খুঁজুন
                               
, ,
           

আট মাসেই চার পদত্যাগ: জবাবদিহি  প্রতিষ্ঠায় কঠোর বিএনপি সরকার

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫২ অপরাহ্ণ
আট মাসেই চার পদত্যাগ: জবাবদিহি  প্রতিষ্ঠায় কঠোর বিএনপি সরকার

সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চারটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এগুলোর মধ্য দিয়ে সরকারের দায়িত্ব বণ্টন, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

বিশেষ করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর মন্ত্রিসভার সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির পরিচয় বা দলীয় ঘনিষ্ঠতার চেয়ে তাঁর আচরণ ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার যে নীতি তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জনআস্থা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

  • অসুস্থতা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব ছাড়লেন তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এক সংসদ সদস্য 
  • প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে উঠে এসেছে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, দলীয় শৃঙ্খলা এবং জনআস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা 

জনআস্থাকে অগ্রাধিকার, ইশরাকের পদত্যাগে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা
সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা সরকারের জবাবদিহিমূলক অবস্থানকে আলোচনায় এনেছে। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক। ওই সময় তাঁর ও সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনার ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করার পর সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়েও অস্বস্তি দেখা দেয়।

এরপর রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সোমবার, ১৯ অক্টোবর, জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। ঘটনাটি থেকে সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে— জনসমক্ষে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে নেতৃত্বকে দ্রুত অবস্থান নিতে হয়। রাজনৈতিকভাবে এটি সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং দায়িত্ব পালনে সতর্কতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন’: জবাবদিহিতে সরকারের অবস্থান
ইশরাকের পদত্যাগ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন— মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কোনো কাজ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যত ঘনিষ্ঠই হোন না কেন, তাঁর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই।’

এই বক্তব্য সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য একটি স্পষ্ট নীতিগত বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় কাউকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাড়তি ছাড় দেবে না— এমন অবস্থান কার্যকর হলে দলীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই অবস্থানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে এর ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর। অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যথাযথ যাচাই এবং সবার জন্য সমান মানদণ্ড বজায় রাখা গেলে সরকারের এই বার্তা আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ: দায়িত্বের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব
এর আগে গত ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় সাড়ে তিন মাস পর তিনি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তা গ্রহণ করা হয়। পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় অসুবিধা হচ্ছিল। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বজায় রাখার স্বার্থে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

এ ঘটনাকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত বাস্তবতার আলোকে দেখাই যুক্তিযুক্ত। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ করে দেওয়াকে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সমন্বয় সচল রাখতে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পাশাপাশি কার্যকর দায়িত্ব হস্তান্তরও জরুরি।

জহির উদ্দিন স্বপন: দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসে নতুন ভূমিকা
গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। একই দিনে তাঁকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগের দিন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান আন্দালিভ রহমান পার্থ। এ পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব কার্যত প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে আলোচনা তৈরি হয়।

তবে তাঁর নতুন নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রিসভা থেকে সরে গেলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে এ ঘটনাকে শুধু পদ হারানোর বিষয় হিসেবে না দেখে সরকারের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবেও দেখা যায়। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে নতুন সমন্বয় তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের পুনর্বিন্যাসের কার্যকারিতা নির্ভর করবে দায়িত্বের স্পষ্টতা ও প্রত্যাশিত ফল অর্জনের ওপর।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ: দলীয় শৃঙ্খলার গুরুত্ব
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগও এই ধারাবাহিকতার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরে গত ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। এরপর সংসদ সচিবালয় তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

এই পদক্ষেপ দলীয় শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা তুলে ধরে। জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠলে রাজনৈতিক দল কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তা দলটির ভাবমূর্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে জবাবদিহির উদ্যোগ আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

চার পদত্যাগে সরকারের সামনে ইতিবাচক সম্ভাবনা
চারটি পদত্যাগের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকলেও ঘটনাগুলো থেকে সরকারের জন্য কয়েকটি ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখা যায়। প্রথমত, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয়তা। বিতর্কিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমাতে এবং সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে সহায়ক হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনে সতর্কতা বৃদ্ধি। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব পেলে সরকারি দায়িত্ব পালনে আরও সচেতনতা তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সুযোগ। প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পরিবর্তন এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে নতুন ভূমিকায় নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব। চতুর্থত, জনআস্থা অর্জনের সুযোগ। সরকারের ঘোষিত নীতি বাস্তবে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি ও আইনের শাসনের বার্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

কঠোর অবস্থান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পথে
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো, বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আচরণ, সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার এবং জনস্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সুস্পষ্ট মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হলে তা সরকারের সামগ্রিক কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নয়, বরং অভিযোগ যাচাই, স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দায়িত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে কার্যকর হলে সরকারের অবস্থান আরও গ্রহণযোগ্য হবে।

আট মাসের মধ্যে চারজনের পদত্যাগ তাই বিএনপি সরকারের সামনে একদিকে নেতৃত্বের দৃঢ়তা তুলে ধরার, অন্যদিকে জবাবদিহির নীতি আরও সুসংহত করার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত অবস্থান যদি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দলীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা ও জনআস্থা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কালের আলো/আরআই/এমকে 

লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

ঢাকের বোল, শঙ্খের ধ্বনি আর উলুধ্বনিতে চারপাশ মুখর। কারও মুখ সিঁদুরে রাঙা, কারও চোখে বিদায়ের অশ্রু। আনন্দ আর বিষাদের এমন মায়াবী মেলবন্ধনের মধ্য দিয়েই বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, উৎসব আর মিলনমেলার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।

দেবীকে শেষবারের মতো প্রণাম জানাতে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিড় করেন ভক্তরা। দশমীর আনুষ্ঠানিকতা, দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা ঘিরে মণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে বিদায়ের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসতেই আনন্দের আড়ালে অনুভূত হয় বিচ্ছেদের বেদনা।

  • ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বুড়িগঙ্গার ঘাট—দেবীবরণ
  • সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনে শেষ শারদীয় দুর্গোৎসব
  • দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষায় ভক্তরা

বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিশেষ পূজা ও অঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তরা ধূপ, দীপ, বেলপাতা ও নানা পূজাসামগ্রী দিয়ে দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করেন। প্রার্থনায় উঠে আসে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য, দেশ ও জাতির শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রত্যাশা।

সিঁদুরে রাঙা উৎসব, চোখে বিদায়ের জল
পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয় দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জন। এরপর শুরু হয় দেবীবরণ ও ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার কপাল ও চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। পান ও মিষ্টি নিবেদনের মধ্য দিয়ে জানান বিদায়ী শ্রদ্ধা।

পরে একে অপরের কপাল ও মুখে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেন তাঁরা। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জল—লাল সিঁদুরে রাঙা মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আবেগের এক অনন্য দৃশ্যপট। উৎসবের শেষ দিনের এই আচার ঘিরে নারীদের মধ্যে দেখা যায় আন্তরিকতা, শুভকামনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রকাশ। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, দশমীর পূজা ও অঞ্জলি শেষে নিয়ম অনুযায়ী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় পূজার সমাপ্তি হয়। এরপর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয় এবং সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সিঁদুর খেলা।

তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তমীতে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে প্রতিমায় দেবীর উপস্থিতি আহ্বান করা হয়। আর দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। সিঁদুর খেলা বিজয়া দশমীর একটি ঐতিহ্যবাহী আচার, যার সঙ্গে স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনার বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।

ঢাকের তালে শোভাযাত্রা, গন্তব্য ওয়াইজঘাট
মন্দিরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শুরু হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখর শোভাযাত্রা বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের দিকে এগিয়ে যায়।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশ নেন অসংখ্য ভক্ত। নদীঘাটে পৌঁছে ধর্মীয় আচার মেনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। জলে প্রতিমা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক আয়োজন। বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তকে দেবীর উদ্দেশে প্রণাম জানাতে এবং আগামী বছর আবার ফিরে আসার প্রার্থনা করতে দেখা যায়। তাঁদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেলেও তাঁর আশীর্বাদ ও কল্যাণের প্রত্যাশা থেকে যায় মানুষের মনে।

রাজধানীতে ২৫৮ মণ্ডপে দুর্গোৎসব
সনাতন পঞ্জিকা ও উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাজধানীতে ২৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে ঢাকার নির্ধারিত ১১টি ঘাটে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পাঁচ দিনের এই উৎসবকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা, অঞ্জলি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে সেই ব্যস্ততা ও আনন্দের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।

বিদায়ের সুরে আগামী বছরের প্রতীক্ষা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে, দুর্গাপূজা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার আগমন মানুষের মনে জাগায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কল্যাণ ও ন্যায়ের প্রত্যাশা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপের আলো নিভলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় উৎসবের স্মৃতি। সিঁদুরের রং মুছে যাবে, ঢাকের আওয়াজ থেমে যাবে, কিন্তু দেবীকে ঘিরে প্রার্থনা ও বিশ্বাস থেকে যাবে অটুট। তাই বিজয়া দশমী শুধু বিদায়ের দিন নয়, এটি আবার ফিরে পাওয়ার আশারও দিন। বিষাদমাখা কণ্ঠে ভক্তদের প্রার্থনা—আগামী বছর আবার এসো মা, শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে।

কালের আলো/জেএন/এমকে

জলপাই-আমলকীতে হেমন্তের ঘ্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
জলপাই-আমলকীতে হেমন্তের ঘ্রাণ

শৈশবের চেনা স্বাদ, গ্রামবাংলার স্মৃতি আর টক-মিষ্টি ফলের আকর্ষণ—সব মিলিয়ে হেমন্তের শুরুতেই জমে উঠেছে রাজধানীর দেশি ফলের বাজার। জলপাই, আমলকী, আমড়া, কদবেল, চালতা, পানিফল, জাম্বুরা ও কামরাঙাসহ নানা মৌসুমি ফলে রঙিন হয়ে উঠেছে যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজারের ফলের দোকান। পছন্দের ফল কিনতে বাজারে ভিড় করছেন ক্রেতারা। তবে ফলের সমারোহে খুশি হলেও দামের ক্ষেত্রে হিসাব কষতে হচ্ছে অনেককে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর এই দুই বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানে দোকানে সাজানো দেশি ফলের পসরা। কেউ পরিবারের জন্য কিনছেন কয়েক ধরনের ফল, কেউ আবার দীর্ঘদিন পর পরিচিত ফলের দেখা পেয়ে কিনছেন নিজের পছন্দে। সারা বছর সহজে না পাওয়া এসব ফলের প্রতি বাড়তি টান তৈরি হয়েছে ক্রেতাদের মধ্যে।

  • রাজধানীর বাজারে ফিরেছে গ্রামবাংলার চেনা ফল
  • হেমন্তের শুরুতে যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজারে দেশি ফলের বাহার
  • শৈশবের স্মৃতি আর স্বাদের টানে ক্রেতা, দামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

৬০ টাকার জলপাই, ১০০ টাকার আমলকী
বাজারে প্রতি কেজি জলপাই বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। আমলকীর দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পাকা আমড়া ৮০ টাকা এবং কাঁচা আমড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি। পানিফল মিলছে ৪০ টাকায়, জাম্বুরা ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং পেঁপে ৬০ টাকা কেজি দরে।

এ ছাড়া কদবেল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পেয়ারা ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং কামরাঙা ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি চালতার দাম ৫ টাকা। আনারস কিনতে খরচ হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আর প্রতিটি তাল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। ফলের দামে ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য এক রকম নয়। কারও কাছে দাম মোটামুটি সহনীয়, আবার কারও মতে, কিছু ফলের দাম বেশি। তাই পছন্দ থাকলেও অনেকে কিনছেন পরিমাণ বুঝে, কেউবা একাধিক দোকানে দাম যাচাই করে নিচ্ছেন সিদ্ধান্ত।

ফলের টানে ফিরছে গ্রামের স্মৃতি
রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে গ্রামের পরিচিত অনেক ফলই সারা বছর সহজে মেলে না। মৌসুমে বাজারে এসব ফলের দেখা মিললে তাই স্বাদের পাশাপাশি ফিরে আসে পুরোনো দিনের স্মৃতি। যাত্রাবাড়ীর ক্রেতা সাব্বির বলেন, জলপাই, আমলকী, আমড়া ও কদবেল সারা বছর পাওয়া যায় না। বাজারে এসব ফল উঠলে কিনতে ইচ্ছা করে। দাম কিছুটা বেশি হলেও পরিবারের জন্য অল্প করে কেনেন তিনি। আরেক ক্রেতা জানান, গ্রামে থাকতে এসব ফল সহজেই পাওয়া যেত। এখন রাজধানীতে সব সময় পাওয়া যায় না বলে বাজারে এলে কিনতে মন চায়। তবে কেনার আগে কয়েকটি দোকানে দাম যাচাই করেন তিনি।

সরবরাহ কমলেই বাড়ে দামের চাপ
বিক্রেতাদের মতে, ফলের দাম নির্ভর করে সরবরাহ, আকার, মান ও সংগ্রহস্থলের ওপর। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কিছুটা কমে, আর সরবরাহ কমলে বাড়তে পারে। মৌসুমি অনেক ফল অল্প সময়ের জন্য পাওয়া যায় বলে এ সময় চাহিদাও থাকে। শ্যামবাজারের বিক্রেতা রবিউল আলম বলেন, মৌসুমি ফলের চাহিদা থাকলেও বেশি দামে সবাই কিনতে চান না। কেউ অল্প করে কেনেন, কেউ পরিবারের জন্য কয়েক ধরনের ফল নেন। ফলের মান ও সরবরাহ অনুযায়ী দাম নির্ধারিত হয়।

আরেক বিক্রেতা কামরুল হাসান বলেন, মৌসুমি ফলের স্থায়িত্ব কম। দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সময়মতো বিক্রি করতে হয়। এ কারণে ফলের বেচাকেনায় সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি পচনশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ফলের সমারোহে স্বাদ, পুষ্টি ও ঐতিহ্য
মৌসুমি দেশি ফলের আবেদন শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিতেও। ফলভেদে এতে রয়েছে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও খাদ্যআঁশ। সুষম খাদ্যাভ্যাসে নানা ধরনের ফল রাখার গুরুত্বও রয়েছে।

তবে রাজধানীর বাজারে এই ফলের সমারোহ স্রেফ কেনাবেচার চিত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতি ও স্মৃতির সম্পর্কও। টক জলপাই, কষযুক্ত আমলকী কিংবা স্বতন্ত্র স্বাদের কদবেল—পরিচিত এসব ফল অনেকের কাছেই ফিরিয়ে আনে ফেলে আসা দিনের কথা। হেমন্তের শুরুতে তাই দেশি ফলের পসরা ঘিরে রাজধানীর বাজারে তৈরি হয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। পছন্দের ফল কেনার আগ্রহ আছে, তবে সেই আগ্রহের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে দামের হিসাব। সাধ্য অনুযায়ী কেনাকাটার মধ্য দিয়েই মৌসুমি ফলের স্বাদ নিচ্ছেন নগরবাসী।

কালের আলো/এএএন/এমকে 

ফুটপাত পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ, আটক ছাত্রলীগ নেতা

আদালত প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১২ অপরাহ্ণ
ফুটপাত পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ, আটক ছাত্রলীগ নেতা

রাজধানীর মিরপুরে দখলমুক্ত ফুটপাত পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অনুসরণ করার অভিযোগে তানভীর জোমাদ্দার নামে ছাত্রলীগের এক নেতাকে আটক করেছে পুলিশ।

বুধবার (২১ অক্টোবর) তাঁকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ। আটক তানভীর পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত শনিবার মিরপুর-১০ এলাকায় দখলমুক্ত ফুটপাত পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করতে থাকেন তানভীর। একপর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি যাওয়ারও চেষ্টা করেন।

ঘটনাটি একটি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ওই ছাত্রলীগ নেতাকে শনাক্ত করতে তৎপর হয় পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্যরা। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার তাঁকে আটক করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, ভিডিওতে ওই ছাত্রলীগ নেতাকে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করতে দেখা গেছে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তবে তাঁকে আটকের সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি