খুঁজুন
                               
, ,
           

সরকার ও সেনাবাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াসে পোশাক শিল্পে কর্মচাঞ্চল্যে স্বস্তির নি:শ্বাস

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৪, ১০:৫২ অপরাহ্ণ
সরকার ও সেনাবাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াসে পোশাক শিল্পে কর্মচাঞ্চল্যে স্বস্তির নি:শ্বাস

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":[],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:

শান্তিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুরোদমে অস্থিরতা শুরু হয় পোশাক শিল্পে। আজ এখানে, কাল সেখানে গণ্ডগোল পাঁকে। একেকদিন একেক কারখানার শ্রমিকরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বের হয়ে যান। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষে স্থবির হয়ে পড়ে উৎপাদন। আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে বন্ধ হয়ে যায় অনেক কারখানা। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে কলকাঠি নাড়তে থাকে বহিরাগতরা। ১৮ দফা দাবি তোলা হয় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানাবিধ গুজব। বিদেশী ক্রেতা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে সরকার, মালিক ও শ্রমিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ার পর ক্রমশ স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতির মজবুত ভিত্তির হাতিয়ার পোশাক খাতে। সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছা ও দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘রাউন্ড দ্য ক্লক’ তৎপরতার কারণেই এখন দেশের ৯৯ শতাংশ পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে ফিরেছে কারখানাসমূহের স্বাভাবিক চেহারা। আস্থা ফিরেছে বিদেশী ক্রেতাদের মাঝেও। কারখানাগুলোতে আসছে নতুন নতুন অর্ডার। সব মিলিয়ে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা।

জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ চরমে ওঠে। কোনো কারখানায় বকেয়া বেতনের দাবিতে, আবার কোনোটিতে হাজিরা বোনাস ও টিফিন বিল বৃদ্ধি করাসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। এমনকি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ ও শ্রমিক নিয়োগের দাবিতেও আন্দোলন করেন তাঁরা। অনেক কারখানার শ্রমিকেরা সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন। এসব মহাসড়কে চলাচলকারীরা পড়েন চরম দুর্ভোগে। সঙ্কটময় এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রধান উপদেষ্টা ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে কয়েক দফা সরকারের শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন।

কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মজুরি বৃদ্ধি ও বছর শেষে ১০ শতাংশ হারে ‘ইনক্রিমেন্ট’ প্রদানসহ শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার ও মালিকপক্ষ। এরপর স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরলেও পুনরায় গুজব ছড়িয়ে কারখানাগুলো থেকে শ্রমিকদের নামিয়ে আনা হয়। মূলত বাইরে থেকে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে অরাজকতা তৈরি করে। অত্যন্ত ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পুরো পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এতে করে ভেস্তে যায় শ্রমিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা। দুর্গাপূজার ছুটি শেষে গত ১৩ অক্টোবর থেকে শ্রমিকরা পুনরায় নিজেদের কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেন। এরপর থেকে আর কোনো শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি।

সূত্র মতে, দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পোশাক শিল্পকে রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। শিল্প কারখানার নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে তিনি ৮ আগস্ট থেকে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেন। সেনাপ্রধান নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও সাভারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মো. মঈন খানকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। সেই সময় নবম পদাতিক ডিভিশনের মাধ্যমে গঠন করা হয় ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সিকিউরিটি টাস্কফোর্স। সেনাবাহিনীর দু’টি ব্রিগেড এই টাস্কফোর্স পরিচালনা করে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মাঠে থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে পোশাক শিল্পে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে জোর তৎপরতা শুরু করে। এ সময় তাঁরা বহিরাগতদের আক্রমণ, শ্রমিকদের যৌক্তিক ও অযৌক্তিক দাবি ও ঝুট ব্যবসার আধিপত্যকে অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবে সনাক্ত করে। শিল্পাঞ্চলসমূহের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সেনাপ্রধান বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) ঢাকা সেনানিবাসে আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি সেই বৈঠকে দেশে বিরাজমান পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক ভূমিকা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সেনাপ্রধান শিল্প-কারখানা চালু রাখার ব্যাপারে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সকলকে আশ্বস্ত করেন।

এর ঠিক তিন সপ্তাহের মাথায় নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এক আলোচনা সভায় সেনাপ্রধানের নির্দেশে নিজেদের বহুমাত্রিক তৎপরতার কথা সবাইকে অবহিত করেন। নিজেদের সচেতনতা ও পূর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকার কথা জানিয়ে সেদিন তিনি বলেন, ‘ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সিকিউরিটি টাস্কফোর্স এর অধীনে দু’জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তার দু’টি ব্রিগেড নিয়ে আশুলিয়া, টঙ্গি, গাজীপুর, ভালুকা এসব জায়গায় সব কিছু মিলিয়ে আমরা এখানকার শান্তি শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছি। সঙ্গে আমাদের ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশ, সাধারণ পুলিশ আছে, ৮ প্লাটুন বিজিবি ও র‌্যাব মিলিয়ে আমরা যৌথ বাহিনীর একটি কাঠামো তৈরি করেছি। একেকটি এলাকাতে কতগুলো ইন্ডাষ্ট্রি নিয়ে আমরা একটি ক্লাস্টার তৈরি করেছি। সেই ক্লাস্টারের চারিদিকে ব্যুহ তৈরি করেছি। সেই ব্যুহতে আমাদের সৈনিক মোতায়েন রয়েছে আমাদের এপিসিসহ। আমরা সেখানকার ভেতর-বাইরের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছি। আমরা দিন-রাত পেট্রোলিং করছি, যাতে করে কেউ ইন্ডাষ্ট্রির আশেপাশে কোন রকম অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে।’

‘আমাদের ঢাকা, সাভার ও ময়মনসিংহে ক্যান্টনমেন্টে কুইক রিয়েকশন ফোর্স (কিউআরএফ) প্রস্তুত করে রেখেছি। এছাড়া এই মিলিটারি লাইন অব অপারেশন্স’র পাশাপাশি আমরা জনসংযোগ করছি। বিভিন্ন জায়গায় রাতে-দিনে যাচ্ছি, মাইকিং করছি। যারা এই সেক্টরের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত ওই এলাকার বাড়িওয়ালা ও দোকানদার তাদেরকে আমরা সেনসেটাইজ করছি। আমরা মিলিটারি লাইন অব অপারেশন্স ও অন্যান্য সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটি পরিবেশ নিয়ে আসতে পারছি। আমাদের সাফল্য হচ্ছে-কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া আমরা মেজর কোন বেণ্ডালিজম হতে দেইনি। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে আছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে এজন্য দু:খ প্রকাশ করছি। রাজনৈতিক ও নীতি নির্ধারক মহলের আলোচনার মাধ্যমে আপনারা সমস্যার সমাধান করবেন বলে আমরা আশাবাদী’-যোগ করেন মেজর জেনারেল মো. মঈন খান।

পোশাক কারখানায় স্বাভাবিক পরিবেশ, আসছে নতুন নতুন অর্ডার
বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কদর বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন ডেনিম পোশাক রপ্তানির শীর্ষ দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ২০৬টি সবুজ কারখানা নিয়ে সমগ্র বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিতে শক্তি জোগানো এই খাতটিই নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল মাত্র ক’দিন আগেও। সরকার ও সেনাবাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি পোশাক শিল্পে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ মিলছে। এখন প্রায় সব কারখানায় আসছে নতুন নতুন অর্ডার। চলতি অক্টোবরে গত মাসের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে অর্ডার। ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসছে। তারা বাংলাদেশ থেকেই পোশাক নিতে চান। তবে পরিবেশ আরও স্থিতিশীল ও স্থায়ীত্ব চান তারা। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে বসে নেই বিজিএমইএও। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও ক্রেতাদের সঙ্গে তাঁরা নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। বৈঠক করছেন বিভিন্ন দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও।

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে- সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। এখন কোনো অস্থিরতা নেই। তবে সাভার ও আশুলিয়ায় ৪০৭টি কারখানার মধ্যে ৩টি ছাড়া সকল কারখাানা খুলেছে। বন্ধ ৩ কারখানার মধ্যে ২টি ১৩/১ ধারায় বন্ধ রয়েছে। গাজীপুরে ৮৭১ কারখানার মধ্যে ২টি ছাড়া বাকীগুলো চালু রয়েছে।

অভিন্নভাবে সবাই আশা প্রকাশ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শক্ত হাতে দেশের হাল ধরেছেন। দেশের অস্থির এক সময়ে আস্থা ফিরিয়ে সবার আস্থাভাজন হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। তাঁর ‘ব্র্যান্ড নেম’ কাজে লাগিয়ে এই তৈরি পোশাক খাতটিও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা ও পরিবেশের নমুনাও দেখা যাচ্ছে। হাতছাড়া হতে যাওয়া অনেক অর্ডার ফেরত আসছে। ক্রেতাদের মাঝে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে। ড.ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর গোটা বিশ্ব বাংলাদেশের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে বিশ্বের প্রভাবশালী নেতারা তার কাছে বাংলাদেশের জন্য সহায়তার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এসবের ফলে নতুন করে ভরসা পাচ্ছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। বাজার হাতছাড়া হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তা অনেকটা কেটে গেছে। এই স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সব পক্ষই উদ্যোগী হবে বলে আশা রপ্তানিকারকদের।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক ভালো। কারখানাগুলোয় পুরোদমে কাজ চলছে। ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা ফিরছে। ইতোমধ্যে ক্রেতারা যোযাযোগ শুরু করেছে। আশা করা যায়, আগামী মৌসুমের অর্ডার অন্য দেশে যাবে না। বর্তমান সরকারের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা রয়েছে।’ বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই পোশাক খাতের হাত ধরেই অর্থনীতি একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিজিএমইএ নেতারা।

