খুঁজুন
                               
, ,
           

অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ঘুঘুডাঙ্গার ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি

দিনাজপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ঘুঘুডাঙ্গার ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি

দিনাজপুর সদর উপজেলা থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে পুনর্ভবা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি। একসময় প্রভাবশালী জমিদারি ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনাটি এখন সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবনের বিভিন্ন অংশ ও নকশাখচিত প্রবেশদ্বারের ভগ্নদশা দেখে সহজেই বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে কতটা জৌলুস হারিয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। অথচ যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পাশাপাশি এটি দিনাজপুরের পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় জায়গা হয়নি বাড়িটির।

ব্রিটিশ আমলে প্রভাবশালী জমিদারি ছিল ঘুঘুডাঙ্গায়
দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামেই গড়ে উঠেছিল এই জমিদার পরিবার। স্থানীয়ভাবে বসবাসরত জমিদার বংশের উত্তরসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও ইতিহাস অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে দিনাজপুর জেলার প্রভাবশালী জমিদারদের মধ্যে ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার অন্যতম ছিলেন। তৎকালীন দিনাজপুরের ১১টি থানায় তাঁদের জমিদারি এস্টেট বিস্তৃত ছিল বলে জানা যায়।

এই বিশাল জমিদারি পরিচালনার জন্য ছিল ১৮টি কাচারি ও ৪১টি তহসিল অফিস। এস্টেট থেকে প্রতিবছর ব্রিটিশ সরকারকে এক লাখ টাকা খাজনা দিতে হতো। জমিদারির বিস্তৃতি ও প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সে সময় এই পরিবারের প্রভাব ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ধারণা পাওয়া যায়। ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের গোড়াপত্তন করেন নবীর মোহাম্মদের একমাত্র ছেলে ফুল মোহাম্মদ। তাঁর উত্তরসূরিদের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে জমিদারি পরিচালিত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, এই জমিদারি প্রায় ৮০ বছর স্থায়ী ছিল।

জমিদারির সূচনা নিয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক ধারণা
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির যাত্রা ঠিক কোন সালে শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে তৎকালীন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার ইতিহাস থেকে এর সূচনাকাল সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭১ সালে পঞ্চসনা ব্যবস্থা চালু করে। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে ১৭৮৯ সালে দশসালা বন্দোবস্ত চালু করা হয়। এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ধারণা করা হয়, ১৭৭১ থেকে ১৭৮৯ সালের মধ্যে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির সূচনা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত কোনো সাল নয়, বরং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটভিত্তিক অনুমান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারি টিকে ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। জমিদারি ব্যবস্থার অবসানের পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ পরিবারের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর গুরুত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণ কমে যায়।

একসময় ছিল হাতিশাল, ঘোড়াশাল ও মেহমানখানা
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়িটি একতলা ও দোতলার সমন্বয়ে নির্মিত একটি পাকা ভবন। স্থাপনাটির বিশাল প্রবেশদ্বারে ফুল ও লতাপাতার নকশা ছিল, যা একসময় এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলত। কিন্তু বর্তমানে প্রবেশদ্বারসহ ভবনের বিভিন্ন অংশ ভগ্নদশায় রয়েছে। জমিদারবাড়িতে একসময় হাতিশালে হাতি ও ঘোড়াশালে ঘোড়া রাখা হতো। জমিদারি পরিচালনা ও দৈনন্দিন কাজের জন্য ছিলেন পাইক-পেয়াদা, সিপাহি, বাবুর্চি, খানসামা ও খামারু। পুরো ব্যবস্থাপনা দেখাশোনার জন্য একজন ব্যবস্থাপকও ছিলেন।

বাড়ির বাইরের অংশে ছিল মেহমানখানা ও একটি সুদৃশ্য মসজিদ। সপ্তাহে বা মাসে একবার মেহমানখানা চত্বরে গ্রামপ্রধানদের আসর বসত। সেখানে এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা, সামাজিক সমস্যা, কৃষিকাজ এবং আর্থিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। অর্থাৎ জমিদারবাড়িটি শুধু আবাসস্থল ছিল না; স্থানীয় সামাজিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। মেহমানখানার পেছনে রয়েছে জমিদার পরিবারের দুটি কবরস্থান। এসব স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন ঘুঘুডাঙ্গার অতীত ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত স্বর্ণের চেয়ার
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার এস্টেটে একসময় বেশ কিছু দুর্লভ ও মূল্যবান সামগ্রী ছিল। এর মধ্যে একটি স্বর্ণের চেয়ার বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া এস্টেটে ছিল ১০১ ভরি ওজনের স্বর্ণের তৈরি কৃত্রিম কই মাছ, রুপার বাটযুক্ত ছাতা, পাখা, রৌপ্যনির্মিত লাঠি এবং তামার ডেকচিসহ নানা সামগ্রী। এসব নিদর্শন জমিদার পরিবারের তৎকালীন ঐশ্বর্য ও জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করত। তবে স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে এসব মূল্যবান সামগ্রীর অনেকগুলো লুণ্ঠিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে জমিদারবাড়ির ঐতিহাসিক সংগ্রহের একটি বড় অংশ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে অবশিষ্ট স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণ করা গেলে অতীতের সেই ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দর্শনার্থীদের আগ্রহ থাকলেও বাড়িটি অবহেলিত
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা ফুল মোহাম্মদের উত্তরসূরিরা এখনো সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তবে তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নাজুক অবস্থায় পড়ে আছে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ থেকে অনেক মানুষ এখনো নিরিবিলি ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে জমিদারবাড়িটি দেখতে যান। পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী অবস্থান এবং গ্রামের শান্ত পরিবেশও স্থানটিকে দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। স্থানীয় ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে শিক্ষার্থী, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে তথ্য ও অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি স্থান। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরিচর্যা ও প্রচারের মাধ্যমে এলাকাটির পর্যটন সম্ভাবনাও কাজে লাগানো সম্ভব।

সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় নেই জমিদারবাড়ি
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ির সংরক্ষণ নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ আগামীর সময়কে জানান, বাড়িটি এখনো সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তিনি জানান, এ বিষয়ে কেউ আবেদন করলে স্থাপনাটি পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাড়িটি সংরক্ষণের সম্ভাবনা থাকলেও এখনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগের বিষয়টি সামনে আসেনি। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় আবেদন, প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে দিনাজপুরের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনের আরও অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তাই স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যাচাই করে যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঐতিহ্যপ্রেমীরা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

অচল টিউবওয়েল, নিরাপদ পানির সংকটে হাওড়ের মানুষ

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
অচল টিউবওয়েল, নিরাপদ পানির সংকটে হাওড়ের মানুষ

সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট। পুরোনো টিউবওয়েলগুলো থেকে পানি না ওঠায় কয়েক হাজার পরিবার পড়েছে চরম দুর্ভোগে। কোথাও একটি সরকারি টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরশীল ১৫টি পরিবার, আবার কোনো গ্রামে শত শত পরিবারের জন্য অচল হয়ে আছে একাধিক নলকূপ। পানির অভাবে রান্না, গোসলসহ দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চললেও প্রয়োজনীয় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে অনেক পরিবারকে দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় বাধ্য হয়ে পুকুরের দূষিত পানিও ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা।

পানির স্তর নেমেছে ৪০-৪৫ ফুট গভীরে
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে হাওড়াঞ্চলে পানির স্থিতিশীল স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট গভীরে চলে গেছে। ফলে প্রচলিত হ্যান্ডপাম্প দিয়ে আগের মতো পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। দিরাই ও শাল্লা উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হ্যান্ডপাম্প থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না।

এক টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর ১৫ পরিবার
দিরাই পৌরসভার পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের সাবিনা বেগম জানান, তাঁদের ১৫টি পরিবারের পানির একমাত্র ভরসা ছিল একটি সরকারি টিউবওয়েল। কিন্তু সেটিতে পানি না ওঠায় সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিশুদের গোসল করানোর জন্য দূরের এলাকায় যেতে হচ্ছে। এমনকি রান্নাবান্নার কাজেও পাশের পুকুরের পচা পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শাল্লা উপজেলার বাসিন্দা সন্দীপন তালুকদার বলেন, তাঁদের গ্রামে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস। সেখানে ১৪টি টিউবওয়েল অচল হয়ে পড়েছে। খাবার পানি সংগ্রহ করতেই মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গোসলসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে চান্দপুর এলাকার বাসিন্দা গীর্ব্বান প্রসাদ রায় শংকু জানান, গ্রামের পুরোনো অধিকাংশ টিউবওয়েলেই পানি উঠছে না। নিরাপদ খাবার পানির জন্য নারীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটতে হচ্ছে। গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ভিড়ও তৈরি হচ্ছে।

গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবিতে নারীদের অবস্থান
পানির সংকট নিরসনে বৃহস্পতিবার চান্দপুর গ্রামের অন্তত ৪০ জন নারী উপজেলা পরিষদে অবস্থান নেন। তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবি জানান। নারীদের অভিযোগ, গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। পুরোনো কোনো টিউবওয়েলেই পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ইউনিয়নভেদে অচল অধিকাংশ টিউবওয়েল
রফিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শৈলেন চন্দ্র দাস জানান, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ টিউবওয়েল থেকে পানি উঠছে না। ইউনিয়নের ১১টি নতুন পাড়ায় একটি টিউবওয়েলও নেই। এতে এসব এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাঁর মতে, ইউনিয়নে দেড়শ গভীর নলকূপ স্থাপন করা গেলে নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে সহায়তা হবে। তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ টিউবওয়েল বিকল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ইউনিয়নে অন্তত ৫০০টি টিউবওয়েল প্রয়োজন।

দুই উপজেলায় প্রয়োজন সাত হাজার টিউবওয়েল
জনস্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার প্রায় ৭৫ হাজার পরিবার এবং চার লাখের বেশি মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে অন্তত সাত হাজার টিউবওয়েল প্রয়োজন। তবে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রচলিত হ্যান্ডপাম্পের পরিবর্তে বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল খান বলেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে তাঁদের আওতাধীন ৯টি ইউনিয়নে পানির স্থিতিশীল স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট গভীরে নেমে গেছে। তিনি জানান, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে প্রচলিত ৬ নম্বর হ্যান্ডপাম্পের পরিবর্তে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হ্যান্ডপাম্প থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প ঝুলে আছে
দিরাই পৌরসভায়ও নিরাপদ পানির সংকট প্রকট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় অন্তত ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছ থেকে স্যানিটেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার জানান, পানি পরিশোধন করে সরবরাহের কাজের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে সাবেক মেয়র প্রকল্পের জন্য ভূমি বরাদ্দ দিলেও কাজ বাস্তবায়িত হয়নি। পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের টেন্ডার হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। সব মিলিয়ে দিরাই ও শাল্লার হাওড়াঞ্চলে নিরাপদ খাবার পানির সংকট এখন জনজীবনের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন ও কার্যকর পানি সরবরাহব্যবস্থা চালু করতে হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

নিয়ম ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা এক্সপ্রেসওয়েতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
নিয়ম ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা এক্সপ্রেসওয়েতে

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো ও যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পুরো ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ককে আধুনিক নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থা চালু হলে অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিংসহ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দায়ের করা যাবে। রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে। পদ্মা সেতু চালুর পর এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার সংখ্যাও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চার বছরে ৫৮৯ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৫২ জনের
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মোট দৈর্ঘ্য ৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশ মুন্সিগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে গেছে। মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চার বছরে এই সড়কে অন্তত ৫৮৯টি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫২ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ৯৫০ জন যাত্রী ও পথচারী। মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, চালকদের ঘুম ঘুম ভাব, অসচেতনতা, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন উপেক্ষা করার কারণে এ মহাসড়কে বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে।

পুরো মহাসড়ক এআই ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা
সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জের উন্নয়নকাজ এবং মুক্তারপুর-পঞ্চবটি দ্বিতল সড়কের নির্মাণকাজ পরিদর্শনে গিয়ে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, পুরো ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে এআই ক্যামেরার আওতায় আনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোকে পর্যায়ক্রমে এই প্রযুক্তির আওতায় আনার কাজ চলছে। এরপর জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়কেও এআই ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, সড়ক আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইন ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা
এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পদ্মা সেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোহাম্মদ আক্তার জানান, এক্সপ্রেসওয়ের পুরো অংশ এআই ক্যামেরার আওতায় এলে অতিরিক্ত গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হলে মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দায়েরের ব্যবস্থা থাকবে। এতে চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।

সাধারণ সিসিটিভির পাশাপাশি এআই নজরদারি
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মমিনুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে মহাসড়কে ইতোমধ্যে গতিসীমা-সংক্রান্ত সাইনবোর্ড এবং বিভিন্ন পয়েন্টে সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রয়েছে। তবে অতিরিক্ত গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং ছাড়াও আকস্মিক ইউটার্ন, চালকদের অসচেতনতা এবং ট্রাফিক আইন না মানার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। শীতকালে ঘন কুয়াশাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তার মতে, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালু করা গেলে এসব অনিয়ম শনাক্ত করা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

মেট্রোরেলে সংরক্ষিত আসনে বসা নিশ্চিত করল ভ্রাম্যমাণ আদালত

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ
মেট্রোরেলে সংরক্ষিত আসনে বসা নিশ্চিত করল ভ্রাম্যমাণ আদালত

রাজধানীর মেট্রোরেলে প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত সংরক্ষিত আসনে তাদের বসা নিশ্চিত করতে তদারকি চালিয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে আগারগাঁও ও শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় যাত্রীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিএমটিসিএলের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে।

সংরক্ষিত আসনে বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত
অভিযানের অংশ হিসেবে মেট্রোরেলের কোচে প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ‘অগ্রাধিকার আসন’ বা প্রায়োরিটি সিট তদারকি করা হয়। এসব আসনে নির্ধারিত যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।

ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোরেলের প্রতিটি কোচে শুরু থেকেই প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সুবিধার্থে অগ্রাধিকার আসন সংরক্ষিত রয়েছে। এ বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন করতে প্রতিটি স্টেশনে নিয়মিত ঘোষণা প্রচার করা হয়।

আগারগাঁওয়ে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ
আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ফুটপাত ও আশপাশের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা ভাসমান দোকানপাট এবং বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এসব স্থাপনার কারণে যাত্রীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছিল বলে জানানো হয়েছে।

অভিযানের মাধ্যমে স্টেশন এলাকায় যাত্রীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শাহবাগেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান
এদিকে শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন এলাকায়ও পৃথক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ডিএমটিসিএলের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে যাত্রীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা ভাসমান দোকানপাট ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা
মেট্রোরেল স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং সংরক্ষিত আসন ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জনস্বার্থে ডিএমটিসিএলের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি