খুঁজুন
                               
, ,
           

সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারে শঙ্কা কাটিয়ে স্বস্তি জনমনে

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪, ১১:২২ অপরাহ্ণ
সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারে শঙ্কা কাটিয়ে স্বস্তি জনমনে

CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v80), quality = 82?

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর:

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর টানা তিনদিন সরকারবিহীন ছিল দেশ। ১৫ বছরের জবাবদিহিতাহীন শাসনের অবসানের পর ছাত্রদের অনুরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস। একটি স্বস্তিদায়ক ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। আবার, এ সময়টিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ভেঙে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন। ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে উধাও হয়ে যায় পুলিশ। সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই পুলিশি ব্যবস্থা পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করে। ভীতিকর অবস্থা ও নৈরাজ্য বন্ধে বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে সারা দেশে সেনা মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্ট ঘোষণা দেন কোনভাবেই এই অন্তবর্তী সরকারকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতায় পাশে থাকবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

  • অন্তবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও ইতিবাচক মনে করছেন দেশের সাধারণ মানুষ
  • কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার কিংবা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারবেন সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা
  • সেনাবাহিনী কারও প্রতি অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না
  • নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কাজ করে নির্মোহভাবে

পরবর্তীতে সেনা সদস্যদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও কর্মদক্ষতায় রাজধানীসহ দেশের জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সহিংসতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকাও হতে থাকে সচল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় দেশের থানাগুলোতে চালু হয় পুলিশী কার্যক্রম। শিল্পাঞ্চলে নাশকতা-অস্থিরতা চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিকে নিয়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর শক্ত কাঠামোর মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলে প্রাণান্তকর প্রয়াস। ইতোমধ্যেই সেনাপ্রধান নবম পদাতিক ডিভিশনের মাধ্যমে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সিকিউরিটি টাস্কফোর্স গঠন করেছেন। সেনাবাহিনীর দু’টি ব্রিগেড এই টাস্কফোর্স পরিচালনা করছে। কিন্তু দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টে এক মুহুর্তও থামেনি নানামুখী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র।

সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো অপপ্রয়োগ ঘটবে না
অধ্যাপক আসিফ নজরুল
উপদেষ্টা, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়

দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অবশেষে গত মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সেনাবাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রদান করে সরকার। এখন থেকে কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার কিংবা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারবেন সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। দেশের দু:সময়ে ত্রাণকর্তা ও নির্ভরতার প্রতীক দেশপ্রেমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ায় জনমনে পুরোমাত্রায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। অন্তবর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও ইতিবাচক হিসেবেই মনে করছেন দেশের সাধারণ মানুষ।

জনগণের সুবিধার জন্য সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো.জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী
উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

তাঁরা বলছেন, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্রবাহিনীর রয়েছে গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা। সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা কিংবা অতীতে সাইক্লোন ও ঘুর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দেশপ্রেমী সশস্ত্র বাহিনী সফলতার সঙ্গে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা
মোখলেস উর রহমান
সিনিয়র সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেয়ার ফলে জনমনে স্বস্তির প্রধান কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, দেশের সাধারণ মানুষ মনে করে যে সেনাবাহিনী কারও প্রতি অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না; বরং নিয়ম-নীতি অনুযায়ী নির্মোহভাবে তাঁরা কাজ করে। পাশাপাশি সিভিল প্রশাসন বা অন্য বাহিনীর লোকজনের কোন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষ ঠিক তেমনভাবে মানতে চায় না। নির্দেশ অমান্য করতে চায়। কিন্তু সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে সাধারণত তেমনটি করেনা। একই সঙ্গে রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানে একটি বুলেটও না ছুঁড়ে; ছাত্র-জনতার প্রতিপক্ষ না হয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও উজ্জ্বল করেছে নিজেদের ভাবমূর্তি। প্রমাণ করেছে, তাঁরা দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে আপোসহীন, সৎ-নির্ভীক এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তাই তাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বেড়েছে বহুগুণে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোমাত্রায় উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধী ও ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে নিরাপত্তার শঙ্কাকে কাটিয়ে তুলতেও তাঁরা সক্ষম হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সাধারণ মানুষ মনে করেন, সঠিক সময়েই সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পোশাক খাতসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অসন্তোষ দমনের পাশাপাশি পুরো দেশে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে এমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ড.ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়। আগামী দুই মাস অর্থাৎ ৬০ দিন এই সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৭টি ধারা প্রয়োগের ক্ষমতা পেয়েছেন সেনা কর্মকর্তারা। ধারাগুলো হলো ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫ (২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ ও ১৪২।

দেশ বিরোধী সব অপতৎপরতা রুখে দেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
এ প্রসঙ্গে অন্তবর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নাশকতা, অরাজকতা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার মতো কিছু কর্মকাণ্ড ঘটছে বলে আমরা লক্ষ্য করেছি। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হয়েছে এই পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য। এসব অপতৎপরতা রুখে দেওয়ার জন্য, মোকাবিলা করার জন্য।’ সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এর কোনো অপপ্রয়োগ ঘটবে না বলেও আশাবাদী এই আইন উপদেষ্টা।

জনগণের সুবিধার জন্য সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার (বিচারিক ক্ষমতা) দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো.জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪০তম বিসিএস (আনসার) ক্যাডার কর্মকর্তা এবং ২৫তম ব্যাচ (পুরুষ) রিক্রুট সিপাহি মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘সেনাবাহিনী যেহেতু অনেকদিন ধরে মাঠে আছে, তাদের তো একটা ক্ষমতার মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। আবার আমাদের অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে স্বল্পতা রয়ে গেছে, এটা পূরণ করার জন্য সেনাবাহিনী আনা হয়েছে। আর এ সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রি পাওয়ারটা ভোগ করবে বাংলার জনগণ।’

প্রায় একই রকম কথা বলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেস উর রহমান। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায়, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মোখলেস উর রহমান আরও বলেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর থেকে সব পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কাজ করছে। মানুষ যাতে আরও জনবান্ধব পরিবেশে চলাচল করতে পারে, নিরাপদ বোধ করে, মানুষের মধ্যে যাতে আস্থা থাকে- এ জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সববাহিনী একইসঙ্গে একই ছাতার নিচে কাজ করছে, এই ম্যাসেজটার জন্যই এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার মনে করেছে বিস্তৃত পর্যায়ে মাঠের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের সেনাবাহিনী কাজ করছে। তারা মনে করেছে, এটা (সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া) হলে জনগণ আরও নিরাপদ বোধ করবে। এই মুহূর্তে মনে হয়েছে এটা দরকার। টার্গেট (সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়ার সময়) বলে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬০ দিন।’

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা আছে, এক্ষেত্রে কোনও দ্বন্দ্ব তৈরি করবে কি না- এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ সিনিয়র সচিব বলেন, প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাজের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না। এটা কোনও ক্যাডারের ক্ষমতা না, এটা রাষ্ট্রের ক্ষমতা। এক রাষ্ট্র এক জনগণ এক সরকার। জনস্বার্থে আপনি কাজ করেন, আমি কাজ করি। এটা (সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া) ভালো ফল দেবে।

ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারে কী কী করতে পারবে সেনাবাহিনী?
সেনাবাহিনীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ‘ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮’ এর ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ ও ১৪২ ধারার অপরাধগুলো বিবেচনায় নিতে পারবেন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে। আইনের এসব ধারা অনুযায়ী একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের যেসব ক্ষমতা রয়েছে- ৬৪ নম্বর ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার বা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার এবং হেফাজতে রাখার ক্ষমতা। ৬৫ নম্বর ধারায় গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা বা তার উপস্থিতিতে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা যার জন্য তিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন। ধারা ৮৩/৮৪/৮৬ হচ্ছে- ওয়ারেন্ট অনুমোদন করার ক্ষমতা বা ওয়ারেন্টের অধীনে গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপসারণের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা। ধারা ৯৫(২) হলো- নথিপত্র ইত্যাদির জন্য ডাক ও টেলিগ্রাফ কর্তৃপক্ষের দ্বারা অনুসন্ধান এবং আটক করার ক্ষমতা। ১০০ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে- ভুলভাবে বন্দি ব্যক্তিদের হাজির করার জন্য অনুসন্ধান-ওয়ারেন্ট জারি করার ক্ষমতা। ধারা ১০৫ হচ্ছে- সরাসরি তল্লাশি করার ক্ষমতা, তার (ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি) উপস্থিতিতে যে কোনো স্থানে অনুসন্ধানের জন্য তিনি সার্চ ওয়ারেন্ট জারি করতে পারেন। ধারা ১০৭ হলো- শান্তি বজায় রাখার জন্য নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা। ১০৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে-ভবঘুরে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তির ভালো আচরণের জন্য নিরাপত্তার প্রয়োজনীর ক্ষমতা। ধারা ১১০ হচ্ছে-ভালো আচরণের জন্য নিরাপত্তা প্রয়োজনীয় ক্ষমতা। ধারা ১২৬ এ উল্লেখ রয়েছে- জামিনের নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা। ধারা ১২৭ এ বলা হয়েছে- বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার আদেশ দানের ক্ষমতা। ধারা ১২৮ এ বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য বেসামরিক শক্তি ব্যবহার করার ক্ষমতা রয়েছে। ধারা ১৩০ হচ্ছে- বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করার ক্ষমতা। ধারা ১৩৩ এ বলা হয়েছে- স্থানীয় উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ক্ষেত্র বিশেষে ব্যবস্থা হিসেবে আদেশ জারি করার ক্ষমতা। ধারা ১৪২ হচ্ছে- জনসাধারণের উপদ্রবের ক্ষেত্রে অবিলম্বে ব্যবস্থা হিসেবে আদেশ জারি করার ক্ষমতা। উল্লিখিত এসব ক্ষমতা ছাড়াও, যে কোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর অধীনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার জন্য সরকার এবং সেই সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারের মধ্যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার উপস্থিতিতে সংঘটিত অপরাধ বা ঘটনাস্থলে তার বা তার সামনে উন্মোচিত হওয়া অপরাধগুলো বিবেচনায় নিতে পারেন। অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির পর ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী অপরাধীকে সাজা দিতে পারেন। তবে কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে তা দুই বছরের বেশি হবে না।

কালের আলো/এমএএএমকে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকায় এগিয়ে এলো কাতার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকায় এগিয়ে এলো কাতার

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতার দায়িত্ব এতদিন অনেকটা এককভাবেই পালন করে এসেছে পাকিস্তান। এবার পাকিস্তানের পাশাপাশি এই ভূমিকায় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারও।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরান সফরে গিয়েছিলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা-সংলাপ চালিয়ে যেতে আর আগ্রহী নয় যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অভিযান ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরুর ঘোষণা দেন। এদিন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত-বিনিময়ের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের (ইরান) সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না। (ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে) বৈঠক কিংবা এ জাতীয় কোনো কিছুর পরিকল্পনাও আমাদের নেই।”

তবে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন. “আমরা চাই, ইরান একটি ফলপ্রসূ আলোচনার সিদ্ধান্ত নিক। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন আমাদের এই অর্থনৈতিক অভিযান চলবে।”

ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। সেই অভিযান থেকে সূত্রপাত হওয়ার পর প্রায় ৬ মাস পেরিয়েছে যুদ্ধের। এতদিন মার্কিন এবং ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনী পরস্পরকে লক্ষ্য করে অভিযান-পাল্টা অভিযান পরিচালনা করেছে, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় দু’টি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে, আবার সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে পরস্পরকে লক্ষ্য করে অভিযানও পরিচালনা করেছে।

তবে ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণার কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে দেশটির অর্থনীতির ওপর সীমাহীন চাপ প্রয়োগের নীতি নিয়েছে ওয়াশিংটন।

এমন পরিস্থিতিতেই তেহরান সফর করলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র কাতারের প্রধামন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুলরহমান আল-থানি। ওয়াশিংটন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণার চার দিন পর তেহরানে পৌঁছে দেশটির শীর্ষ আলোচক এবং ক্ষমতসীন ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং সে বৈঠকে ইরানকে ফের কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আল-থানির এ আহ্বানের উত্তরে ঘালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা সম্পূর্ণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তেহরান ফের কূটনৈতিক আলোচনায় আসতে পারে।

আল-থানি এবং ঘালিবাফের বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নির্বাহী প্রধান মেজর জেনারেল মোহসিন রেজায়িও ছিলেন। তিনি বলেছেন, ইরান শিগগিরই হরমুজ প্রনালী খুলে দেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই আলোচনা চায়— তাহলে ইরানের হরমুজ বিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণের আগেই তা শুরু করতে হবে।

আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে কঠোর হামলা পরিচালনা করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন রেজায়ি।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করার পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কটূক্তি করা হলেও স্পিকার নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেননি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেছেন, আজকে আমরা দেখলাম, স্পিকার একটু পক্ষপাতিত্ব করলেন এবং বিরোধীদলের সঙ্গে বৈষম্য করলেন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টায় জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠক থেকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, স্পিকার বিরোধীদলকে ‘অসহিষ্ণু’ হিসেবে তুলে ধরারও ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অথচ গত ছয় মাসে বিরোধীদল সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছে এবং দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির আমলে বিরোধীদল যে আচরণ করেছিল, তার কিছুই কিন্তু এই বিরোধীদল করেনি। বরং গত ছয় মাস আমরা সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছি এবং সহযোগিতার কথা বলে এসেছি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, জনগণের দুর্ভোগ যখন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন জনগণের পক্ষে কথা বলা বিরোধীদলের দায়িত্ব। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণও সেটিই।

তিনি আরও বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ গত ১৮০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের ছয় মাসের পরিস্থিতির তুলনা করে জানতে চাওয়া হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকার কতটা সক্ষম হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন কিনা।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে সাধারণ মানুষ ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ, হামলা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটছে। সংসদ সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব তথ্য শুধু বিরোধীদলের বক্তব্য নয়, পুলিশ সদর দফতরের তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপাত্তেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কটূক্তি করেছেন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করা হলেও স্পিকারের ভূমিকা নিরপেক্ষ ছিল না।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলসহ তিনটি বিল উত্থাপনের জন্য আনা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা এসব বিলের বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিচ্ছিন্নভাবে না এনে গণভোটের গণরায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে আলোচনা করা উচিত।

তিনি অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও আইনগুলো নিয়ে বিশেষ কমিটিতে আলোচনার কথা থাকলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখন সরকার নিজেদের মতো করে এসব বিল বিচ্ছিন্নভাবে সংসদে এনে পাস করানোর চেষ্টা করছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা সংসদে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দেখতে পাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। যেখানে স্পিকার ও সরকারি দল এককভাবে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।

এই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বলে জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে বলেন, ওই পরিষদের মাধ্যমেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত। উদার ও মধ্যপন্থি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় গোড়ামি, পরমতঅসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রতার স্থান কখনো স্থায়ী হতে পারেনি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে ভয়ের ছায়া এবং অনিশ্চয়তা দানা বেঁধে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গভীর চিন্তার বিষয়।

এখানে আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে,বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু তার রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা ভূগোলের দিকে তাকালে হবে না; শুনতে হবে তার মানুষের গান, দেখতে হবে তার লোকজ উৎসব, অনুভব করতে হবে তার মাটির গন্ধ। এই দেশের নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে এসেছে ভাটিয়ালির সুর, গ্রামবাংলার উঠোনে জন্ম নিয়েছে জারি-সারি ও পালাগান, বাউলের একতারায় ধ্বনিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি যেমন এ দেশের আকাশে মিশে আছে, তেমনি কোনো গ্রামীণ মেলায় বাঁশির সুর, কোনো মঞ্চে নাটকের সংলাপ কিংবা কোনো শিল্পীর কণ্ঠে গানও এ দেশের মানুষের জীবন ও অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বহুত্বই বাংলাদেশের সৌন্দর্য, এই সহাবস্থানই আমাদের সভ্যতার শক্তি।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিচর্চার বিশ্বজোড়া সুনাম রয়েছে। এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ধর্মীয় সংকীর্ণতার দেশ। বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সহনশীলতার সহাবস্থান। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ হতে পারেন এবং সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা লোকসংস্কৃতির অনুরাগী হতে পারেন। ধর্মীয় চেতনা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানো তাই আমার কাছে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতারও পরিপন্থী।

তবে এখানে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সংস্কৃতির নামে কোনো অপসংস্কৃতি, অশালীনতা, উসকানি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না। আইন ভঙ্গ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সত্যিই আপত্তিকর বা বেআইনি কিছু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পরীক্ষা করবে, প্রয়োজন হলে শর্ত আরোপ করবে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে—এটি কোনো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

উল্লেখ্য ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশ্নের কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসনের এসব যুক্তি যদি বাস্তব ও আইনসম্মত হয়, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে—কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক চাপ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল নিয়ামক হয়ে না দাঁড়ায়।

আজ কনসার্ট। কাল নাটক। পরশু সিনেমা। তার পরদিন বাউলগান। এরপর হয়তো লোকসংগীত, কবিগান কিংবা নৌকাবাইচ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি কোনো একটি গোষ্ঠীর আপত্তিকে অনুষ্ঠান বন্ধের যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একসময় প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা আসলে কার হাতে? রাষ্ট্রের হাতে, নাকি রাস্তায় সংগঠিত চাপের হাতে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল কোনো বেসরকারি আয়োজকের সমস্যা নয়; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও যদি নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শহুরে কনসার্টের বাইরেও গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও চেয়ার ভাঙচুরের খবর এসেছে। নেত্রকোনার মদনেও বাউলগানের আয়োজন বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে।

কারণ বাউল শুধু গান নয়। বাউল বাংলার আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বাউলগান ২০০৮ সালে ইউনেসকোর মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ যে ঐতিহ্যকে বিশ্ব সংরক্ষণের যোগ্য মনে করছে, সেই ঐতিহ্য যদি নিজের দেশেই ভয় ও বাধার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য লজ্জার এবং আত্মসমালোচনার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘তৌহিদী জনতা’, ‘ইমাম-ওলামা পরিষদ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের দাবি ওঠার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে গত ১৫ মাসে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা এবং ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে আরও ৩৬টি আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করছি।

কারণ সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় মঞ্চ ভেঙে আসে না। অনেক সময় শুধু ভয় তৈরি করাই যথেষ্ট।

একজন আয়োজক যদি ভাবেন যে,অনুষ্ঠান করলে ঝামেলা হতে পারে। একজন শিল্পী যদি ভাবেন—দূরের জেলায় গিয়ে গান করা নিরাপদ তো? একজন হলমালিক যদি ভাবেন—অনুষ্ঠান বন্ধ হলে ক্ষতির দায় কে নেবে? আর প্রশাসনৎ যদি  ভাবে—অনুষ্ঠান করতে দিলে সংঘর্ষ হতে পারে। এভাবে কেউ কাউকে সরাসরি নিষেধ না করেও একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ভীত ও সংকুচিত করে ফেলা যায়।

একসময় দেখা যাবে, অনুষ্ঠান করার অনুমতি থাকলেও কেউ আয়োজন করতে চাইছেন না। মঞ্চ আছে, কিন্তু শিল্পী নেই। দর্শক আছে, কিন্তু অনুষ্ঠান নেই। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম সীমিত। তখন হয়তো কোনো পোস্টার ছিঁড়তে হবে না, কোনো মঞ্চ ভাঙতে হবে না—ভয়ই সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। সুতরাং এই ভয়ের সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সিনেমা ভালো না লাগলে সেটি না দেখার অধিকার আমার আছে। কিন্তু অন্য একজনের সেটি দেখার অধিকারও আছে। কোনো গান আমার পছন্দ না হলে আমি সেটি শুনব না; কিন্তু অন্যের গান শোনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমার নেই। অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে হবে। ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা উসকানিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতির নাম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা অন্যের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কারণ রাষ্ট্রের কাজ হলো অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা—কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়।

এখানে আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মীয় নিরাপত্তা-আতঙ্কের বয়ান বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা প্রশ্নের পাশাপাশি জঙ্গিবাদবিরোধী বয়ানও ছিল রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ যারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা ধরনের নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের হাতে নতুন করে কোনো অজুহাত তুলে দেওয়া আমাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বয়ান যখন প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে—এই দেশ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু উগ্র নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন, কিন্তু অসহিষ্ণু নয়; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বহুত্ববাদবিরোধী নয়।

আর সেই বাস্তবতা প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আইনের শাসন। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বিএনপি একটি উদার ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা বলে। অতএব সেই সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে যদি একের পর এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সেটি সরকারের জন্যও সুখকর কোনো বার্তা নয়। সরকারকে তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কেউ যদি শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানান, রাষ্ট্র তার কথা শুনবে। প্রয়োজন হলে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা হবে। অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা, শব্দের মাত্রা, সময়সূচি, জনদুর্ভোগ, শালীনতা কিংবা আইনগত শর্ত—সবকিছু নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কেউ যদি হামলা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি বা জবরদস্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চায়, সেখানে রাষ্ট্রকে আপসহীন হতে হবে।

এখানে আমি মনে করি,সংস্কৃতি বিরোধী শক্তিকে দমন করার অর্থ কোনো ধর্মীয় মতকে দমন করা নয়; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে দমন করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা যদি গান, নাটক, সিনেমা কিংবা লোকসংস্কৃতির আয়োজন নিয়েই ভয় পেতে শুরু করি, তাহলে সেটি আত্মবিশ্বাসের সংকট ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানে সৌদি আরবের পরিবর্তনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলামি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দেশ ভিশন ২০৩০-এর অধীনে বিনোদন ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে বিকশিত করছে। ২০১৮ সালে কয়েক দশকের বিরতির পর দেশটিতে সিনেমা হল পুনরায় চালু হয়েছে; কনসার্ট ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ। এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের সংস্কৃতিনীতি বাংলাদেশকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। আমি বলতে চাইছি যে—ধর্মীয় পরিচয় ও আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

আমরা চাই ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট থাকুক। চাই মসজিদ-মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলন আরও শক্তিশালী হোক। একই সঙ্গে চাই নাট্যমঞ্চ প্রাণবন্ত থাকুক, সিনেমা হল সচল থাকুক, বাউল তার একতারা হাতে গান গাইতে পারেন, তরুণেরা সুস্থ সংগীতচর্চা করতে পারেন, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা বিকশিত হোক। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

বরং সুস্থ সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল করে। চিন্তা করতে শেখায়। মাদক, অপরাধ ও অন্ধ উগ্রতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করে। ফলে সংস্কৃতির পথ বন্ধ করা কোনোভাবেই সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে না।

এখন সময় এসেছে সরকারকে একটি সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করার—আইনসম্মত কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে বন্ধ করা যাবে না।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও দায়িত্ব রয়েছে। আয়োজকদের আইন মেনে চলতে হবে। শিল্পীদেরও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতার স্বাধীনতা নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা তৈরি পোশাক শিল্প দিয়ে তৈরি হয় না। একটি দেশের মানুষের মনন, সহনশীলতা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাও তার পরিচয়ের অংশ। সুতরাং মঞ্চ বন্ধের প্রতিটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শিল্পী মঞ্চে ওঠার আগে ভয় পাবেন।  আমরা এমন বাংলাদেশও চাই না, যেখানে ধর্মের নাম করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পাবে। বরঞ্চ আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম থাকবে হৃদয়ে, সংস্কৃতি থাকবে জীবনে, আর আইন থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো  ঠাঁই নেই। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী দল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির অবাধ পথচলা রোধ করা হলে তরুণ সমাজ পথভ্রষ্ট হবে এবং দেশীয় ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আর কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চ যেন ভীতি ও হুমকির মুখে বন্ধ না হয়—সরকার ও প্রশাসনকে অবিলম্বে সেই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পতিত-পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সেই পুরনো উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বয়ানই নতুন প্রাণ লাভ করবে। যা শান্তি কামি কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের কাম্য হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ নসিব করুন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।