কালের আলো/এমএএএমকে

স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করার পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কটূক্তি করা হলেও স্পিকার নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেননি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেছেন, আজকে আমরা দেখলাম, স্পিকার একটু পক্ষপাতিত্ব করলেন এবং বিরোধীদলের সঙ্গে বৈষম্য করলেন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টায় জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠক থেকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, স্পিকার বিরোধীদলকে ‘অসহিষ্ণু’ হিসেবে তুলে ধরারও ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অথচ গত ছয় মাসে বিরোধীদল সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছে এবং দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির আমলে বিরোধীদল যে আচরণ করেছিল, তার কিছুই কিন্তু এই বিরোধীদল করেনি। বরং গত ছয় মাস আমরা সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছি এবং সহযোগিতার কথা বলে এসেছি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, জনগণের দুর্ভোগ যখন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন জনগণের পক্ষে কথা বলা বিরোধীদলের দায়িত্ব। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণও সেটিই।

তিনি আরও বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ গত ১৮০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের ছয় মাসের পরিস্থিতির তুলনা করে জানতে চাওয়া হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকার কতটা সক্ষম হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন কিনা।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে সাধারণ মানুষ ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ, হামলা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটছে। সংসদ সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব তথ্য শুধু বিরোধীদলের বক্তব্য নয়, পুলিশ সদর দফতরের তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপাত্তেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কটূক্তি করেছেন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করা হলেও স্পিকারের ভূমিকা নিরপেক্ষ ছিল না।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলসহ তিনটি বিল উত্থাপনের জন্য আনা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা এসব বিলের বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিচ্ছিন্নভাবে না এনে গণভোটের গণরায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে আলোচনা করা উচিত।

তিনি অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও আইনগুলো নিয়ে বিশেষ কমিটিতে আলোচনার কথা থাকলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখন সরকার নিজেদের মতো করে এসব বিল বিচ্ছিন্নভাবে সংসদে এনে পাস করানোর চেষ্টা করছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা সংসদে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দেখতে পাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। যেখানে স্পিকার ও সরকারি দল এককভাবে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।

এই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বলে জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে বলেন, ওই পরিষদের মাধ্যমেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত। উদার ও মধ্যপন্থি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় গোড়ামি, পরমতঅসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রতার স্থান কখনো স্থায়ী হতে পারেনি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে ভয়ের ছায়া এবং অনিশ্চয়তা দানা বেঁধে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গভীর চিন্তার বিষয়।

এখানে আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে,বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু তার রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা ভূগোলের দিকে তাকালে হবে না; শুনতে হবে তার মানুষের গান, দেখতে হবে তার লোকজ উৎসব, অনুভব করতে হবে তার মাটির গন্ধ। এই দেশের নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে এসেছে ভাটিয়ালির সুর, গ্রামবাংলার উঠোনে জন্ম নিয়েছে জারি-সারি ও পালাগান, বাউলের একতারায় ধ্বনিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি যেমন এ দেশের আকাশে মিশে আছে, তেমনি কোনো গ্রামীণ মেলায় বাঁশির সুর, কোনো মঞ্চে নাটকের সংলাপ কিংবা কোনো শিল্পীর কণ্ঠে গানও এ দেশের মানুষের জীবন ও অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বহুত্বই বাংলাদেশের সৌন্দর্য, এই সহাবস্থানই আমাদের সভ্যতার শক্তি।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিচর্চার বিশ্বজোড়া সুনাম রয়েছে। এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ধর্মীয় সংকীর্ণতার দেশ। বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সহনশীলতার সহাবস্থান। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ হতে পারেন এবং সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা লোকসংস্কৃতির অনুরাগী হতে পারেন। ধর্মীয় চেতনা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানো তাই আমার কাছে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতারও পরিপন্থী।

তবে এখানে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সংস্কৃতির নামে কোনো অপসংস্কৃতি, অশালীনতা, উসকানি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না। আইন ভঙ্গ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সত্যিই আপত্তিকর বা বেআইনি কিছু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পরীক্ষা করবে, প্রয়োজন হলে শর্ত আরোপ করবে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে—এটি কোনো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

উল্লেখ্য ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশ্নের কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসনের এসব যুক্তি যদি বাস্তব ও আইনসম্মত হয়, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে—কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক চাপ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল নিয়ামক হয়ে না দাঁড়ায়।

আজ কনসার্ট। কাল নাটক। পরশু সিনেমা। তার পরদিন বাউলগান। এরপর হয়তো লোকসংগীত, কবিগান কিংবা নৌকাবাইচ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি কোনো একটি গোষ্ঠীর আপত্তিকে অনুষ্ঠান বন্ধের যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একসময় প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা আসলে কার হাতে? রাষ্ট্রের হাতে, নাকি রাস্তায় সংগঠিত চাপের হাতে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল কোনো বেসরকারি আয়োজকের সমস্যা নয়; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও যদি নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শহুরে কনসার্টের বাইরেও গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও চেয়ার ভাঙচুরের খবর এসেছে। নেত্রকোনার মদনেও বাউলগানের আয়োজন বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে।

কারণ বাউল শুধু গান নয়। বাউল বাংলার আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বাউলগান ২০০৮ সালে ইউনেসকোর মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ যে ঐতিহ্যকে বিশ্ব সংরক্ষণের যোগ্য মনে করছে, সেই ঐতিহ্য যদি নিজের দেশেই ভয় ও বাধার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য লজ্জার এবং আত্মসমালোচনার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘তৌহিদী জনতা’, ‘ইমাম-ওলামা পরিষদ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের দাবি ওঠার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে গত ১৫ মাসে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা এবং ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে আরও ৩৬টি আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করছি।

কারণ সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় মঞ্চ ভেঙে আসে না। অনেক সময় শুধু ভয় তৈরি করাই যথেষ্ট।

একজন আয়োজক যদি ভাবেন যে,অনুষ্ঠান করলে ঝামেলা হতে পারে। একজন শিল্পী যদি ভাবেন—দূরের জেলায় গিয়ে গান করা নিরাপদ তো? একজন হলমালিক যদি ভাবেন—অনুষ্ঠান বন্ধ হলে ক্ষতির দায় কে নেবে? আর প্রশাসনৎ যদি  ভাবে—অনুষ্ঠান করতে দিলে সংঘর্ষ হতে পারে। এভাবে কেউ কাউকে সরাসরি নিষেধ না করেও একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ভীত ও সংকুচিত করে ফেলা যায়।

একসময় দেখা যাবে, অনুষ্ঠান করার অনুমতি থাকলেও কেউ আয়োজন করতে চাইছেন না। মঞ্চ আছে, কিন্তু শিল্পী নেই। দর্শক আছে, কিন্তু অনুষ্ঠান নেই। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম সীমিত। তখন হয়তো কোনো পোস্টার ছিঁড়তে হবে না, কোনো মঞ্চ ভাঙতে হবে না—ভয়ই সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। সুতরাং এই ভয়ের সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সিনেমা ভালো না লাগলে সেটি না দেখার অধিকার আমার আছে। কিন্তু অন্য একজনের সেটি দেখার অধিকারও আছে। কোনো গান আমার পছন্দ না হলে আমি সেটি শুনব না; কিন্তু অন্যের গান শোনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমার নেই। অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে হবে। ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা উসকানিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতির নাম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা অন্যের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কারণ রাষ্ট্রের কাজ হলো অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা—কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়।

এখানে আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মীয় নিরাপত্তা-আতঙ্কের বয়ান বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা প্রশ্নের পাশাপাশি জঙ্গিবাদবিরোধী বয়ানও ছিল রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ যারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা ধরনের নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের হাতে নতুন করে কোনো অজুহাত তুলে দেওয়া আমাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বয়ান যখন প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে—এই দেশ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু উগ্র নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন, কিন্তু অসহিষ্ণু নয়; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বহুত্ববাদবিরোধী নয়।

আর সেই বাস্তবতা প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আইনের শাসন। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বিএনপি একটি উদার ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা বলে। অতএব সেই সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে যদি একের পর এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সেটি সরকারের জন্যও সুখকর কোনো বার্তা নয়। সরকারকে তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কেউ যদি শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানান, রাষ্ট্র তার কথা শুনবে। প্রয়োজন হলে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা হবে। অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা, শব্দের মাত্রা, সময়সূচি, জনদুর্ভোগ, শালীনতা কিংবা আইনগত শর্ত—সবকিছু নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কেউ যদি হামলা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি বা জবরদস্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চায়, সেখানে রাষ্ট্রকে আপসহীন হতে হবে।

এখানে আমি মনে করি,সংস্কৃতি বিরোধী শক্তিকে দমন করার অর্থ কোনো ধর্মীয় মতকে দমন করা নয়; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে দমন করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা যদি গান, নাটক, সিনেমা কিংবা লোকসংস্কৃতির আয়োজন নিয়েই ভয় পেতে শুরু করি, তাহলে সেটি আত্মবিশ্বাসের সংকট ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানে সৌদি আরবের পরিবর্তনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলামি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দেশ ভিশন ২০৩০-এর অধীনে বিনোদন ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে বিকশিত করছে। ২০১৮ সালে কয়েক দশকের বিরতির পর দেশটিতে সিনেমা হল পুনরায় চালু হয়েছে; কনসার্ট ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ। এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের সংস্কৃতিনীতি বাংলাদেশকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। আমি বলতে চাইছি যে—ধর্মীয় পরিচয় ও আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

আমরা চাই ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট থাকুক। চাই মসজিদ-মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলন আরও শক্তিশালী হোক। একই সঙ্গে চাই নাট্যমঞ্চ প্রাণবন্ত থাকুক, সিনেমা হল সচল থাকুক, বাউল তার একতারা হাতে গান গাইতে পারেন, তরুণেরা সুস্থ সংগীতচর্চা করতে পারেন, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা বিকশিত হোক। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

বরং সুস্থ সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল করে। চিন্তা করতে শেখায়। মাদক, অপরাধ ও অন্ধ উগ্রতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করে। ফলে সংস্কৃতির পথ বন্ধ করা কোনোভাবেই সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে না।

এখন সময় এসেছে সরকারকে একটি সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করার—আইনসম্মত কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে বন্ধ করা যাবে না।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও দায়িত্ব রয়েছে। আয়োজকদের আইন মেনে চলতে হবে। শিল্পীদেরও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতার স্বাধীনতা নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা তৈরি পোশাক শিল্প দিয়ে তৈরি হয় না। একটি দেশের মানুষের মনন, সহনশীলতা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাও তার পরিচয়ের অংশ। সুতরাং মঞ্চ বন্ধের প্রতিটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শিল্পী মঞ্চে ওঠার আগে ভয় পাবেন।  আমরা এমন বাংলাদেশও চাই না, যেখানে ধর্মের নাম করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পাবে। বরঞ্চ আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম থাকবে হৃদয়ে, সংস্কৃতি থাকবে জীবনে, আর আইন থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো  ঠাঁই নেই। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী দল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির অবাধ পথচলা রোধ করা হলে তরুণ সমাজ পথভ্রষ্ট হবে এবং দেশীয় ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আর কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চ যেন ভীতি ও হুমকির মুখে বন্ধ না হয়—সরকার ও প্রশাসনকে অবিলম্বে সেই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পতিত-পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সেই পুরনো উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বয়ানই নতুন প্রাণ লাভ করবে। যা শান্তি কামি কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের কাম্য হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ নসিব করুন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩১ অপরাহ্ণ
তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই ওয়াকআউট করেছে প্রধান বিরোধীদলসহ জোটের সংসদ সদস্যরা। সংবিধান সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি সদস্যদের দিবসে সরকারি বিল উত্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে তারা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন চলাকালে এই ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটে।

ওয়াকআউটের আগে দেওয়া বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং কারখানা বন্ধের মতো জনদুর্ভোগ নিয়ে আলোচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুরোধ আমলে নেওয়া হয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ৭০ শতাংশের রায় পাওয়া সংবিধান সংস্কারের বিষয়টিও উপেক্ষিত হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের জন্য নির্ধারিত দিবস হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বেসরকারি সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং সংসদকে একপেশে করে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সংস্কার ও নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল বা ল্যাপস হওয়ার বিষয়েও সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা নীতিগতভাবে এ ধরনের খণ্ডিত বিলে অংশগ্রহণ করতে চাই না। আমরা আশঙ্কা করছি, এর মাধ্যমে সংস্কারের মূল দাবিকে চাপা দেওয়া হবে।’

সংস্কারের মূল দাবি বাস্তবায়নের পক্ষে বিরোধীদলের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না। তাই এই পর্বে আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।’

তবে পরবর্তীতে জনস্বার্থে বিরোধীদলের দেওয়া চারটি নোটিশ নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলে তারা আবার সংসদে যোগ দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