সকাল নয়টা বাজলেই লোকটি এসে দাঁড়ান রাজধানীর রমনার সেই সড়কের পাশে। গায়ে নিরাপত্তাপ্রহরীর পোশাক। হাতে ধানের শীষ। চোখ তাঁর সড়কের দিকে। একসময় এই জায়গাটিই ছিল তাঁর কর্মস্থল। এখন সেখানে তাঁর কোনো চাকরি নেই। প্রায় এক মাস আগে বন্ধ হয়ে গেছে পাশের এটিএম বুথটি। চলে গেছে তাঁর কাজও। কিন্তু জায়গাটি ছাড়েননি তিনি। প্রতিদিনের মতো এখনো আসেন। কারণ, এই সড়ক দিয়েই যাতায়াত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
- হাতে ধানের শীষ, গায়ে পুরোনো নিরাপত্তার পোশাক
- জীবনের টানাপোড়েনের মাঝেও প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রতিদিনের অপেক্ষা
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন আবদুস সালাম। গাড়ি সামনে দিয়ে চলে গেলে তিনি সালাম জানান। কখনো প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে হাত নাড়ার সাড়া আসে। কখনো হয়তো শুধু এক ঝলক চোখে পড়ে। তারপর গাড়িবহর চলে যায়। আর তাঁর সকালও যেন পূর্ণ হয়। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষের কাছে সেই কয়েক সেকেন্ডের দেখাই অনেক।
কর্মস্থল হারিয়েও হারাননি সকাল
রাজধানীর মানিকনগরে ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকেন আবদুস সালাম। মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে এখনো বেকার। ফলে বয়স বাড়লেও সংসারের দায় থেকে অবসর নেওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে। প্রায় ২৫ বছর দূরপাল্লার পরিবহনের চালক ছিলেন। কয়েক বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থমকে যায় তাঁর কর্মজীবন। প্রায় তিন বছর বাড়িতেই ছিলেন। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফেরেন—এবার ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে। সেই চাকরিটিও টিকল না। কিন্তু চাকরি হারানোর পর যে মানুষটির প্রতিদিনের গন্তব্য বদলে যাওয়ার কথা, তাঁর সকালটি বদলায়নি। আগের মতোই পোশাক পরেন। ব্যাগে ধানের শীষ নেন। তারপর চলে আসেন সেই পুরোনো কর্মস্থলের কাছে। কাজ নেই, আয় নেই—তবু এই অভ্যাসে কোনো ছেদ নেই।
অপেক্ষার মধ্যে রাজনীতি, রাজনীতির মধ্যে আবেগ
আবদুস সালামের এই অপেক্ষাকে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে গল্পটির বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। এখানে রাজনীতির সঙ্গে মিশে আছে ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস আর এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি। প্রধানমন্ত্রীকে তিনি কাছে গিয়ে দেখেন না। কথা বলার সুযোগও নেই। গাড়ি থামে না। দূরত্ব থেকেই তাঁর শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। তবু সেই দূরত্ব যেন তাঁর অনুভূতিতে কোনো বাধা তৈরি করেনি।প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি দেখা তাঁর কাছে দিনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা। গাড়ি না গেলে তাঁর মধ্যে থেকে যায় আফসোস। আর গাড়ি এলে, সালামের জবাব মিললে বা অন্তত একবার চোখে পড়লে, সেই মুহূর্তটিই হয়ে ওঠে আনন্দের।
একদিনের একটি ঘটনা তাঁর মনে বিশেষভাবে গেঁথে আছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথমবার এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ধানের শীষ হাতে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গাড়ি থেকে হাত নাড়ার ইশারা পেয়েছিলেন। সেই ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়াই তাঁর কাছে বড় পাওয়া হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীর জন্য হয়তো সেটি ছিল চলন্ত গাড়ি থেকে দেওয়া একটি স্বাভাবিক শুভেচ্ছা। কিন্তু আবদুস সালামের কাছে তা ছিল নিজের ভালোবাসা পৌঁছে যাওয়ার প্রমাণ।
গাড়ি চলে যায়, অপেক্ষা থেকে যায়
রমনার ওই জায়গার চায়ের দোকানদারও এখন তাঁকে চেনেন। প্রতিদিন আসেন, দাঁড়ান, প্রধানমন্ত্রী এলে সালাম দেন, তারপর চলে যান। দৃশ্যটি তাঁর কাছে এখন আর নতুন নয়।প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আবদুস সালামের মতো আরও অনেকে নিয়মিত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যাওয়ার অপেক্ষা করেন। কেউ হাত নাড়েন, কেউ চোখের ইশারায় শুভেচ্ছা জানান। গাড়ি থামে না, কথাও হয় না। তবু মানুষের এই ক্ষণিকের যোগাযোগে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনুভূতি।আবদুস সালামের গল্পে সেই অনুভূতিই সবচেয়ে স্পষ্ট।
জীবনের কঠিন হিসাবেও আনন্দ
একজন মানুষের জীবনে চাকরি হারানো মানে শুধু একটি কর্মসংস্থান হারানো নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংসারের অনিশ্চয়তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, নিজের চিকিৎসা ও আগামী দিনের চিন্তা।আবদুস সালামের জীবনেও সেই হিসাব আছে।কিন্তু সেই কঠিন হিসাবের বাইরে তিনি নিজের জন্য একটি ছোট্ট আনন্দের জায়গা রেখে দিয়েছেন। প্রতিদিন সকালে সেই জায়গাটিতে এসে দাঁড়ান। পুরোনো পোশাক পরেন। হাতে নেন ধানের শীষ। অপেক্ষা করেন।প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি আসে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। তিনি সালাম জানান।তারপর আবার ফিরে যান নিজের অনিশ্চিত জীবনে। পরদিন সকাল হলে আবার আসেন। চাকরি হারিয়েছেন আবদুস সালাম, কিন্তু হারাননি অপেক্ষা। কারণ তাঁর কাছে প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখা শুধু একটি মুহূর্ত নয়—এটি তাঁর দিনের সেই ছোট্ট শান্তি, যা কোনো চাকরি হারানোর সঙ্গে হারিয়ে যায়নি।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array