খুঁজুন
                               
, ,
           

ছোট্ট দোয়েল যেভাবে হয়ে উঠল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অংশ

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৮ অপরাহ্ণ
ছোট্ট দোয়েল যেভাবে হয়ে উঠল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অংশ

ভোরের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে সুমিষ্ট ডাক। গাছের ডালে বসে কালো-সাদা ছোট্ট পাখিটির সেই সুর চেনেন অনেকেই। এটি দোয়েল—বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। আকারে ছোট হলেও এ পাখি বাঙালির প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচিতির সঙ্গে মিশে আছে গভীরভাবে। কিন্তু দেশের জাতীয় পাখি হিসেবে দোয়েলকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? এর পেছনে রয়েছে পাখিটির সহজ পরিচিতি, সুরেলা ডাক এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।

স্বাধীনতার পর জাতীয় পাখি হিসেবে দোয়েল
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন নিজস্ব জাতীয় পরিচিতি ও প্রতীকগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করছিল, তখন দোয়েল জায়গা করে নেয় জাতীয় পাখির মর্যাদায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কাজী জাকের হোসেন এ পাখিকে জাতীয় পাখি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে দোয়েল নির্বাচনের পেছনে একটিমাত্র কারণ ছিল—এমনটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন। পাখিটির পরিচিতি, সুরেলা ডাক এবং দেশের প্রকৃতির সঙ্গে এর সহজাত সম্পর্ক একে বিশেষভাবে স্বতন্ত্র করেছে। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন পরিবেশে দোয়েলের উপস্থিতিও এর পরিচিতি বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে।

কালো-সাদা রূপ, সুরেলা ডাক
দোয়েলের বৈজ্ঞানিক নাম Copsychus saularis। ছোট আকৃতির এই পাখির পুরুষটির শরীরের ওপরের অংশ সাধারণত কালো এবং বুক ও পেট সাদা। স্ত্রী পাখির রং তুলনামূলক ধূসর। লম্বায় প্রায় ২০ সেন্টিমিটারের এই পাখিকে চেনা যায় এর স্বতন্ত্র রং, লেজের নড়াচড়া এবং সুরেলা ডাকের মাধ্যমে।

দোয়েলের অন্যতম আকর্ষণ তার কণ্ঠ। ভোরবেলায় এর ডাক বিশেষভাবে শোনা যায়। বিভিন্ন সুরে ডাকতে পারে পাখিটি; কখনো অন্য পাখির ডাকের অনুকরণও করে। বাংলার প্রকৃতি ও লোকজ জীবনে দোয়েলের এই সুরেলা উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত।

প্রকৃতির বন্ধু দোয়েল
দোয়েল সাধারণত মাটিতে নেমে খাবার খোঁজে। পোকামাকড়, শুঁয়োপোকা ও অন্যান্য ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী এর খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাগান, উঠান কিংবা গাছপালার আশপাশে খাবার খুঁজতে দেখা যায় এই পাখিকে। ক্ষতিকর কিছু পোকামাকড় খাওয়ার মাধ্যমে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে।

এ পাখি সাধারণত গাছের কোটর, দেয়ালের ফাঁক কিংবা উপযুক্ত গোপন স্থানে বাসা বাঁধে। ডিম ও ছানার যত্নে মা-বাবা উভয় পাখিই ভূমিকা রাখে। প্রজননের সময় নিরাপদ আশ্রয় ও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া দোয়েলের বংশবিস্তারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় পাখি হয়েও কি নিরাপদ দোয়েল?
জাতীয় পাখির মর্যাদা থাকলেও দোয়েলের আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস রক্ষা করা জরুরি। নগরায়ণের ফলে গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে গেলে পাখিটির খাবার খোঁজা এবং বাসা তৈরির উপযুক্ত স্থানও সীমিত হতে পারে। কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার পোকামাকড়ের প্রাপ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে, যা পোকাভুক পাখিদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তবে দেশের সর্বত্র দোয়েলের সংখ্যা কমে গেছে বা এটি নিশ্চিতভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য জরিপ ও সংরক্ষণসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে পাখিটির উপস্থিতি কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও তা দিয়ে পুরো দেশের পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যায় না।

দোয়েলকে রক্ষা করা কেন জরুরি?
জাতীয় পাখি হিসেবে দোয়েল শুধু একটি প্রতীক নয়; এটি দেশের জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। বাড়ির আশপাশে গাছপালা রাখা, পাখির বাসা নষ্ট না করা, অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং পাখির নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণে সচেতন হওয়া—এসব উদ্যোগ দোয়েলসহ অন্যান্য দেশীয় পাখির জন্য সহায়ক হতে পারে।

দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে চেনা সহজ, কিন্তু এর অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্বও আমাদের। ভোরের সেই সুরেলা ডাক যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শুনতে পায়, সে জন্য প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। সূত্র: বার্ড ক্লাব বাংলাদেশ

কালের আলো/এসএ/জেএন

আড়াই বছর ধরে ফসলের মাঠে বিদ্যুতের মরণফাঁদ

কুমিল্লা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৯ অপরাহ্ণ
আড়াই বছর ধরে ফসলের মাঠে বিদ্যুতের মরণফাঁদ

