খুঁজুন
                               
, ,
           

জেনারেল ওয়াকারের বার্তা পরিস্কার

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ মে, ২০২৫, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
জেনারেল ওয়াকারের বার্তা পরিস্কার

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর; কালের আলো:

চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ মে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর দু’টি বক্তব্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঠাঁই করে নিয়েছে। রাওয়ার প্রথম বক্তব্যটিতে তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। একইভাবে বুধবার (২১ মে) ঢাকা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর অফিসার্স অ্যাড্রেস অনুষ্ঠানে সমসাময়িক নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে সোজা সাপ্টা কথা বলেছেন তিনি। দু’টি বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা মাজেজা অভিন্ন হলেও দেশের চলমান অরাজকতা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সময়টিতে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বক্তব্যে কী বার্তা দিলেন, এ নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। কম কথার মানুষ হিসেবে পরিচিত সেনাপ্রধান দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দূরে সরিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পুনরায় খোলাসা করেছেন।

দ্রুত নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর এই ভাষা প্রয়োগ অত্যন্ত শক্ত এবং কঠোর। চলমান সংস্কার, মিয়ানমারে মানবিক করিডর, চট্টগ্রাম বন্দর, মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি যে সন্তুষ্ট নন বরং বিরক্ত সেটি তাঁর অভিব্যক্তিতেই সহজেই অনুমান করা যায়। বলতে দ্বিধা করেননি তিনি নয় মাস ধরে অভিভাবকহীন হয়ে রয়েছেন। বলেছেন, ‘এক চাতক পাখির মতো একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটি নির্বাচিত সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং যার ফলে সার্বিকভাবে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে।’

আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই মানবিক করিডরের নামে প্রক্সি ওয়ারের শঙ্কা ও বিদেশিদের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারার পায়তাঁরার ঘটনায় এমনিতেই উত্তপ্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ হচ্ছে একদিন-প্রতিদিন। সময়, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও ঘটনা প্রবাহ বিবেচনায় সেনাপ্রধানের সময়োচিত কথাবার্তা রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে চায়ের কাপেও ঝড় তুলেছে। সচেতন মহল তাঁর এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখছেন। বিশেষ করে সেনাপ্রধান যখন উচ্চারণ করেছেন- ‘প্রথম দিন থেকেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে তিনি বারবার সরকারকে অনুরোধ করেছেন। তবে সরকার অনুরূপ সংস্কারের বিষয়ে সত্যিকার অর্থে সিরিয়াস নয়।’ সংস্কারসহ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা কীভাবে নিচ্ছে সে বিষয়ে দেশবাসীর পাশাপাশি তিনি এবং সেনাবাহিনী অবগত নন বলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এ থেকেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় অন্তর্বর্তী সরকার এসব ক্ষেত্রে গণঅভ্যুত্থান সফলের অব্যর্থ হাতিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে এক প্রকার অন্ধকারে রেখেছে। কোন রকম মতামত গ্রহণেরও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন সম্পর্কে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘জাতিসংঘ কর্তৃক জুলাই-আগস্ট বিষয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে তাতে সেনাবাহিনীর কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানতে পারেন, জাতিসংঘ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও বর্তমান সরকার জাতিসংঘকে সে সুযোগ দেয়নি।’ এমন পরিস্কার বক্তব্যের পর আকার-ইঙ্গিতের আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাঁর প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও অভিব্যক্তি লক্ষ্য করলে খোলাসা হয় তিনি এসব ঘটনায় আশাহত হয়েছেন। তাঁর এই স্পষ্ট বার্তাটি আর ব্যাখ্যা করার অবকাশ নেই। যে যার মতো বুঝে-শুনে মিলিয়ে নিতে পারেন।

সেনাপ্রধান অফিসার্স অ্যাড্রেস অনুষ্ঠানে বক্তব্যের এক জায়গায় সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘দেয়ার উইল বি নো করিডর’। তিনি বলেছেন, ‘মানবিক করিডরের মতো স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বর্তমান সরকারের নেই। শুধু একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারই যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক এরূপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ চারতারকা জেনারেল আরও বলেছেন, ‘করিডর বিষয়ে সরকার কী ভাবছে অথবা জাতিকে একটি প্রক্সি ওয়ারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, এ বিষয়ে সরকার স্পষ্টভাবে কিছুই জানাচ্ছে না।’ একইভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়া নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়েও তিনি মুখ খুলেছেন। এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এই সরকারের নেই। এখানে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’ বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশ ও জনগণের কোনোরকম ক্ষতি হোক এমন কোনো কাজ সেনাবাহিনী করবে না, কাউকে করতে দেবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির নিজেদের মধ্যে বিরোধ-বিভক্তি চরমে ওঠে। পরমতসহিষ্ণুতা তথা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাই যে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছে। প্রতিশোধপরায়ণতা ভীষণরকম বেড়েছে। বিগত বছরগুলোয় যারা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়েছেন, তারা এখন প্রতিশোধ নিচ্ছেন। অতীতে একটি পক্ষ যেমন প্রতিপক্ষকে চিরতরে নির্মূল করতে চেয়েছে, ৫ আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পরে সেই শক্তিকেই নির্মূলের চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ ক্ষমতায় গেলে সবাই যে তার প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে এককভাবে টিকে থাকতে চায়, এই প্রবণতাটি বেড়েছে-যা দেশকে স্থিতিশীল করার বিপরীতে আরও বেশি সংঘাতপূর্ণ করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, ‘আন্দোলনের নাম করে দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে। কোনভাবেই কোন পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বেড়েই চলেছে অপরাধ প্রবণতা। বাড়বাড়ন্ত হয়ে ওঠেছে মব সন্ত্রাস। আইনবহির্ভূতভাবে মব সৃষ্টিকারীদের থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। ন্যূনতম আইনি প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হচ্ছে না। হত্যা মামলার নামে তামাশা চলছে। একের পর এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার ষড়যন্ত্র চলছে। সামগ্রিক এসব পরিস্থিতিতে মোটেও সন্তুষ্ট নন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

আবার, শুধু ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির বিষোদগার নয়, বরং সেনাবাহিনীকে নিয়েও অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মে ইচ্ছেমতো বিষোদগার করছেন-যা স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সেনাপ্রধান এই বিষয়টিও উত্থাপন করেছেন অফিসার্স অ্যাড্রেস অনুষ্ঠানে। তিনি অভিযোগের সুরেই বলেছেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সেনাবাহিনীর অক্লান্ত ও নিঃস্বার্থ ভূমিকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মহল থেকে সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে টার্গেট করা হচ্ছে, যা হতাশাজনক। দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে যাচ্ছে যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারে।’ তিনি দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘সার্বিকভাবে দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসনসহ সব সংস্থা ভেঙে পড়েছে এবং পুনর্গঠিত হতে পারছে না। শুধু সশস্ত্র বাহিনী এখন পর্যন্ত টিকে আছে এবং দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।’

একটি আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। তাই নতুন-আধুনিক ও স্বপ্নময় দিগন্তকে টেকসই করতে অপিরহার্য একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপক্ষে জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হবে, এটি এখন বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও। তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। সেনাপ্রধান স্পষ্টভাবে বলেন, ‘যথাশীঘ্র সম্ভব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’ আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে সততার সঙ্গে নিরপেক্ষ থেকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবার জন্যও তিনি নির্দেশনা প্রদান করেন।

দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকায় দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান। তিনি বলেছেন, ‘এত দীর্ঘ সময় ধরে সেনাসদস্যরা শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন রয়েছেন; যা সার্বিকভাবে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই তিনি একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যথাশীঘ্র সম্ভব সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবেন বলে উল্লেখ করেন। এটা না করতে পারলে বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও প্রতিবেশী অঞ্চলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’ তিনি সবাইকে অর্পিত দায়িত্ব সর্বোচ্চ কর্তব্যপরায়ণতা ও আনুগত্যের সঙ্গে পালন এবং মজলুমদের অশ্রুজল যাতে না ঝরে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করার জন্য বাহিনীটির সর্বস্তরের সদস্যদের নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং অর্পিত দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ থাকার নির্দেশনা প্রদান করেন। নিজ অবস্থান ও আদর্শে অবিচল থাকলে কোনো মহলই সেনাবাহিনী ও দেশের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

সেনাপ্রধানের এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা একটা বড় কারণ বলে মনে করছেন অনেকেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরের ৩ আগস্ট সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অফিসার্স অ্যাড্রেস অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছিলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালাবে না।’ তাঁর এমন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয়েছিল পতিত সরকারের ভাগ্য। ফলে এবারের অফিসার্স অ্যাড্রেস অনুষ্ঠানটিও স্বভাবতই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের গত ৯ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। প্রকট হয়ে ওঠেছে আস্থার অভাব। রাজনৈতিক দলগুলোও মনে করছে, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। রাজপথে নানান দাবিদাওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন, অন্যদিকে বিভিন্ন পেশাজীবীর অবস্থান, অবরোধের কারণে রাজধানী এখন অচল। জনদুর্ভোগ-ভোগান্তি নিত্যদিন। কোথাও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। সন্ত্রাস ও সহিংসতাও থামানো যাচ্ছে না। পরিকল্পিত তাণ্ডবে ‘বরবাদ’ হচ্ছে দেশ। এমন প্রেক্ষাপটে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানই এখন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সেনাপ্রধান তাঁর বক্তব্যে এসব বিষয়ই বুঝাতে চেয়েছেন। এখন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের টনক থাকলে নড়া উচিত।’

সেনাপ্রধানের সময়োপযোগী এসব বার্তার একদিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (২২ মে) রাতে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রাণরক্ষায় রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ মোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া ও আশ্রয় দেওয়া মানুষদের মধ্যে ৫৭৮ জনের নাম প্রকাশ করেছে সেনা সদর দপ্তর। এদিন রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এই তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘জুলাই আগস্টের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর কতিপয় কুচক্রী মহলের তৎপরতায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়। ফলশ্রুতিতে, সরকারি দপ্তর, থানাসমূহে হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মব জাস্টিস, চুরি, ডাকাতিসহ বিবিধ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। এ ধরনের সংবেদনশীল ও নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিকদের মনে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম নেয়। এ অবস্থায়, ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব সেনানিবাসে প্রাণ রক্ষার্থে কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নাগরিকগণ আশ্রয় প্রার্থনা করেন। উদ্ভূত আকস্মিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সেনানিবাসে আশ্রয়প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই বাছাই করার চাইতে তাদের জীবন রক্ষা করা প্রাধান্য পেয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে, ২৪ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ৫ জন বিচারক, ১৯ জন অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা, ৫১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাসহ বিবিধ ১২ জন ও ৫১ জন পরিবার পরিজন (স্ত্রী ও শিশু) সহ সর্বমোট ৬২৬ জনকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় প্রদান করা হয়েছিল। সেসময়ে শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে আশ্রয় প্রার্থীদের জীবন রক্ষা করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি উন্নয়ন সাপেক্ষে, আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই ১/২ দিনের মধ্যেই সেনানিবাস ত্যাগ করেন এবং এর মধ্যে ৫ জনকে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ/মামলার ভিত্তিতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট হস্তান্তর করা হয়।’ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ‘বিভিন্ন সময়ে অনেকেই এই তালিকা প্রকাশের বিষয়ে নানা কথা বলছিলেন। সঠিক সময়েই এই তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে সেনা সদর দপ্তর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্বশীলতারও স্বাক্ষর রেখেছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ থেকে ১৪ দলের দীর্ঘ লড়াই শেষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তুলেছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা দল। রোমাঞ্চকর ফাইনালে ত্রিশাল উপজেলা দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দর্শকদের করতালি ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
ঈশ্বরগঞ্জের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল। তাঁর জোড়া গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে ঈশ্বরগঞ্জ। ত্রিশাল একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে গোল্ডকাপ নিজেদের করে নেয় ঈশ্বরগঞ্জ।
ফাইনালের আগে ও ম্যাচ চলাকালে ঈশ্বরগঞ্জ দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তাঁর উপস্থিতি ও অনুপ্রেরণা খেলোয়াড়দের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জের রাব্বুল। অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ত্রিশালের ১০ নম্বর জার্সিধারী ফাহাদ। ফেয়ার প্লে ট্রফি পেয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলা দল।
৭০ মিনিটের ফাইনাল দেখতে বিকেল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে ভিড় করেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ম্যাচ শুরুর পর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, উল্লাস ও করতালিতে পুরো স্টেডিয়ামে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী ঈশ্বরগঞ্জ ও রানার্সআপ ত্রিশাল দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দুই দলের মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান এবং ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।

এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা, খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় গত ২৫ আগস্ট শুরু হয় এবারের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলাসহ জেলার ১৪টি দল এতে অংশ নেয়। দীর্ঘ প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ত্রিশালকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে ঈশ্বরগঞ্জ। রাব্বুলের জোড়া গোল ও দলের লড়াকু পারফরম্যান্সে গোল্ডকাপ এখন ঈশ্বরগঞ্জের ঘরে। শিরোপা জয়ের পথে খেলোয়াড়দের পাশে থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগানো এমপি মাজেদ বাবুর ভূমিকাও প্রশংসা পেয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নির্ভয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনরায় উচ্চারণ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকরা যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।’ একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের অগ্রাধিকারকে আরও স্পষ্ট করেছে।

শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা পাবলিক হলে ‘রফিক হিলালী ইংলিশ এক্সিলেন্স প্রোগ্রাম-২০২৬’-এর ওরিয়েন্টেশন ক্লাস এবং এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

  • সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
  • সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ—গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই। জনগণের কথা বলা, অনিয়ম তুলে ধরা, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে সরকার কাজ করছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এমন পরিস্কার অবস্থানকে দেশের সাংবাদিকতার বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যম অঙ্গনেও একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ
সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিক সমাজের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশা নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কল্যাণমূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে অসচ্ছল ও সংকটে থাকা সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের জন্যও তা বাস্তব সহায়তা তৈরি করতে পারে।

হলুদ সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ
প্রতিমন্ত্রী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের দিকটি সামনে আনে। তিনি বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার কাজ চলছে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সংবাদ প্রকাশে তথ্যের যথার্থতা, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার সমার্থক নয়। বরং স্বাধীনতা যত বেশি থাকবে, সাংবাদিকদের পেশাগত মান ও নৈতিকতার চর্চাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এতে করে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

হাওর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাবনা
এ সময় হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও আলাদা একাডেমি ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি একটি জাতীয় বিষয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও পড়ালেখার সুবিধার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর এই বক্তব্য প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের বাস্তবতাভিত্তিক চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘জাতীয় বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনার বার্তা মিলেছে।

শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফল অর্জন করলেই চলবে না, শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নৈতিকতার চর্চা করলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সামনে এনেছে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করছেন অনেকেই।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, তৃণমূলের যুবসমাজকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে মাঠের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে এবং অনলাইনে ও টিভিতে চাইনিজ ও অ্যারাবিক ভাষা শিক্ষার বিশেষ কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা, কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী এবং জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম।

কালের আলো/এম/এএইচ