খুঁজুন
                               
, ,
           

সবার সহযোগিতায় দেশকে সুশৃঙ্খল ও শান্তির পথে নিয়ে যেতে চান সেনাপ্রধান

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ আগস্ট, ২০২৪, ৮:০০ অপরাহ্ণ
সবার সহযোগিতায় দেশকে সুশৃঙ্খল ও শান্তির পথে নিয়ে যেতে চান সেনাপ্রধান

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় দেশজুড়ে সংগঠিত হচ্ছে পুলিশ। থানায় থানায় জোরদার হচ্ছে পুলিশের কার্যক্রম। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও। পুরো কার্যক্রম নিজ চোখে দেখতে সেনাবাহিনীর ডিভিশন এরিয়াগুলো পরিদর্শন শুরু করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সোমবার (১২ আগস্ট) ৫৫ পদাতিক ডিভিশনে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলেন সেনাপ্রধান। তাঁর হিসাবে দেশের ৯০ শতাংশের ওপরে থানা ও রাজধানীর ৮৫ শতাংশ থানায় পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পুলিশ সংগঠিত হওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে জড়িত অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন সেনাবাহিনী কবে কখন সেনানিবাসে ফিরে যাবে সেই কথাও। বলেছেন, ‘পুলিশ ফোর্স যখন আবার সুন্দরভাবে তাদের কাজ শুরু করতে পারবে তখন আমরা সেনানিবাসে ফেরত যাবো।’ দেশকে সুশৃঙ্খল ও শান্তির পথে নিয়ে যেতে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

পুলিশ ফোর্সকে বিভিন্ন থানায় কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে প্রটেকশন দিচ্ছি
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আপনারা জানেন যে, দেশে একটি উদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। অরাজক পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়। ৫ তারিখ বা তাঁর পরবর্তী সময়টা আরও একটু ভিন্ন। সেখানে অনেক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় লুটপাট হয়েছে। অগ্নিসংযোগ হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশ ফোর্সের ওপরে আক্রমণ হয়েছে। পুলিশ ফোর্সের সংখ্যা ২ লক্ষ। এই একটা বড়সংখ্যক পুলিশ ফোর্স যখন ইন অ্যাকটিভ (অকার্যকর) ছিল তখন এটাকে কভার করা সেনাবাহিনীর জন্য দুরূহ হয়ে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে আমরা সুন্দরভাবে আমাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি। পুলিশ ফোর্সকে বিভিন্ন থানায় কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে তাদের প্রটেকশন দিচ্ছি, তারা কার্যক্রম শুরু করেছে।’

প্রধান উপদেষ্টাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ
খুলনা ডিভিশনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আত্মতুষ্টির কোন কারণ নেই জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমাদের আরও ভালোভাবে কাজ করতে হবে। পুলিশকে আরও সংগঠিত করতে হবে তাহলে আমরা নিশ্চিত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত যেতে পারবো। এজন্য আমরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশনগুলো ডেপ্লয় আছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। ইনশাআল্লাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। পুলিশ ফোর্স যখন আবার সুন্দরভাবে তাদের কাজ শুরু করতে পারবে তখন আমরা সেনানিবাসে ফেরত যাবো। আজকে সকালেও প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার কাছ থেকে ব্রিফ নিয়েছেন। দেশের ৯০ শতাংশের ওপরে থানা ও রাজধানীর ৮৫ শতাংশ থানা তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। এ পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে।’

দেশের ২০ জেলায় ৩০টি মাইনরিটি রিলেটেড অপরাধ
মাইনরিটি রিলেটেড (সংখ্যালঘু সংক্রান্ত) অপরাধ বিষয়ে নিজের স্টাডির কথা তুলে ধরেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, ‘আমি স্টাডি করে দেখেছি দেশে ২০টি জেলায় ৩০টি মাইনরিটি রিলেটেড (সংখ্যালঘু সংক্রান্ত) অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ লুটপাট ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি। আমি আশা করি এই বিষয়গুলো নরমাল হয়ে যাবে। আমি সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুরোধ করবো তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তারা যেন কোন ধ্বংসাত্মক কাজ না করে। তাঁরা বুঝবেন জনগণের দাবি কী? যদি জনগণ অরক্ষিত থাকে, যদি অশান্তি বিরাজ করে আমি নিশ্চিত তারা সেই রাজনীতি করবেন না, সেটি জনগণের রাজনীতি হবে না। আমি নিশ্চিত সবাই আমাদের সাহায্য করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হবো। সেই উদ্দেশ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আসুন আমরা দেশকে সুশৃঙ্খল ও শান্তির পথে নিয়ে যাই।’

রাজনীতি থাকবে, রাজনীতি থাকতেই হবে
রাজধানী ঢাকায় ডাকাতির সুলুক সন্ধান করে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘ডাকাতি হচ্ছে এর ৮০ পার্সেন্ট প্যানিক, ২০ পার্সেন্ট ফ্যাক্ট। মানুষের মধ্যে হানাহানি কমে আসছে। কমে আসলে এগুলো থাকবে না। অতীতেও রাজনৈতিক সংঘর্ষ হয়েছে, এটি কাম্য না। রাজনীতি থাকবে। রাজনীতি থাকতেই হবে, মিটিং মিছিল হবে। কিন্তু ধ্বংসাত্মক কোন কার্যকলাপ আমরা চাই না। এটি কখনো দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক না। পুলিশকে আমরা সংগঠিত করে ফেলেছি। যারা যতো অপকর্ম করেছে তার জন্য অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এটি অবশ্যই দু:খজনক। পুলিশ সংগঠিত হলে তদন্ত করবে, তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, বিজিবি ও র‍্যাবও তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। আপনারা আমাদের সাহায্য করেন। সবাই মিলে দেশকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যাবো। প্রেসক্লাব বা জনগণের টাকায় নির্মিত স্থাপনা পুড়িয়ে দিলে, ধ্বংস করে দিলে জনগণের ক্ষতি। সবাইকে এটি বুঝতে হবে।

এ সময় সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও যশোরের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুবুর রশীদ, খুলনা নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল গোলাম সাদেক, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার, কেএমপি কমিশনারসহ উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সেনাপ্রধান গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার গোপীনাথপুরে বিক্ষোভকারীদের হামলায় আহত অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সেনাসদস্যদের দেখতে যশোর সিএমএইচ এ গমন করেন। এরপর তিনি খুলনায় অবস্থিত সেনাবাহিনী ক্যাম্পে মোতায়েনরত সেনাসদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সকল পদবির সেনাসদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির কার্যক্রম শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৮:০১ অপরাহ্ণ
বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির কার্যক্রম শুরু

Oplus_131072

রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম আজ বঙ্গভবনে তার কার্যক্রম শুরু করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এই প্রথম বঙ্গভবনে সশরীরে অফিস শুরু করেন।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে বঙ্গভবনে পৌঁছালে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানায়। পরে পিজিআর-এর একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

পরে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন, জনবিভাগের সচিব খান মো. নূরুল আমিন, প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম ও পিজিআর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলম রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।

আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রপতি নিজ অফিস কক্ষে বঙ্গভবনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হন ও মতবিনিময় করেন। এসময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ তাকে বঙ্গভবনের ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে অবহিত করেন। রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে কাজ শুরুর প্রথম দিনে কয়েকটি সারসংক্ষেপ, বাণী ও নথিতে স্বাক্ষর করেন।

পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেন। তিনি ক্রেডেনশিয়াল হল, দরবার হল, তোষাখানা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে তিনি পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন। নির্ধারিত কর্মসূচি শেষে দুপুরে রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বঙ্গভবন ত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই ২০২৬ সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কালের আলো/এসএকে

‘ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা’ গড়তে শিক্ষার্থীরাই বড় শক্তি: ডিএনসিসি প্রশাসক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৮:০০ অপরাহ্ণ
‘ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা’ গড়তে শিক্ষার্থীরাই বড় শক্তি: ডিএনসিসি প্রশাসক

‘ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা’ বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পরিচ্ছন্নতা ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হলে রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হবে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর মিরপুর-১৪ এলাকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত বিএন কলেজে আয়োজিত ‘স্টার্টআপ সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন মানবিক মানুষ এবং তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আমরা তার সহকর্মী হিসেবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও উদ্বুদ্ধ করাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। এ ধরনের কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সিটি কর্পোরেশনের সেবা আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

শফিকুল ইসলাম খান শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং সৃজনশীলতার প্রশংসা করে বলেন, চেষ্টা থাকলে সফলতা অবশ্যই আসে। নেভি কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণাগুলো নগরের প্রতিটি ওয়ার্ড ও পাড়ায় ছড়িয়ে দিয়ে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার কাজে কাজে লাগানো হবে।

পুরস্কার বিতরণ শেষে বাংলাদেশ নেভি কলেজ, ডেন্টাল কলেজ ও নেভি স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র‍্যালিতে আধুনিক ডাস্টবিন ব্যবহারের পদ্ধতি প্রদর্শন করা হয় এবং শিক্ষার্থীরা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেন।

বিএন কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন এম. ইসমাইল মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডোর হুমায়ুন কবীর, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

সুস্বাদু পাউরুটিতে ক্যান্সারের ফাঁদ!

