ঘরে শুদ্ধি, বাইরে কঠোরতা
রাজনীতিতে বার্তাটি এবার শুধু বক্তৃতায় নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপেও। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পরদিনই বিমানবন্দরের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুটি ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। কিন্তু একটির পর আরেকটির সময়কাল রাজনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—অপরাধে রাজনৈতিক পরিচয় কি সত্যিই আর সুরক্ষা দেবে না?
বিএনপির ভেতরের সিদ্ধান্ত ও সরকারের আইনশৃঙ্খলা কৌশল সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে দুটি বার্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। প্রথমত, নিজ দলের নেতা-কর্মী অপরাধে জড়ালে দলীয় পদ বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা তাঁকে রক্ষা করবে না। দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষ দলের পরিচয়ও কাউকে আইনের আওতার বাইরে রাখবে না। এই অবস্থান কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।
- মিষ্টির পদত্যাগের পরই আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার
- দলীয় পরিচয়ে অপরাধে ছাড় নয়
- রাজনৈতিক পরিচয়ের ঢাল সরানোর বার্তা
রাড্ডা থেকেই শুরু ‘ঘরের শুদ্ধি’
রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে গত বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে। হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতা-কর্মীর নাম সামনে আসে। তাঁদের কয়েকজন মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় ঘটনাটি দ্রুত দলীয় অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি পদত্যাগ করেন বুধবার (১ অক্টোবর)। শুধু তাঁকে সরিয়েই থামেনি দল। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের স্থানীয় কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং ১৪ জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য শুধু রাড্ডা সেন্টারের ঘটনার দায় নির্ধারণ নয়। স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও এর উদ্দেশ্য।
অপরাধের দায় ব্যক্তির, দলের নয়
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদের কাছে ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা পৌঁছেছে। কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে সাংগঠনিক পরিচয়ের আড়ালে রাখার চেষ্টা না করে দ্রুত কেন্দ্রকে জানাতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে দলের নাম ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, অবৈধ প্রভাব বিস্তার কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
এর পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। দলের কোনো নেতা-কর্মীর অপরাধের ঘটনা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করে না; তা পুরো দলের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারের সুযোগ দেয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের একটি ঘটনা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্যও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
মিষ্টির পরদিনই ভিন্ন দলের নেতা গ্রেপ্তার
এই আবহেই মিষ্টির পদত্যাগের পরদিন গ্রেপ্তার হন মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর)।
আখতারুজ্জামান একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি দলটির সহযোগী সদস্য হলেও কোনো পদে নেই। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত সময়ের কারণে। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি প্রশাসনিক যোগসূত্র রয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অভিযোগই হবে মাপকাঠি?
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক পরিচয়কে আইনি দায় থেকে আলাদা করার চেষ্টা। মিষ্টির ক্ষেত্রে দলীয় পদক্ষেপ, আর আখতারুজ্জামানের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা—দুটি পথ আলাদা হলেও বার্তাটি কাছাকাছি।
তবে এখানেই সরকারের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ; একই নীতি নিয়মিতভাবে প্রয়োগ করা কঠিন। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে একই মানদণ্ডে ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে এই অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা।
বিরোধীদের মাঠও নজরদারিতে
বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নিজ দলের শৃঙ্খলার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মকাণ্ডও পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। সরকারবিরোধী কর্মসূচি, বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির মধ্যে কোনো সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, তা দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। এই দুইয়ের যেকোনো একটিতে ব্যর্থতা রাজনৈতিকভাবে বড় মূল্য দিতে পারে।
‘গুপ্ত’ ও ‘নিষিদ্ধ’ শক্তি নিয়ে সতর্কবার্তা
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। একটি বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকেরা ছিলেন। অন্য বৈঠকে অংশ নেন বিএনপিপন্থী টক শোর আলোচকেরা।
সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকগুলোতে প্রধানমন্ত্রী ‘গুপ্ত’ ও ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা দুটি রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ তুলে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরও দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এক বৈঠকে উপস্থিত থাকা একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে, সরকার একই সঙ্গে ‘ঘর’ এবং ‘বাইর’—দুই দিকেই নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাইছে।
নীরব অভিযানের কৌশল
সরকার ও বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটা করে কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনার বদলে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে মাঠপর্যায়ের কার্যকর পদক্ষেপেই গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান যেমন বাড়তে পারে, তেমনি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়বে।
কালের আলো/জেএন/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array