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলায় ফসলি জমির ওপর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হেলে পড়ে আছে পল্লী বিদ্যুতের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাইনের তিনটি খুঁটি। প্রায় আড়াই বছর ধরে খুঁটিগুলো এ অবস্থায় থাকলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। খুঁটির ওপর থাকা বিদ্যুতের তারও মাটির খুব কাছাকাছি ঝুলে থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।

উপজেলার উত্তরহাওলা ইউনিয়নের উত্তর ফেনুয়া ও দক্ষিণ ফেনুয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ ফেনুয়া এলাকায় শামীম রাইস মিলের দক্ষিণ পাশে ফসলি জমির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পল্লী বিদ্যুতের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেইন লাইন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই বছর আগে ওই লাইনের একটি খুঁটি বিপজ্জনকভাবে ফসলি জমির ওপর হেলে পড়ে। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসকে জানানো হলে খুঁটিটি সোজা করার পরিবর্তে পাশে আরেকটি খুঁটি বসিয়ে কোনোমতে ঠেকনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে একই লাইনের আরও দুটি খুঁটি হেলে পড়ে। এরপর থেকে তিনটি খুঁটিই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। খুঁটিগুলোর ওপর থাকা বিদ্যুতের তারও মাটি থেকে খুব কাছাকাছি ঝুলে আছে। ফলে জমিতে কৃষিকাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, জমিতে হালচাষ, সেচ দেওয়া ও ফসল কাটার সময় তাঁদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। বিদ্যুতের খুঁটি ও ঝুলে থাকা তারের কারণে তাঁরা সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন। কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে কৃষি মৌসুমে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার কিংবা হালচাষে ব্যবহৃত গবাদিপশু নিয়ে জমিতে চলাচলের সময় ঝুলে থাকা তারের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষক, শ্রমিক ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রাণী—সবকিছুর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বর্ষা মৌসুমে জমিতে পানি জমলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে কেউ এলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারেন মাঠে কাজ করা মানুষ।

স্থানীয় কৃষক শামীম বলেন, “আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে মাঠে কাজ করি। আশপাশের ঘরবাড়ির মানুষও নিজেদের জমিতে যেতে ভয় পান। একটু অসাবধান হলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।” দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় খুঁটিগুলো পড়ে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ফসলি জমিতে নিরাপদে যাতায়াত ও কৃষিকাজ নিশ্চিত করতে বিদ্যুতের লাইনটি দ্রুত মেরামত করা জরুরি।

এ বিষয়ে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর নাথেরপেটুয়া সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আহসান হাবীব বলেন, শিগগিরই সরেজমিনে পরিদর্শন করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা খুঁটিগুলো কবে নাগাদ মেরামত করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। এখন স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত হেলে পড়া খুঁটিগুলো সোজা করা হবে এবং ঝুলে থাকা তার নিরাপদ উচ্চতায় স্থাপন করা হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

রপ্তানি কমছে, তবু ইউরোপের ডেনিমে এক নম্বর বাংলাদেশ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০১ অপরাহ্ণ
রপ্তানি কমছে, তবু ইউরোপের ডেনিমে এক নম্বর বাংলাদেশ

ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের শীর্ষস্থান অটুট, কিন্তু রপ্তানি আয়ের ধারায় স্বস্তি নেই। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি কমেছে ৫.৮৫ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে বাজার হিস্যা। তবে আগস্টে রপ্তানি বেড়েছে ১২.৭১ শতাংশ, যা দীর্ঘ সময়ের মন্দা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো প্রধান প্রতিযোগীদের রপ্তানিতে পতন, অন্যদিকে মিসর ও চীনের দ্রুত উত্থান—সব মিলিয়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

  • আট মাসে রপ্তানি কমেছে ৫.৮৫ শতাংশ, বাজার হিস্যা নেমেছে ২৯.৪ শতাংশে; আগস্টে ঘুরেছে প্রবৃদ্ধির চাকা
  • পাকিস্তানের চেয়ে রপ্তানি আয় ৩৪ কোটি ইউরো বেশি; তবে মিসর-চীনের উত্থানে বাড়ছে প্রতিযোগিতার চাপ

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউতে বাংলাদেশ থেকে ডেনিম আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ইউরো। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ৩১ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। শুধু রপ্তানির অঙ্কেই নয়, বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বেও এই পতনের ছাপ পড়েছে। ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা গত বছরের প্রায় ২৯.৯ শতাংশ থেকে কমে ২৯.৪ শতাংশে নেমেছে।

রপ্তানি কমছে আরও বেশি
ইউরোপের ডেনিম বাজারে চাহিদার দুর্বলতা বাংলাদেশের রপ্তানি কমার অন্যতম প্রেক্ষাপট। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর মোট ডেনিম আমদানি কমেছে ৪.৪০ শতাংশ। আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ইউরো। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৫.৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারের সামগ্রিক সংকোচনের চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের হার বেশি। এই ব্যবধানই বাজার হিস্যা কমার ব্যাখ্যা দেয়। ইউরোপে ডেনিমের চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব সব সরবরাহকারীর ওপর পড়লেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে সেই অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বাজারের অংশীদারত্ব বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আগস্টে স্বস্তি, ফিরছে কি প্রবৃদ্ধি?
আট মাসের হতাশাজনক হিসাবের মধ্যে ব্যতিক্রম আগস্ট। ওই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি বেড়ে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ইউরো হয়েছে। গত বছরের আগস্টে এ আয় ছিল ১১ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। সেই হিসাবে প্রবৃদ্ধি ১২.৭১ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১.২৩ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে আমদানি বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে আরও দ্রুত হারে।

এর ফলে আগস্টে ইইউর ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা ৩০.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১.২ শতাংশ হয়েছে। তবে এক মাসের এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির মোড় ঘুরেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। বরং আগস্টের ইতিবাচক ধারা পরবর্তী মাসগুলোতেও বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে বাংলাদেশের রপ্তানি পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

পাকিস্তানের চেয়ে বড় ব্যবধান, চাপে তুরস্কও
প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো বেশ শক্তিশালী। ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেনিম সরবরাহকারী পাকিস্তানের রপ্তানি জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ৭.৮৮ শতাংশ কমে ৫২ কোটি ৫৫ লাখ ইউরো হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির রপ্তানি আয়ের ব্যবধান ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ইউরো।

তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী তুরস্কের পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল। আট মাসে দেশটির ডেনিম রপ্তানি ২১.০৮ শতাংশ কমে ৪৩ কোটি ৮৩ লাখ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। ইইউর বাজারে তুরস্কের হিস্যা ১৪.৮২ শতাংশ। এ ছাড়া তিউনিশিয়ার রপ্তানি কমেছে ৬.৪৪ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৬.৪৭ শতাংশ এবং মরক্কোর ১৪.৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো প্রধান সরবরাহকারীদের বেশ কয়েকটি দেশই ইউরোপের বাজারে রপ্তানি সংকোচনের মুখে রয়েছে। তবে প্রতিযোগীদের রপ্তানি কমে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করবে না; নিজেদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনাই এখানে মূল বিষয়।

মিসর-চীনের উত্থানে বদলাচ্ছে প্রতিযোগিতা
ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে মিসরের রপ্তানি ৩১.৪৬ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৮১ লাখ ইউরো হয়েছে। চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১৭.৭০ শতাংশ, যার মূল্য ১৯ কোটি ৭১ লাখ ইউরো।

ছোট পরিসর থেকে প্রবৃদ্ধির দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে ভিয়েতনাম ও ভারতও। আট মাসে ভিয়েতনামের রপ্তানি ৪৫.৩৮ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো এবং ভারতের রপ্তানি ১৮.৬২ শতাংশ বেড়ে ৩ কোটি ১৪ লাখ ইউরো হয়েছে। আগস্টে মিসরের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৯.৫৭ শতাংশ। একই মাসে পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে ১৪.৯৯ শতাংশ। বিপরীতে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৩.২৬ শতাংশ।

পরিসংখ্যানের এই বৈপরীত্য দেখাচ্ছে, ইউরোপের বাজারে সব সরবরাহকারী একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। কোনো দেশ রপ্তানি হারাচ্ছে, আবার কোনো দেশ বাড়তি অর্ডার বা বাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মিসর ও চীনের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ আরও বাড়তে পারে।

বেশি মূল্য সংযোজনেও জোর
বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের বড় শক্তি দীর্ঘদিনের উৎপাদন অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠিত সরবরাহব্যবস্থা। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বড় পরিসরে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও উৎপাদন অভিজ্ঞতা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ে তুলেছে। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আমদানি চাহিদা ও জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ইউরোপের পোশাক বাজারকে চাপে রেখেছে, যার প্রভাব বিভিন্ন দেশের রপ্তানিকারকদের ওপর পড়ছে।

এই বাস্তবতায় উচ্চমূল্যের ডেনিম পণ্য উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু বেশি পরিমাণে পণ্য রপ্তানি নয়, প্রতি ইউনিট পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়াতে পারলেও রপ্তানি আয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

সিটি গ্রুপকে খেলাপি না করে পুনর্গঠনের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০০ অপরাহ্ণ
সিটি গ্রুপকে খেলাপি না করে পুনর্গঠনের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ আপাতত খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আর্থিক সংকট কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রোববার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন, ঋণদাতা কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন।দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক এই ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে তা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ, সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর আগে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কয়েকটি ব্যাংক ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে। এতে গ্রুপটির আর্থিক সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ একটি ব্যাংকে খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত হলে অন্য ব্যাংক থেকেও নতুন ঋণ পাওয়া কিংবা বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সিটি গ্রুপের বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সম্ভাবনা বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো, প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক চাপ সামলে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফেরার সুযোগ দেওয়া।

বৈঠকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সিটি গ্রুপ আগে কখনো ঋণ খেলাপি হয়নি এবং গ্রুপটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। তাই সবাই চায়, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান সংকট কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াক। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ব্যাংকগুলোকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে সিটি গ্রুপের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।  সিটি গ্রুপের বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সচল রাখা এবং আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল কিংবা খেলাপি হিসেবে নথিভুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি