খুঁজুন
                               
, ,
           

সাত বছর কারাগারে, পরিচয় ছিল ৪৫৩৩—তারপর হলেন চিকিৎসক

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৬ অপরাহ্ণ
সাত বছর কারাগারে, পরিচয় ছিল ৪৫৩৩—তারপর হলেন চিকিৎসক

পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। শাস্তি হিসেবে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন কাঠমিস্ত্রির কাজে। আড়াই মাস কাজ করার পর পায়ে পেরেক ঢুকে যাওয়ার যন্ত্রণা সইতে না পেরে বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, মন দিয়ে পড়াশোনা করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। একসময় মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগও পান। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের আগেই নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। খুনের মামলায় দণ্ডিত হয়ে কাটাতে হয় সাত বছর কারাগারে।

কারাগারে নাম হারিয়ে পরিচয় হয়ে যায় একটি সংখ্যা—৪৫৩৩। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেরিয়ে সেই মানুষই আবার ফিরে আসেন পড়াশোনায়। ১৯৯১ সালে পূরণ করেন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। আর জীবনের ৭২ বছর বয়সে নতুন পরিচয় যোগ হয় তাঁর নামের পাশে—বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত আধুনিক গানের শিল্পী।

রাজশাহীর শরীফ আহমেদ খানের জীবন যেন বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানোর এক ব্যতিক্রমী গল্প। কাঠমিস্ত্রির কাজ থেকে চিকিৎসক, কারাবন্দি থেকে লেখক, আর চিকিৎসক পরিচয়ের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী—তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁকেই রয়েছে সংগ্রাম, বেদনা আর নতুন করে শুরু করার সাহস।

কাঠমিস্ত্রির কাজে পাঠিয়েছিলেন বাবা
রাজশাহীর হাই মাদ্রাসা, বর্তমানে হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তেন শরীফ আহমেদ খান। পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর কঠোর স্বভাবের বাবা এমদাদ আলী খান তাঁকে কাঠমিস্ত্রির কাজে লাগিয়ে দেন।

আড়াই মাস কাজ করার পর একদিন পায়ে ঢুকে যায় পেরেক। যন্ত্রণায় কাতর শরীফ বাবার কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কাঠমিস্ত্রির কাজ আর করতে পারবেন না। এবার থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করবেন।

ছেলের কথায় আবার তাঁকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা। পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নিয়োগ করেন গৃহশিক্ষকও। এরপর বদলে যেতে থাকে শরীফের ফলাফল। মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে রাজশাহী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও ভালো ফল করেন।

এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগে দুই বছর পড়াশোনা করেন। কিন্তু তাঁর মনে তখন অন্য স্বপ্ন—চিকিৎসক হওয়া। সেই লক্ষ্য নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা দেন এবং সুযোগও পেয়ে যান।

মায়ের সোনার দুলে শুরু চিকিৎসক হওয়ার যাত্রা
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক সংকট। শরীফদের পরিবারে ছিলেন ১০ ভাইবোন। ছোট ভাইয়ের জন্মকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। সংসারের ভার এসে পড়ে মা রোকেয়া বেগমের ওপর।

এর মধ্যে জন্মের ৪০ দিনের মাথায় ধনুষ্টংকারে মারা যায় ছোট ভাই। সংসারের আর্থিক সংকটে শরীফের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ হয়নি, আবার মেডিকেলে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে তাঁর মা সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে চিকিৎসক হতেই হবে। নিজের একমাত্র সম্বল কানের সোনার দুলজোড়া বিক্রি করে দেন তিনি। সেই টাকা দিয়েই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন শরীফ আহমেদ খান।

মায়ের এই ত্যাগ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা হয়ে থাকে। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার পথে যে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল, তা তখনো জানতেন না তিনি।

সিনেমা দেখে ফেরার পথে বদলে গেল জীবন
১৯৭৮ সালে পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন শরীফ। ফেরার পথে এক তরুণের সঙ্গে তাঁদের তর্কবিতর্ক ও ঝামেলা হয়। এলাকার লোকজন এসে বিষয়টি মীমাংসাও করে দেন। কিন্তু ওই রাতেই খুন হন সেই তরুণ। আগের বিরোধের সূত্র ধরে খুনের মামলায় প্রধান আসামি করা হয় শরীফকে।

এরই মধ্যে এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। একটি বিষয়ে পাস করলেও বাকি তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হন। এরপর ১৯৮৪ সালে সামরিক আদালতের সাজায় কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। থমকে যায় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সংসার ও ভবিষ্যৎ।

