ব্যাংকে টাকা পাহাড়, বিনিয়োগে খরা
ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা নেওয়ার মতো বিনিয়োগকারী নেই। আমানত বাড়ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থও ঢুকছে; অথচ শিল্প, ব্যবসা ও নতুন প্রকল্পে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। ফলে একদিকে ব্যাংকের ভল্ট ও সরকারি সিকিউরিটিজে জমছে বিপুল অর্থ, অন্যদিকে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের গতি ক্রমেই মন্থর হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় উঠেছে। মাত্র এক মাসে বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থনীতির জন্য এই বৈপরীত্যই এখন বড় প্রশ্ন—ব্যাংকে এত টাকা, কিন্তু বিনিয়োগে এত খরা কেন?
এক বছরে বাড়তি তারল্য সোয়া লাখ কোটি
ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত অর্থ বৃদ্ধির প্রবণতা গত এক বছর ধরেই স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জুন শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মে শেষে ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে সেটিই লাফ দিয়ে পৌঁছেছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। তবে উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই ব্যাংকের ভল্টে একই পরিমাণ নগদ টাকা পড়ে থাকা নয়। ব্যাংকগুলোকে আমানতের নির্দিষ্ট অংশ সিআরআর ও এসএলআর হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এসব বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ বাদ দেওয়ার পর ব্যাংকের হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থই মূলত উদ্বৃত্ত তারল্যের অংশ। এর বড় অংশ আবার সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকে।
টাকার জোগান আছে, নেই ঋণের চাহিদা
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সমস্যাটি শুধু ব্যাংকের অর্থের জোগানে নয়, বরং ঋণের চাহিদায়। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে বাড়তি অর্থ যত দ্রুত বাড়ছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ততটাই দুর্বল হচ্ছে। এর অর্থ, উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখন নতুন ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বড় প্রকল্পে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কারণটিও একাধিক। উচ্চ সুদের হার, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ব্যবসা পরিচালনার বাড়তি ব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ—সব মিলিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়েছে।
কারখানা আছে, উৎপাদনের নিশ্চয়তা নেই
শিল্পোদ্যোক্তার কাছে ঋণ তখনই আকর্ষণীয়, যখন সেই ঋণের অর্থ দিয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ করার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত কিংবা উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি হলে নতুন ঋণ নেওয়া উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে উদ্যোক্তারা এখন অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্পে যাওয়ার বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। নতুন কারখানা বা সম্প্রসারণের পরিবর্তে সীমিত পরিসরে চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন।।এখানেই ব্যাংকের তারল্য ও বাস্তব অর্থনীতির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় বিচ্ছিন্নতা। ব্যাংক টাকা দিতে প্রস্তুত, কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশ উদ্যোক্তাকে টাকা নিতে উৎসাহিত করছে না।
খেলাপি ঋণের ভয়েও ব্যাংক সতর্ক
অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর নিজেদের অবস্থানও বদলেছে। অতীতে যথাযথ যাচাই ছাড়া বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ার পর এখন নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অনেক বেশি সতর্ক। ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ, ব্যবসার সক্ষমতা, জামানত, আয়-ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য—সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের হাতে অর্থ থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ কমেছে। নিরাপদ ও তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত সরকারি বিল-বন্ডে অর্থ রাখাই অনেক ব্যাংকের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এতে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে অর্থ নিরাপদ থাকছে, কিন্তু অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে তার গতি কমে যাচ্ছে।
সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ, শিল্পে নয়
ব্যাংকের বাড়তি অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে চলে যাচ্ছে। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ দিলে যেখানে খেলাপির ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে সরকারি সিকিউরিটিজ তুলনামূলক নিরাপদ। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে প্রশ্ন উঠবে—ব্যাংকের অর্থ কি শিল্প ও ব্যবসার চাকা ঘোরাচ্ছে, নাকি মূলত সরকারি অর্থায়নের মাধ্যম হয়ে থাকছে? ব্যাংকের অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না গেলে শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ডলার কেনায়ও বাড়ছে ব্যাংকের টাকা
তারল্য বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কেনা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। ডলার কেনার বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা প্রবেশ করেছে। ফলে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়লেও তার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা একই হারে বাড়েনি। অর্থাৎ একদিকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনায় নতুন টাকা ঢুকছে। কিন্তু সেই অর্থ শোষণ করার মতো বিনিয়োগ চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। ফলাফল—ব্যাংকে বাড়ছে উদ্বৃত্ত তারল্য।
স্বল্পমেয়াদি ধারেও বড় পতন
ব্যাংকের হাতে অর্থ বাড়ার আরেকটি প্রমাণ মিলছে আন্তঃব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ধার নেওয়ার পরিমাণে। জুলাইয়ে কলমানি, আন্তঃব্যাংক রেপো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো মিলিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ধার ছিল প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। জুনে যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এক মাসে কমেছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যকার স্বল্পমেয়াদি অর্থের চাহিদাও কমছে। এটি স্পষ্টতই দেখাচ্ছে, ব্যাংক খাতে এখন অর্থের ঘাটতির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থের সমস্যাই বেশি প্রকট।
সুদ কমিয়েও বিনিয়োগ ফিরছে না
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার কম সুদের প্রণোদনা প্যাকেজ, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও একক গ্রাহকের ঋণসীমা বাড়ানো এবং নীতি সুদহার কমানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩০ জুলাই রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির হারও কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু শুধু সুদ কমালেই বিনিয়োগের গতি ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ উদ্যোক্তার সিদ্ধান্ত শুধু সুদের ওপর নির্ভর করে না। তিনি দেখতে চান বাজারের চাহিদা, উৎপাদনের নিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহ, রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিবেশ। এই জায়গাগুলোতে অনিশ্চয়তা থাকলে কয়েক শতাংশ সুদ কমিয়েও বিনিয়োগে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন।
‘তারল্য সংকট’ আর ‘তারল্য উদ্বৃত্ত’—দুই বাস্তবতা
তবে ব্যাংক খাতের এই ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্যকে পুরো ব্যাংক খাতের সমান সক্ষমতা হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতে, এই উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে পরিসংখ্যান দেখে পুরো ব্যাংক খাতকে তারল্যে স্বস্তিতে আছে বলা যাবে না। কিছু ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে এবং বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও তাদের সীমিত। এটি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের আরেকটি কাঠামোগত সমস্যা সামনে আনে—একদিকে অতিরিক্ত তারল্য, অন্যদিকে কিছু ব্যাংকে তারল্য চাপ। অর্থাৎ সমস্যা কেবল মোট অর্থের পরিমাণে নয়; অর্থ কোথায় আছে এবং কোথায় যাচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ ‘টাকা কাজে লাগানো’
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামনে এখন আগের মতো শুধু তারল্য জোগাড়ের চ্যালেঞ্জ নেই। বরং বড় চ্যালেঞ্জ হলো উদ্বৃত্ত অর্থকে নিরাপদ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে নিয়ে যাওয়া। এর জন্য একসঙ্গে কয়েকটি সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। প্রথমত, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমিয়ে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সরকারি অর্থায়নের চাপ এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে ব্যাংকের অর্থের বড় অংশ কেবল সরকারি সিকিউরিটিজে আটকে না থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঋণের চাহিদা তৈরির মতো বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা।
অর্থনীতির সামনে বড় সতর্কবার্তা
ব্যাংকে টাকা থাকা নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। কিন্তু সেই টাকা যদি শিল্পে না যায়, নতুন ব্যবসা না তৈরি করে, উৎপাদন না বাড়ায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে, তাহলে কাগজে-কলমে তারল্যের প্রাচুর্য বাস্তব অর্থনীতিতে খুব বেশি সুফল দেবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের গল্পটি শুধু ‘টাকা বাড়ছে’—এমন নয়। বরং এর গভীরে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা—ব্যাংকে অর্থের অভাব নেই; অভাব বিনিয়োগের আস্থা ও ঋণের কার্যকর চাহিদার। আর এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে ব্যাংকের ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তারল্যও অর্থনীতির চাকা দ্রুত ঘোরাতে পারবে না।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array