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
সুস্বাদু পাউরুটিতে ক্যান্সারের ফাঁদ!

সকালের নাশতার টেবিলে কিংবা ব্যস্ত নগরজীবনের দ্রুতগতির সকালে এক স্লাইস পাউরুটি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রধান অনুষঙ্গ। দুধে ভেজানো পাউরুটি শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবার কাছেই পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার হিসেবে সমাদৃত। কিন্তু এই নরম, সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় ফোলানো পাউরুটির প্রতি স্লাইসেই যে লুকিয়ে আছে মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতো এক বিষাক্ত ফাঁদ, তা আমাদের অজানা থেকে যাচ্ছে। অতি মুনাফালোভী একশ্রেণীর বেকারি মালিক ও সরকারের তদারকি সংস্থার চরম উদাসীনতায় প্রতিদিন দেশের কোটি কোটি মানুষ বিষ গিলে খাচ্ছে। প্রাতঃরাশের এই সাধারণ উপাদানটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরবে ডেকে আনছে মহা বিপর্যয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশের হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি রিট আবেদন খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও জনসমক্ষে এনে দাঁড় করিয়েছে। মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গুড গভর্নেন্স ফাউন্ডেশন (এমএইচআরজিএফ)-এর পক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান কবীর আলমগীর জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি করেন। এতে পাউরুটি উৎপাদনের সময় বিষাক্ত পটাশিয়াম ব্রোমেটের (Potassium Bromate – \text{KBrO}_3) ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সাথে বাজারজাতকৃত পাউরুটির প্যাকেটের গায়ে ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার হয়নি’—এই মর্মে স্পষ্ট ঘোষণা রাখা বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই আইনি পদক্ষেপের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বোঝা যায় রিটে বিবাদী হিসেবে অভিযুক্তদের তালিকা দেখলে। রিটে খাদ্যসচিব, বিএসটিআই মহাপরিচালক, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান—যেমন প্রাণ ফুডস, নাবিস্কো, ডেনিস, ফ্রেশ (মেঘনা গ্রুপ), আকিজ ফুড এবং হক ফুডের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিবাদী করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেবল কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, বাজারে বিদ্যমান অনিয়মের লাগাম টানার এক কঠোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

পাউরুটি তৈরির চিরাচরিত ও নিরাপদ পদ্ধতি ছিল ইস্ট (Yeast) বা খাবার সোডার ব্যবহার। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ এবং বাজার দখলের অসম প্রতিযোগিতায় উৎপাদন ত্বরান্বিত ও সস্তা করার কৌশল হিসেবে নব্বইয়ের দশক থেকে বেকারিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের অনুপ্রবেশ ঘটে।

পটাশিয়াম ব্রোমেট প্রধানত আটার খামিরকে দীর্ঘস্থায়ী করা, রুটিকে তুলতুলে রাখা এবং অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে তোলার ‘ডফ ইম্প্রুভার’ (Dough Improver) বা আটা প্রক্রিয়াজাতকরণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। এটি সস্তা এবং খুবই অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলেও পাউরুটির চেহারা চমৎকার ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচলিত ইস্টের বাড়তি খরচ বাঁচাতে বেকারির মালিকেরা অজান্তেই বা জেনেশুনেই এই বিপজ্জনক রাসায়নিক উপাদানের ওপর ঝুঁকছেন।

বিশ্বের প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে বেকারি খাদ্যে রাসায়নিকটির ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) একে ‘গ্রুপ টু-বি কারসিনোজেন’ (Group 2B Carcinogen) হিসেবে চিহ্নিত করেছে—যা মানবদেহে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

আন্তর্জাতিকভাবে এমন উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল দীর্ঘসূত্রতায় ভরা। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ২০১৬ সালে পাউরুটির মান নির্ধারণের সময় ১ কেজি পাউরুটিতে ৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক গবেষণার ভিত্তিতে ২০১৮ সালে বিএসটিআই এবং ২০২২ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বেকারি খাদ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

কিন্তু খাতা-কলমে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও বাস্তবে ঢাকা শহরসহ জেলা ও উপজেলার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অগণিত অনিবন্ধিত ও অপরিকল্পিত বেকারিতে এর ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালিত এক ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ১৯টি পাউরুটির নমুনার মধ্যে ১৬টিতেই—অর্থাৎ ‘৮৪ শতাংশ নমুনায়’—অতিরিক্ত মাত্রায় পটাশিয়াম ব্রোমেট বিদ্যমান ছিল। যার মাত্রা ছিল ৩.৩১ পিপিএম থেকে ১২.৯১ পিপিএম পর্যন্ত। এমনকি ২০২৫ সালেও নতুন করে নেওয়া একাধিক নমুনায় পটাশিয়াম ব্রোমেট এবং সহনশীল মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ক্ষতিকর ‘ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেট’ (১.৫৭%, যেখানে অনুমোদিত মাত্র ০.৭%) পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

ভেজাল খাদ্যের এই তাণ্ডবে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ১ লাখ ১৭ হাজারের বেশি মানুষ এই মরণব্যাধিতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। এ ছাড়া দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ নানা ধরনের কিডনি জটিলতায় ভুগছে।

খাদ্যে বিদ্যমান পটাশিয়াম ব্রোমেট কেবল সাধারণ ক্যানসার নয়, এটি একটি ‘জেনোটক্সিক কারসিনোজেন’—যা সরাসরি মানুষের ডিএনএ এবং জিনগত গঠনে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম। এটি থাইরয়েড গ্রন্থির ম্যালিগন্যান্সি এবং কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম অনুঘটক।

আমাদের রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেভাবে কোনো নিয়ম-কানুন ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেকারি গড়ে উঠছে, তা সত্যি উদ্বেগের। সেখানে একদিকে যেমন নেই ন্যূনতম পরিচ্ছন্নতা, তেমনি নেই কোনো টেকনিশিয়ান বা রসায়নবিদ, যিনি উপাদান পরিমাপ করতে পারেন। আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে আটার খামিরে।

এখানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নজরদারির অভাব স্পষ্ট। কেবল মাঝেমধ্যে কিছু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং নামমাত্র জরিমানা করে খাদ্য নিরাপত্তার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিয়মিত ল্যাব টেস্টিং, কঠোর মনিটরিং এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীরা আদালতের নির্দেশ কিংবা কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্যানসারের এই বিষাক্ত হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে রাষ্ট্রকে কঠোর ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে:
১.হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পাউরুটি ও বেকারি খাদ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে একটি স্থায়ী তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।
২.সকল প্রক্রিয়াজাত পাউরুটির প্যাকেটে ব্যবহৃত উপাদানের বিস্তারিত তালিকা এবং ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট-মুক্ত’ সনদ প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
৩.যেসকল বেকারি বা ব্র্যান্ড নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করবে, তাদের কারখানা তাৎক্ষণিক সিলগালা এবং মালিক পক্ষকে দৃশ্যমান মেয়াদের কারাদণ্ড দিতে হবে।
৪.ঐতিহ্যগত ও নিরাপদ উপাদান যেমন ভালো মানের ইস্ট এবং প্রাকৃতিক এনজাইম ব্যবহারে বেকারি মালিকদের উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
৫.সাধারণ মানুষকে প্লাস্টিক বা সাধারণ প্যাকেটে মোড়কহীন এবং অনিবন্ধিত বেকারির লোভনীয় ফোলানো পাউরুটি কেনা থেকে সতর্ক থাকতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,একটি জাতির সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। বিষাক্ত খাদ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রেখে কোনো দেশ কখনো উন্নত বা কল্যাণকামী হতে পারে না। প্রাতঃরাশের স্লাইস পাউরুটি যেন পরিবারের কারো জন্য ক্যান্সারের টিকিট হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আদালতের দরজায় হানা দিয়ে সচেতন নাগরিকেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন; এখন সময় এসেছে প্রশাসনিক যন্ত্রের জাগরণের। নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি কোনো দয়া নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকার। সুতরাং আর কাল বিলম্ব না করে এই বিষাক্ত ফাঁদ গুঁড়িয়ে দিয়ে সুস্থ ও ক্যান্সারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এখনই চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অভিশাপ থেকে আমরা কেউ বাঁচতে পারব না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট,রাজনৈতিক বিশ্লেষক।