়াচড়া করছেন এবং পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাস
অফিসে একটানা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা অনেকের পেশাগত জীবনের অংশ। কিন্তু দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটালে শারীরিক কার্যক্রম কমে যায়। নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়ামের অভাব থাকলে এই নিষ্ক্রিয়তা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

শরীরের পেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়তা পাওয়া যায়। বিপরীতে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে থাকলে ইনসুলিন প্রতিরোধের আশঙ্কা বাড়তে পারে। এ অবস্থায় শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া দিতে পারে না, ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই কাজের ফাঁকে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানো, অল্প সময় হাঁটা কিংবা সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার করার মতো ছোট অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী হতে পারে।

দুপুরের খাবার বাদ দেওয়া ও অনিয়মিত সময়ে খাওয়া
কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেকেই সময়মতো খাবার খান না। কেউ দুপুরের খাবার বাদ দেন, কেউ আবার ক্ষুধা লাগলে চা, বিস্কুট কিংবা অন্যান্য হালকা খাবার খেয়ে কাজ চালিয়ে যান। পরে একসঙ্গে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের অনিয়ম সবার ক্ষেত্রে একই প্রভাব ফেলে না। তবে দীর্ঘদিন অসামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বজায় থাকলে সুষম পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

কর্মব্যস্ততার মধ্যেও খাবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা ভালো। সম্ভব হলে বাড়ি থেকে সুষম খাবার নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। খাবারে শাকসবজি, ডাল, পরিমিত পরিমাণে শর্করাজাতীয় খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন রাখার চেষ্টা করা উচিত। অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।

রাত করে খাবার খাওয়ার অভ্যাস
কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় অনেকের রাতের খাবার খাওয়ার সময় পিছিয়ে যায়। কখনো রাত জেগে কাজ করার কারণে ক্ষুধা বেড়ে যায়, ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসক নিরাজ কুমার সেল মেটাবলিজম সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা ওই গবেষণায় দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে ক্ষুধা বৃদ্ধি, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের পরিবর্তন এবং জেগে থাকা অবস্থায় শক্তি ব্যয়ের হার কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে গবেষণার ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমন নয়। তারপরও নিয়মিত খাবারের সময় বজায় রাখা এবং ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।

ঘুমের ঘাটতি ও অনিয়মিত রুটিন
কাজের চাপ, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকা কিংবা রাত জেগে কাজ করার কারণে অনেকের ঘুমের সময় কমে যায়। দিনের পর দিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী প্রক্রিয়া, শরীরের বিপাক এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে।

অপর্যাপ্ত ঘুম ও অনিয়মিত ঘুমের রুটিন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি শুধু ঘুমের ওপর নির্ভর করে না; বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যক্রমসহ একাধিক বিষয় এতে ভূমিকা রাখে।

তাই প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা ভালো।

ব্যায়ামের জন্য সময় না রাখা
অনেকেই মনে করেন, ব্যস্ত রুটিনে আলাদা করে ব্যায়ামের সময় বের করা সম্ভব নয়। কিন্তু শারীরিক কার্যক্রমের জন্য সব সময় দীর্ঘ সময় বরাদ্দ করতে হবে, এমন নয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে হাঁটা এবং নিয়মিত নড়াচড়া করাও কাজে আসতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত। দ্রুত হাঁটা এর একটি উদাহরণ। ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী কার্যক্রমের ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বিরতি নিয়ে হাঁটা, কাছাকাছি দূরত্বে সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া এবং অবসর সময়ে নিয়মিত শরীরচর্চা করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণেও উপকার মিলতে পারে।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বুঝতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে কেউ কেউ দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়েছে। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে এসব লক্ষণ না থাকলেও ঝুঁকির কারণ থাকলে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজনে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলও পরীক্ষা করতে হবে।

কাজের চাপ থাকলেও অভ্যাসে আনুন পরিবর্তন
কর্মজীবনের ব্যস্ততা সব সময় এড়ানো সম্ভব নয়। তবে কাজের ফাঁকে নিয়মিত নড়াচড়া করা, খাবারের সময় নির্ধারণ, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে তোলা যায়।

মনে রাখতে হবে, কোনো একটি অভ্যাসই একা ডায়াবেটিসের কারণ নয়। আবার স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেই যে ডায়াবেটিস কখনো হবে না, এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এসব পদক্ষেপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কাজের চাপের কারণে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া যেন অবহেলিত না হয়। কারণ কর্মব্যস্ততার মধ্যেও সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/জেএন

অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শোনালে কী করবেন?

লাইফস্টাইল ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০২ অপরাহ্ণ
অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শোনালে কী করবেন?

