সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন বিএনপির এমপিরা। গাড়ির সামনে-পেছনে নেতাকর্মীদের ভিড়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ সেলফি, কেউবা মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করছেন। প্রত্যেকেরই যেন একটাই লক্ষ্য—এমপির নজরে আসা। এই দৃশ্য এখন অনেকটা নিয়মিত।তবে সংসদের করিডর থেকে স্থানীয় রাজনীতির মাঠে তাকালে এই ভিড়ের অর্থ আরও গভীর। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এমপিমুখী তৎপরতা। এমপির অফিস, বাসা কিংবা সংসদ—যেখানেই সুযোগ মিলছে, সেখানেই চলছে দেখা-সাক্ষাৎ, সালাম বিনিময়, সমর্থন চাওয়ার চেষ্টা।সম্ভাব্য প্রার্থীদের ধারণা, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় এমপির সমর্থন অনেকটাই নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
আর এখানেই তৈরি হচ্ছে বিএনপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন উঠছে—তৃণমূলের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার বদলে যদি এমপিদের নিজস্ব বলয়ের নেতারাই প্রার্থী বাছাইয়ে এগিয়ে যান, তাহলে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় ঐক্য কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে?
ভোটের আগেই শুরু ‘মনোনয়ন দৌড়’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। কিন্তু সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন নিয়ে সেপ্টেম্বরে তফসিল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।দেশে সামনে রয়েছে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৫০০ উপজেলা এবং সাড়ে চার হাজারের মতো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন।এত বড় নির্বাচনী আয়োজনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিও স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপিও এর বাইরে নয়।বরং দলটির জন্য স্থানীয় নির্বাচন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় নির্বাচনের পর তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক শক্তি, জনপ্রিয়তা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে এই নির্বাচন।
তারেক রহমানের নির্দেশ: একক প্রার্থী, কমাতে হবে কোন্দল
দলের ভেতরে বিদ্রোহী প্রার্থিতা ঠেকাতে শুরু থেকেই সতর্ক বিএনপি। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থানীয় পর্যায়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক ও যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তফসিল ঘোষণার আগেই অধিকাংশ এলাকায় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রার্থী বাছাইয়ে জেলা নেতাদের ভূমিকা রাখার কথা রয়েছে। কোনো জটিলতা দেখা দিলে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এখানে দলের কৌশলটি স্পষ্ট—প্রার্থী একজন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলের ভেতরে নয়; প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ভোটের মাঠে।
নির্বাচিত এমপিরা এখন নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন। এই বাস্তবতায় স্থানীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বড় একটি অংশ এমপির সমর্থনকে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তাদের যুক্তিও সরল—যিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলকে জয় এনে দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন করা কঠিন।কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে অন্য জায়গায়।একজন এমপি যাকে ‘যোগ্য’ মনে করছেন, তৃণমূলের অন্য অংশ তাকে একইভাবে গ্রহণ নাও করতে পারে।আর এমপির ঘনিষ্ঠতা যদি প্রার্থী হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে দীর্ঘদিন মাঠে থাকা অন্য নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে বিদ্রোহী প্রার্থিতা, গ্রুপিং এবং নির্বাচনী বিভাজন।জাতীয় নির্বাচনের পুরোনো দ্বন্দ্ব কি স্থানীয় ভোটে ফিরবে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে একাধিক নেতার মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, স্থানীয় নির্বাচনে তার প্রতিফলন দেখা দিতে পারে বলে দলের তৃণমূলের রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে। কারণ জাতীয় নির্বাচনে যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তাদের সবাই এখন এমপি হননি। কেউ এমপি হয়েছেন, কেউ হননি।
আবার যারা এমপি হয়েছেন, তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্থানীয় নেতাদের সম্পর্কও সব জায়গায় সমান নয়। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে চেয়ারম্যান বা মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে যদি এমপির ঘনিষ্ঠতা প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে, তাহলে বাদ পড়া নেতাদের একাংশ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের সময়কার ‘মনোনয়ন দ্বন্দ্ব’ স্থানীয় নির্বাচনে রূপ নিতে পারে ‘প্রার্থী দ্বন্দ্বে’।
‘মাইম্যান’ রাজনীতির ঝুঁকি কোথায়?রাজনীতিতে এমপির নিজস্ব টিম বা বলয় থাকা অস্বাভাবিক নয়। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কাজ করার জন্য নিজস্ব রাজনৈতিক সহযোগী থাকবেই। সমস্যা তৈরি হয় যখন সেই বলয় পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু সরাসরি জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের পরীক্ষা, সেখানে প্রার্থীকে শুধু এমপির পছন্দের মানুষ হলেই হবে না। কিন্তু বাস্তবে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় ‘কে কতটা জনপ্রিয়’ বনাম ‘কে কার লোক’—এই দ্বন্দ্বই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দলীয় প্রতীক নেই, কিন্তু দলীয় রাজনীতি আছেস্থানীয় সরকার নির্বাচন অরাজনৈতিক নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইউনিয়ন, পৌরসভা বা উপজেলা নির্বাচন কখনোই পুরোপুরি দলনিরপেক্ষ নয়।জাতীয় রাজনীতির প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনে থাকে। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় এমপির সমর্থন, দলের সাংগঠনিক অবস্থান—সবই ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলে। এবার বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় মনোনয়ন বা প্রতীক দেওয়ার পথে যাচ্ছে না। বরং স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে ভিত্তি করে দলীয় সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।এতে একদিকে দলীয় প্রতীকের আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা থাকবে না, অন্যদিকে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে—দল কাকে সমর্থন করল? আর সেই সমর্থন যদি স্থানীয়ভাবে এমপির পছন্দের প্রার্থীর দিকে যায়, তাহলে অন্য পক্ষের অসন্তোষ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
তারেক রহমানের সাংগঠনিক বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ
গত ৪ জুলাই থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের বিভিন্ন বিভাগের জেলা নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ইতোমধ্যে হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে।চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও স্থানীয় নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল কমিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এখানে কেন্দ্রের রাজনৈতিক বার্তা বেশ পরিষ্কার—স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে কোনো ‘ক্ষমতার বলয়’ তৈরি হতে দেওয়া যাবে না।কিন্তু কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মাঠে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর। বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোই বড় পরীক্ষা বিএনপির জন্য স্থানীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক ঝুঁকি হতে পারে বিদ্রোহী প্রার্থী। একজন প্রার্থীকে দল বা স্থানীয় নেতৃত্ব সমর্থন করলেই অন্য সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।বিশেষ করে যেসব এলাকায় একাধিক শক্তিশালী নেতা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন, সেখানে সমঝোতা করানো কঠিন হতে পারে। বিএনপি ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কিন্তু শুধু সাংগঠনিক শাস্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না।প্রয়োজন এমন একটি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া, যাতে পরাজিত পক্ষও মনে করে—তাকে রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত করা হয়নি।
সরকারের জন্যও বড় পরীক্ষা
স্থানীয় নির্বাচন শুধু বিএনপির সাংগঠনিক পরীক্ষাই নয়, নতুন সরকারের জন্যও এটি একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ইতোমধ্যে বলেছেন, সরকার নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে শতভাগ সহযোগিতা করবে এবং কে জয়ী হলো বা পরাজিত হলো, সেটি সরকারের বিবেচ্য বিষয় নয়। এই অবস্থান বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিও নজরে থাকবে।কারণ জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনই হবে নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা কার সঙ্গে?বিএনপির সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসল প্রতিপক্ষ শুধু অন্য দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নিজেদের ভেতরের বিভাজন।একজন এমপির নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় যদি দলের সামগ্রিক সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সমন্বিত থাকে, তাহলে সেটি দলের জন্য শক্তি। কিন্তু সেই বলয় যদি স্থানীয় রাজনীতিতে ‘আমাদের লোক বনাম অন্যরা’ বিভাজন তৈরি করে, তাহলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে দুর্বলতার কারণ। এ কারণে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—প্রার্থী কে হচ্ছেন, তার চেয়েও বড়—কী প্রক্রিয়ায় তাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও জয়ের সম্ভাবনাকে যদি সত্যিই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় নির্বাচন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে আরও সুসংহত করতে পারে।আর যদি এমপিদের ব্যক্তিগত বলয় প্রার্থী বাছাইয়ের প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে অর্জিত রাজনৈতিক সাফল্যের পর স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে গ্রুপিং, বিদ্রোহ ও ‘মাইম্যান’ রাজনীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array