কারাগারে গিয়ে নিজের নাম-পরিচয়ের বদলে হয়ে যান একটি সংখ্যা—৪৫৩৩। বন্দিদের গণনার সময় এই নম্বরেই ডাকা হতো তাঁকে।

কারাগারের জীবন ছিল কঠিন। ঘুমানোর জন্য অল্প জায়গা, দুটি কম্বল, খাওয়ার জন্য থালা-বাটি—প্রয়োজনীয় অনেক কিছুরই অভাব ছিল। গাদাগাদি করে থাকার মধ্যে শারীরিক সমস্যারও মুখোমুখি হন তিনি। একসময় মনে হয়েছিল, জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ব্যক্তিকে হত্যার মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন এলাকার পরিচিত সন্ত্রাসী। প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে হত্যা করেছিল বলে দাবি করেন শরীফ। সিনেমা দেখে ফেরার পথে তাঁদের মধ্যে বিরোধ হলেও তা মিটে গিয়েছিল। পরে একই রাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়। সামরিক আদালতে একতরফাভাবে সাজা দেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি।

কারাগারে বই হয়ে উঠল বেঁচে থাকার অবলম্বন
দীর্ঘ কারাজীবনের হতাশা যখন তাঁকে গ্রাস করছিল, তখন এক কর্নেলের একটি পরামর্শ নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কারাগার পরিদর্শনে এসে ওই কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, জীবনের এই সময়টিকে জীবনেরই একটি অংশ হিসেবে মেনে নিতে।

কথাটি গভীরভাবে নাড়া দেয় শরীফকে। তিনি বই পড়া শুরু করেন। বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষার বই পড়ার আগ্রহ থেকে উর্দুও শিখে নেন। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনে বই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন আশ্রয়।

কারাগারের দেয়াল তাঁকে আটকে রাখলেও জ্ঞানের জগতে প্রবেশের পথ বন্ধ করতে পারেনি। বই পড়তে পড়তে সময় কাটানোর পাশাপাশি মানসিকভাবে টিকে থাকার শক্তিও খুঁজে পান তিনি।

১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে মার্শাল ল কোর্টের দণ্ড বাতিল হলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মুক্তির সুযোগ তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শরীফ আহমেদ খানও। সাত বছরের কারাজীবন শেষে ১৯৯১ সালে মুক্তি পান তিনি।

সাত বছর পর ফিরে এল চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
কারাগার থেকে বেরিয়ে শরীফ যোগাযোগ করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষার বাকি বিষয়গুলো দেওয়ার সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। বিষয়টি কলেজের সিন্ডিকেটের সভায় ওঠে। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর একাডেমিক কোনো বাধা নেই।

এরপর বাকি পরীক্ষাগুলো দিয়ে পাস করেন শরীফ। দীর্ঘ বিরতি, কারাবাস ও জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৯১ সালে অবশেষে পূরণ হয় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।

তবে তত দিনে জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সও আর অবশিষ্ট ছিল না। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে পেশাজীবন এগিয়ে নেন তিনি। একসময় একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে চিকিৎসক হিসেবে অবসরও নেন।

শরীফ আহমেদ খানের বয়স এখন ৭৪ বছর। রাজশাহী নগরের শেখপাড়া মহল্লায় বসবাস করেন তিনি। জীবনের এই দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রা নিয়ে লিখেছেন আত্মজীবনী। নাম দিয়েছেন ‘পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ’—কারাগারে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠা সেই সংখ্যারই স্মারক।

৭২ বছর বয়সে বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী
চিকিৎসক পরিচয়ের বাইরেও শরীফের রয়েছে আরেকটি জগৎ—সংগীত। তিনি গান লেখেন, সুর করেন। জীবনের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ কারাবাসের বেদনা ও ভেতরে জমে থাকা ক্ষত তাঁর সৃষ্টিতে জায়গা পেয়েছে।

৭২ বছর বয়সে বাংলাদেশ বেতারের অডিশনে অংশ নিয়ে তালিকাভুক্ত আধুনিক গানের শিল্পী হন তিনি। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে নতুন একটি পরিচয় অর্জন করা তাঁর গল্পকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।

কারাজীবনের যন্ত্রণা তাঁর লেখা গানের কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

‘আমি নর্দমায় পড়া এক অসহায় নিরেট
যেন সুকান্তের ছুড়ে ফেলা এক পরিত্যক্ত সিগারেট।
আমি রাতজাগা কুকুর চিৎকার করে উঠি—সব আছে ঠিক
আমি পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ এক পরাজিত সৈনিক।’

গানের এই পঙ্‌ক্তিগুলোয় যেন ফিরে আসে কারাগারের সেই দিনগুলো, যখন নামের বদলে একটি সংখ্যা ছিল তাঁর পরিচয়। সেই পরিচয়কে মুছে ফেলতে পারেনি সময়; বরং সেটিকেই আত্মজীবনীর নামে ধারণ করেছেন তিনি।

হারানো সময় পেরিয়ে নতুন পরিচয়ের গল্প
শরীফ আহমেদ খানের জীবনকে কেবল একজন চিকিৎসক হওয়ার গল্পে সীমাবদ্ধ করা যায় না। শৈশবে কাঠমিস্ত্রির কাজে যাওয়া, মায়ের সোনার দুল বিক্রি করে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া, খুনের মামলায় সাত বছর কারাবাস, মুক্তির পর আবার পরীক্ষায় বসা—প্রতিটি অধ্যায়ই তাঁর জীবনের আলাদা সংগ্রামের সাক্ষী।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গান লেখা, সুর করা এবং জীবনের ৭২ বছর বয়সে বেতারের শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অভিজ্ঞতা। যে মানুষ একসময় কারাগারে একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছিলেন, তিনিই পরে নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন একাধিক পরিচয়।

জীবনের সব বাধা যে মুছে গেছে, তা নয়। হারানো সময় আর কারাবাসের স্মৃতি তাঁর জীবনের অংশ হয়েই রয়েছে। তবু সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নিজের জন্য নতুন পথ তৈরি করেছেন শরীফ আহমেদ খান। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, জীবনের কোনো অধ্যায়ই সব সম্ভাবনার শেষ কথা নয়; কখনো কখনো দীর্ঘ বিরতির পরও নতুন করে শুরু করা সম্ভব।

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন

সম্পর্ক শেষ, তবু প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখেন কেন? জানুন কারণ

লাইফস্টাইল ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৩ অপরাহ্ণ
সম্পর্ক শেষ, তবু প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখেন কেন? জানুন কারণ

সম্পর্ক শেষ হয়েছে, বন্ধ হয়েছে কথাবার্তাও। দুজনের জীবন হয়তো এগিয়ে গেছে দুই পথে। তবু গভীর রাতে কিংবা কাজের ফাঁকে হঠাৎ ফোনের সার্চবারে ভেসে ওঠে প্রাক্তনের নাম। নতুন কোনো ছবি দিয়েছেন কি না, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, বিচ্ছেদের পর কতটা ভালো আছেন—এসব জানতে বারবার ঢুঁ মারা হয় তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলে।

বিষয়টি অনেকের কাছেই পরিচিত। কেউ করেন নিছক কৌতূহল থেকে, কেউ পুরোনো স্মৃতির টানে, আবার কেউ খুঁজতে থাকেন এমন কোনো ইঙ্গিত, যা তাঁকে সম্পর্কের অতীত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কিন্তু সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও কেন প্রাক্তনের অনলাইন জীবন নিয়ে এত আগ্রহ থেকে যায়? এর পেছনে কাজ করতে পারে অসমাপ্ত আবেগ, নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের তুলনা, একাকীত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বেঙ্গালুরুর মার্গ মাইন্ড কেয়ারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে এ বিষয়ে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও অভ্যাসটি কমানোর কিছু উপায় তুলে ধরেছেন।

১. ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রাক্তনকে ভুলে থাকা কঠিন
একসময় সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রাক্তনের খবর জানতে পারস্পরিক পরিচিতদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। বন্ধুদের স্টোরি, পরিচিতদের পোস্ট, অ্যালগরিদমের সাজেশন কিংবা পুরোনো ছবির স্মৃতি—যেকোনো কিছু হঠাৎ প্রাক্তনের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।

একবার প্রোফাইলে ঢুঁ মারার পর নতুন কোনো আপডেট চোখে পড়লে আবারও দেখার আগ্রহ তৈরি হয়। এভাবে সামান্য কৌতূহল ধীরে ধীরে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

২. প্রাক্তন ভালো আছেন, নাকি কষ্টে—জানতে ইচ্ছা করে
বিচ্ছেদের পর অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, প্রাক্তন কি তাঁকে ভুলে গেছেন? নতুন জীবনে সুখী হয়েছেন? সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর তাঁর জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকে প্রাক্তনের ছবি, পোস্ট ও অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। কখনো নিজের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে প্রাক্তনের জীবনের তুলনাও শুরু হয়। প্রাক্তনকে হাসিখুশি দেখলে মনে হতে পারে, তিনি খুব সহজেই এগিয়ে গেছেন; আবার নতুন কারও সঙ্গে ছবি দেখলে তৈরি হতে পারে কষ্ট, ঈর্ষা কিংবা নিজের গুরুত্ব নিয়ে সংশয়।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ছবিই কারও জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। সেখানে মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের বাছাই করা মুহূর্তগুলোই তুলে ধরেন।

৩. মনের ভেতর রয়ে গেছে অসমাপ্ত আবেগ
সম্পর্ক শেষ হলেই আবেগের অবসান ঘটে না। বিচ্ছেদের পরও পুরোনো স্মৃতি, অভিমান, ভালোবাসা কিংবা কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার কষ্ট থেকে যেতে পারে।

এ কারণে কেউ কেউ প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখে বোঝার চেষ্টা করেন, সম্পর্কটি তাঁর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল কি না। কেউ খোঁজেন বিচ্ছেদের কারণ সম্পর্কে নতুন কোনো ইঙ্গিত, কেউ আবার জানতে চান প্রাক্তনও একই ধরনের কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন কি না।

তবে বারবার প্রোফাইল দেখা মানেই যে আবার সম্পর্কে ফিরতে চাওয়া, তা নয়। কখনো এটি হতে পারে অতীতকে বুঝে নেওয়া কিংবা মানসিকভাবে সেই অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। কিন্তু এই অভ্যাস যদি পুরোনো কষ্টকে বারবার উসকে দেয়, তাহলে তা মানসিকভাবে সামনে এগোনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

৪. কিছু মিস করার ভয় থেকে তৈরি হয় অভ্যাস
মনোবিজ্ঞানে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো বলতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা বা তথ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাকে বোঝানো হয়। প্রাক্তনের ক্ষেত্রেও এমন অনুভূতি কাজ করতে পারে।

মনে হতে পারে, তাঁর জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটছে, অথচ সেটি জানা হচ্ছে না। নতুন সম্পর্ক, ভ্রমণ, সাফল্য কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো ঘটনা—কিছুই যেন চোখ এড়িয়ে না যায়।

এর সঙ্গে একাকীত্ব, অবসর সময় এবং বারবার ফোন দেখার অভ্যাস যুক্ত হলে প্রাক্তনের প্রোফাইল পরীক্ষা করা নিয়মিত কাজে পরিণত হতে পারে। তখন অনেক সময় সচেতন সিদ্ধান্তের চেয়ে অভ্যাসের টানেই মানুষ সেই প্রোফাইলে ফিরে যান।

প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখা বন্ধ করবেন যেভাবে
এই অভ্যাস কমাতে শুধু নিজেকে বারবার নিষেধ করাই যথেষ্ট নয়। কখন, কেন এবং কী পরিস্থিতিতে প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখতে ইচ্ছা করে, তা বুঝে ধীরে ধীরে আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।

১. কোন পরিস্থিতিতে দেখতে ইচ্ছা করে, খেয়াল করুন
একাকী থাকলে, মন খারাপ হলে, রাতে ঘুমানোর আগে কিংবা কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে পড়লে কি প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখতে ইচ্ছা করে? কয়েক দিন নিজের আচরণ লক্ষ্য করুন। কোন পরিস্থিতি এই তাগিদ বাড়ায়, তা বুঝতে পারলে বিকল্প কোনো কাজে মন দেওয়া সহজ হবে।

২. প্রোফাইল দেখার সুযোগ সীমিত করুন
প্রাক্তনের পোস্ট বারবার সামনে এলে তাঁকে মিউট বা আনফলো করতে পারেন। প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে ব্লক করাও একটি বিকল্প। পুরোনো কথোপকথন আর্কাইভে রাখা এবং সার্চ হিস্ট্রি মুছে ফেলার মতো পদক্ষেপও সহজে প্রোফাইলে ঢোকার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

এটি প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয় নয়; বরং নিজের মানসিক স্বস্তির জন্য কিছুটা দূরত্ব তৈরি করা।

৩. ইচ্ছা হলেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরবেন না
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার তাগিদ এলে সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ না করে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এ সময় হাঁটতে পারেন, গান শুনতে পারেন, বই পড়তে পারেন কিংবা কাছের কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

ইচ্ছাটি কিছুক্ষণ পর কমে যায় কি না, খেয়াল করুন। এভাবে ধীরে ধীরে তাগিদ এবং নিজের আচরণের মধ্যে একটি বিরতি তৈরি করা সম্ভব।

৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিকে পুরো সত্য ভাববেন না
প্রাক্তনকে হাসিখুশি দেখেই ধরে নেবেন না যে তিনি কোনো কষ্ট ছাড়াই এগিয়ে গেছেন। একইভাবে তাঁর বিষণ্ন কোনো পোস্ট দেখেও নিজের মতো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের জীবনের নির্বাচিত অংশই দেখা যায়। সেই অংশের সঙ্গে নিজের বাস্তব অনুভূতির তুলনা করলে অকারণ কষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

৫. দেখার পর নিজের অনুভূতি বুঝুন
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার পর কেমন লাগে, তা গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ করুন। যদি বারবার মন খারাপ হয়, ঈর্ষা তৈরি হয়, উদ্বেগ বাড়ে কিংবা ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে এই অভ্যাস আপনার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা ভেবে দেখুন।

প্রয়োজনে কিছুদিন প্রোফাইল দেখা থেকে বিরতি নিন। সেই সময় নিজের পছন্দের কাজ, বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যগুলোর দিকে মনোযোগ দিন।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন?
বিচ্ছেদের পর মন খারাপ হওয়া বা প্রাক্তনের কথা মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই চিন্তা যদি দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করে, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে, ঘুমের সমস্যা বাড়ায় কিংবা বারবার চেষ্টা করেও অভ্যাসটি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

প্রাক্তনের অনলাইন জীবন সম্পর্কে কৌতূহল থাকা মানেই আপনি দুর্বল, এমন নয়। সম্পর্কের স্মৃতি ও আবেগ সামলাতে প্রত্যেকের সময় আলাদা হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অভ্যাস আপনার বর্তমান জীবনকে কতটা প্রভাবিত করছে, তা বোঝা।

সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও প্রাক্তনের প্রোফাইল বারবার দেখা হয়তো সাময়িক কৌতূহল মেটায়। কিন্তু যদি প্রতিবারই পুরোনো কষ্ট ফিরে আসে, তাহলে নিজের জন্য কিছুটা দূরত্ব তৈরি করাই হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।

কালের আলো/এসএ/জেএন

মেট্রো স্টেশনে বসছে মেটাল ডিটেক্টর ও লাগেজ স্ক্যানার

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২২ অপরাহ্ণ
মেট্রো স্টেশনে বসছে মেটাল ডিটেক্টর ও লাগেজ স্ক্যানার

রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে বিমানবন্দরের আদলে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। নতুন ব্যবস্থায় স্টেশনে প্রবেশের আগে যাত্রীদের শরীরে ধাতব বস্তু শনাক্ত করতে আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর এবং ব্যাগ ও মালামাল পরীক্ষায় লাগেজ স্ক্যানার ব্যবহার করা হবে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) ডিএমটিসিএলের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

স্টেশনে প্রবেশের আগে হবে নিরাপত্তা তল্লাশি
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের মাধ্যমে মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে যাত্রী ও তাদের সঙ্গে থাকা মালামাল পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টরের সাহায্যে শরীরে বহন করা ধাতব বস্তু শনাক্ত করা যাবে। অন্যদিকে, লাগেজ স্ক্যানারের মাধ্যমে ব্যাগ ও অন্যান্য মালামাল পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, এ ব্যবস্থা চালু হলে নিরাপত্তা তল্লাশি আরও কার্যকর হবে এবং সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে সহায়তা মিলবে।

নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিনতে দরপত্র আহ্বান
নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের লক্ষ্যে গত ১৯ অক্টোবর অনলাইনে দরপত্র আহ্বান করেছে ডিএমটিসিএল। সংস্থাটির স্টোর অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এ দরপত্র আহ্বান করেন। দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে আগ্রহী ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টালের মাধ্যমে দরপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ও নির্দেশিকা পোর্টালটিতে পাওয়া যাবে।

কবে চালু হবে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা?
নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কয়েকটি বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। কতটি যন্ত্র কেনা হবে, প্রথম পর্যায়ে কোন কোন স্টেশনে সেগুলো স্থাপন করা হবে এবং কবে থেকে যাত্রীদের নিয়মিত তল্লাশি শুরু হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ফলে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা পুরো মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে একযোগে চালু হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬-এর ডিপোতে স্থাপিত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আওতায় লো-ভোল্টেজ (এলভি) ব্যবস্থা, ডিজেল জেনারেটর সেট, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা (ইউপিএস), বায়ু চলাচলব্যবস্থা এবং অন্যান্য সাধারণ বৈদ্যুতিক কাজের রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।

দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ নভেম্বর দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দরপত্রের নথি কেনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপন এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগের মাধ্যমে মেট্রোরেলের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: বাসস

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

পেনশন, আবাসন ও যুদ্ধ নিয়ে উত্তাল ইউরোপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক , কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১০ অপরাহ্ণ
পেনশন, আবাসন ও যুদ্ধ নিয়ে উত্তাল ইউরোপ

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পেনশন অধিকার, আবাসন সংকট, দুর্নীতি ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, আলবেনিয়া, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালে নানা দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। কোথাও সরকারের পদত্যাগ ও নীতির পরিবর্তনের দাবি উঠেছে, কোথাও সামাজিক অধিকার রক্ষায় সরব হয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কয়েকটি দেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ও আগের সহিংসতার ঘটনার পর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অধিকার এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ গ্রেপ্তার কয়েক হাজার
ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দেশটিতে বিক্ষোভের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য আহত হয়েছেন। শুধু রাজধানী প্যারিসেই আহত হয়েছেন প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় তৎপরতা বাড়িয়েছে। সহিংসতার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবহুল এলাকায় নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। ফ্রান্সের পরিস্থিতি ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিক্ষোভের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের কারণ এক না হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ অনেক ক্ষেত্রেই বিক্ষোভের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে উত্তেজনা
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। দেশটিতে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

এই আন্দোলনের মধ্যে সরকারি ভবনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে তিরানায় উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভের কারণে সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবির পাশাপাশি সংঘর্ষে আহতদের সংখ্যা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে।

ইতালিতে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ
ইতালির মিলান, রোম, তুরিন, নেপলস, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। যুদ্ধের বিরোধিতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ ছিল আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিক্ষোভ চলাকালে কিছু অংশগ্রহণকারী বোতল, পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতালির পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির আটটি শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। ইতালিতে এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ সামনে এসেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ, আবাসন এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব চাপকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। তবে বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীকে তৎপর থাকতে হচ্ছে।

স্পেনে পেনশন অধিকার রক্ষায় রাজপথে অবসরভোগীরা
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পেনশনভোগী ও তাঁদের সমর্থকেরা অবসরকালীন অধিকার রক্ষার দাবিতে মিছিল করেছেন। তাঁদের প্রধান দাবি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনের পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে না পড়েন। বিক্ষোভকারীরা ন্যূনতম পেনশন ন্যূনতম মজুরির সমান করার দাবিও জানিয়েছেন। পাশাপাশি নারী ও পুরুষের পেনশনের মধ্যে বৈষম্য কমানো এবং সরকারি পেনশনব্যবস্থা বেসরকারীকরণের উদ্যোগ প্রতিহত করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।

পেনশনভোগীদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে গেলে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন। তাই পেনশন বাড়ানোর পাশাপাশি অবসরকালীন সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। মাদ্রিদের এই কর্মসূচি ইউরোপের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে এনেছে। পেনশনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং সরকারি সহায়তার পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন দেশে যে উদ্বেগ রয়েছে, স্পেনের আন্দোলন তারই একটি উদাহরণ।

পর্তুগালে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। বাড়ি ও ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্য এবং আবাসনসংকটের কারণে অনেকের পক্ষে উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে আবাসনব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।

আবাসনসংকট ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিশেষ করে তরুণ, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে সাশ্রয়ী বাসস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

লিসবনের বিক্ষোভে সেই অসন্তোষই প্রকাশ পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, আবাসনকে শুধু বাজারের পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাসস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভে সামনে আসছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট
ফ্রান্স থেকে আলবেনিয়া, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগাল—দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ ও দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও সরকারবিরোধী আন্দোলন, কোথাও যুদ্ধের প্রতিবাদ, আবার কোথাও পেনশন ও আবাসনসংকটকে কেন্দ্র করে মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তবে এসব আন্দোলনের মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক অধিকার এবং সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভের সঙ্গে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই সময়ে এ ধরনের বিক্ষোভের ঘটনা জনজীবনের ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের উদ্বেগের প্রতিফলন। এসব আন্দোলনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। সূত্র: ইউরোনিউজ, এপি

কালের আলো/এসএ/এমএসআইপি