‘তোমার বয়সী সবাই চাকরি করছে, তুমি এখনো কী করছ?’ কিংবা ‘অমুকের বিয়ে হয়ে গেছে, তোমার কবে?’—পরিবারের অনুষ্ঠান, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা পরিচিতজনের আড্ডায় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অনেককে। প্রশ্নগুলো কখনো কৌতূহল থেকে করা হলেও বারবার একই ধরনের মন্তব্য শুনতে শুনতে অনেকের মধ্যে তৈরি হয় অস্বস্তি, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।

সমস্যা আরও বাড়ে যখন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত অন্য কারও সাফল্য বা অর্জনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কে আগে চাকরি পেলেন, কার বিয়ে হলো, কে কত আয় করছেন—এসব দিয়ে একজন মানুষের জীবনের সাফল্য বিচার করা যায় না। কারণ প্রত্যেকের পরিস্থিতি, সুযোগ, সামর্থ্য ও লক্ষ্য আলাদা।

তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শুনলে মন খারাপ না করে পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল জানা জরুরি। নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখা, ভদ্রভাবে জবাব দেওয়া এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমারেখা তৈরি করার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই সামলানো সম্ভব।

অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাবেন না
কেউ আপনার আগে চাকরি পেয়েছেন, বিয়ে করেছেন কিংবা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন—এ কারণে আপনি পিছিয়ে পড়েছেন, এমন নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপ সবার জন্য একই সময়ে আসে না। কারও পড়াশোনা শেষ করতে সময় লাগে, কেউ পরিবারের দায়িত্ব সামলান, আবার কেউ নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে চান।

অন্যের অর্জনকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে নিজের অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দিন। আপনি কোথায় ছিলেন, এখন কোথায় আছেন এবং সামনে কী করতে চান—এসব বিবেচনা করুন। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার বদলে নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না
বিয়ে, চাকরি, আয় কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত বিষয়ে কতটুকু জানাবেন, তা আপনার সিদ্ধান্ত।

কেউ অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলে শান্তভাবে বলতে পারেন, ‘সময় হলে জানাব’, ‘নিজের মতো করে চেষ্টা করছি’ কিংবা ‘এটা নিয়ে আপাতত কথা বলতে চাই না।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েও ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা যায়।

মনে রাখবেন, নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা না করতে চাওয়া মানেই কাউকে অসম্মান করা নয়।

রাগের মাথায় পাল্টা জবাব নয়
একই ধরনের কথা বারবার শুনলে বিরক্তি বা রাগ হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে কাছের মানুষ যখন অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন কষ্ট আরও বেশি হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা অপমান করে কথা বললে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে জবাব দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ থামুন। ধীরে শ্বাস নিন, নিজেকে শান্ত করুন এবং প্রয়োজন হলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন। আবেগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সহজ হয়।

অন্যের মন্তব্য আপনার জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না—এই বিষয়টি মনে রাখাও জরুরি।

ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে বলুন
কেউ বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা করলে চুপ করে সব সহ্য করা কিংবা ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়াই একমাত্র পথ নয়। শান্তভাবে নিজের অবস্থান জানানো যেতে পারে।

যেমন বলতে পারেন, ‘সবার পরিস্থিতি এক রকম নয়। প্রত্যেকে নিজের মতো করে এগিয়ে যায়।’ আবার বলা যায়, ‘ওর জন্য ভালো হয়েছে, আমিও নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি।’

এ ধরনের উত্তর অন্যের সাফল্যকে ছোট না করেই নিজের অবস্থান তুলে ধরতে সাহায্য করে। এতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে না জড়িয়েও কথোপকথন সামলানো যায়।

লোকের কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবেন না
সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই বিয়ে, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে নিজের প্রস্তুতি ও পছন্দের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবেন। শুধু মানুষের প্রশ্ন বা সমালোচনা বন্ধ করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

বিয়ের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছা, মানসিক প্রস্তুতি ও উপযুক্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। চাকরি বা ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও অন্যের সঙ্গে তুলনা করে হতাশ হওয়ার পরিবর্তে নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটি কি সত্যিই আমার চাওয়া, নাকি অন্যের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা? এই প্রশ্নের উত্তর নিজের প্রয়োজন বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

বারবার খোঁচা দিলে সীমারেখা তৈরি করুন
কেউ আপনার অস্বস্তি বোঝার পরও একই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করলে স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন যে বিষয়টি আপনার ভালো লাগছে না।

বলতে পারেন, ‘আপনারা আমার ভালো চান, সেটা বুঝি। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা হলে আমি অস্বস্তি বোধ করি। সময় হলে নিজেই জানাব।’

নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা অভদ্রতা নয়। বরং সম্মান বজায় রেখে ব্যক্তিগত বিষয়ে অযাচিত আলোচনা কমানোর একটি উপায়। তবে সবাই আপনার বক্তব্য বুঝবেন বা মেনে নেবেন, এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।

নিজের যোগ্যতা অন্যের মন্তব্য দিয়ে বিচার করবেন না
কারও ভালো চাকরি হয়েছে কিংবা কারও বিয়ে হয়ে গেছে বলে তিনি আপনার চেয়ে বেশি সফল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। জীবনের সাফল্য শুধু বিয়ে, চাকরি কিংবা আয় দিয়ে মাপা যায় না।

আপনি কী শিখছেন, নিজের দায়িত্ব কতটা পালন করছেন, নতুন কী দক্ষতা অর্জন করছেন এবং নিজের জীবনে কী পরিবর্তন আনছেন—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের মন্তব্যকে নিজের যোগ্যতার চূড়ান্ত বিচার হিসেবে না দেখে বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করুন।

নিজের ছোট ছোট অগ্রগতিও স্বীকার করুন। এতে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে মনোযোগ দেওয়া সহজ হতে পারে।

প্রয়োজন হলে কথোপকথন থেকে সরে আসুন
সবাই আপনার পরিস্থিতি বুঝবেন, এমন নয়। শান্তভাবে বোঝানোর পরও কেউ যদি একই বিষয়ে খোঁচা দিতে থাকেন, তাহলে বারবার নিজেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

প্রয়োজনে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলুন, অন্য কারও সঙ্গে সময় কাটান কিংবা সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরে আসুন। কোনো আলোচনা যদি বারবার মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে সেই আলোচনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখাও যুক্তিসংগত।

এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়মিত মানসিক চাপ, হতাশা কিংবা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

নিজের জীবন নিজের গতিতে এগিয়ে নিন
অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শুনলে মন খারাপ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন, পছন্দ ও সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করার দরকার নেই।

নিজেকে সামলানো মানে সব কথা মেনে নেওয়া কিংবা চুপ করে থাকা নয়। বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে নিজের অবস্থান বোঝানো, প্রয়োজনমতো সীমারেখা তৈরি করা এবং নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের মন্তব্য সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই মন্তব্যের জবাবে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন, তা অনেকটাই আপনার হাতে। অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলানোর বদলে নিজের পথকে গুরুত্ব দিন—কারণ আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনারই।

কালের আলো/এএএন/জেএন

ঋণ করে বিদেশযাত্রা, ফিরল না স্বজনের লাশ

টাঙ্গাইল সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০১ অপরাহ্ণ
ঋণ করে বিদেশযাত্রা, ফিরল না স্বজনের লাশ

কাঠমিস্ত্রির সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল পবিত্র চন্দ্রের। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে শেষ সম্বল স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করেন। বিভিন্ন এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। স্বপ্ন ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন, ঋণের বোঝা কমাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে পড়তে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে। সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এখন স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।

শেষ ফোনে জানিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর কথা
পবিত্র চন্দ্রের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মজিদপুর গ্রামে। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান পবিত্রের বিদেশযাত্রার পেছনে ছিল পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েক দিন তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে একটি হোটেলে রাখা হয়েছে। কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু কিছুদিন পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। স্বজনদের দাবি, গত ২৯ মে ফোন করে পবিত্র জানান, অন্য কয়েকজনের সঙ্গে তাকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। ওই সময় তিনি মৃত্যুর আশঙ্কা ৯৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ পাননি স্বজনেরা। পরবর্তী সময়ে বেঁচে ফেরা সহযাত্রীদের কাছ থেকে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন পবিত্র। যে মানুষটি পরিবারের অভাব ঘোচানোর আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুতে এখন দিশেহারা স্বজনেরা।

একই উপজেলার আরও দুই পরিবারের অনিশ্চয়তা
পবিত্রের মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে গোপালপুরের আরও দুই পরিবারের। উপজেলার আলমনগর ইউনিয়নের বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম এবং নগদা সিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলামের পরিণতি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাননি তাদের স্বজনেরা।

উপার্জনক্ষম স্বজনদের খোঁজ না পেয়ে পরিবারগুলো চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে। কেউ ঋণ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়ে এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আবার কেউ প্রিয়জন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন—সেই নিশ্চিত খবরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। স্বজনদের এই অপেক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক সংকট। বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ একদিকে, অন্যদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক ও নিখোঁজ থাকার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন পরিবারগুলো।

চাকরির প্রতিশ্রুতিতে রাশিয়ায় যান ৩০ বাংলাদেশি
কাজের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের মধ্যে পবিত্র, নজরুল ও আমিনুলের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরও বহু পরিবারের সদস্যরা।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গত ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গত ৭ মে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। সংস্থাটির অভিযোগ, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের প্রতিশ্রুত চাকরি দেওয়া হয়নি। বরং পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

স্বল্প প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ
এসআরবির অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে ওই বাংলাদেশিদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে আরও তিনজন মারা যান। এ ছাড়া দুজন আহত হয়ে রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ভাগ্যক্রমে দুজন বাংলাদেশে ফিরতে পেরেছেন। তবে এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার বক্তব্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা প্রত্যেক বাংলাদেশির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে ঋণের বোঝা
বিদেশে কাজের মাধ্যমে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন পবিত্র চন্দ্রসহ ওই বাংলাদেশিরা। পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর তাদের এমন পরিণতি স্বজনদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবার এখন শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আর যারা নিখোঁজ কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে রয়েছেন, তাদের স্বজনদের কাছে প্রতিটি দিন কাটছে উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষায়। কাজের আশায় বিদেশে যাওয়া এসব মানুষের পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া—প্রিয়জনের নিশ্চিত খবর এবং এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির পথ।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি