সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রনায়কোচিত সপ্রতিভ তারেক রহমানে উজ্জীবিত বিএনপি
কালের আলো রিপোর্ট:
প্রায় ১৭ বছর পর প্রথম বিবিসি বাংলাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০০১ সালে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চার দলীয় ঐক্য জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তাকে বিভিন্ন টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যেতো। তবে তখন তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন না। এতোটা সমৃদ্ধ ছিল না অভিজ্ঞতার ঝুলিও। কিন্তু প্রায় দেড় যুগ পর অনির্ধারিত প্রশ্নোত্তর, জমে থাকা হাজারো প্রশ্ন, বিব্রতকর জিজ্ঞাসা, ব্যক্তিগত-পারিবারিক তথ্যানুসন্ধান, সুদীর্ঘ কথোপকথন-এমন সবকিছুর মুখোমুখি হয়ে পুরোদস্তুর সপ্রতিভ ছিলেন বর্তমানে দলটির এই শীর্ষ নেতা।
রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞায় স্বচ্ছন্দে তিনি সামলেছেন সব প্রশ্ন। জবাব বা উত্তরে ছিল না কোনো অস্পষ্টতা। নিজে যেটি বিশ্বাস করেন সেটিই বলেছেন এবং সেটি নির্দ্বিধায়। প্রচলিত রাজনীতির ধারায় পাশ কাটিয়ে যাননি কোন প্রশ্নের। বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী অবস্থান থেকেই কথা বলেছেন। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে তাঁর আলোচিত এই সাক্ষাৎকার। তুমুল আলোড়ন তোলার পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদেরও করেছে উদ্দীপ্ত-উজ্জীবিত। এ যেন নতুন এক তারেক রহমান।
দুটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাতে তাঁর দেশ পরিচালনার সক্ষমতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার (০৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষকদের এক মহাসমাবেশে বিশেষ বক্তার বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘আমরা এখন অত্যন্ত আশাবাদী যে আমাদের নেতা গতকাল যে ইন্টারভিউ দিয়েছেন বিবিসিতে এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে, এই ইন্টারভিউ শুধু বাংলাদেশ জাতিকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে এই আস্থা দিয়েছে যে আমাদের এই নেতা আমাদের এই জাতিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।’
- সমগ্র বিশ্বকে এই আস্থা দিয়েছে যে আমাদের এই নেতা আমাদের জাতিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মহাসচিব, বিএনপি
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিবিসি বাংলার সঙ্গে দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের কৌশল, আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও তাদের নেতাকর্মীদের বিচার, বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিসহ সমসাময়িক নানান বিষয়ে বিএনপির সরাসরি অবস্থান তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারে সংস্কার, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এই সাক্ষাৎকার দেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব সোমবার (৬ অক্টোবর) এবং দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকারে আলোয় ঝলমল করে উঠেছে এক নতুন সম্ভাবনা-যেখানে দল নয়, জনগণ হবে প্রার্থীর মাপকাঠি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আলোচিত এই সাক্ষাৎকারে পুরোপুরি ভিন্ন ও পরিণত এক তারেক রহমানকেই দেখেছেন দেশ ও বিশ্ববাসী। তাঁর আলাপে জাতীয় ঐক্যের সুর ছিল বেশ বলিষ্ঠ। তাঁর বক্তব্যের এই ধারা দেশের রাজনৈতিক সুস্থতার জন্য অনেক প্রয়োজন। প্রতিপক্ষকে অনাবশ্যক আক্রমণের সুযোগ যেমন নেননি, তেমনি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে এক সাধারণ মানুষের মতো ভদ্রোচিত অস্বস্তিতে ছিলেন, যেন তাঁর কোনো কথাতেই আত্মম্ভরিতা বা অহংকার প্রকাশিত না হয়। সবার কাছেই তাঁর এই অভিব্যক্তি প্রশংসিত হয়েছে।’
তারেক রহমান বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর মা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। স্বভাবতই বিরোধী অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে দেশের জনগণকে তুচ্ছ করে কোন না কোন কথা বলবেন। কিন্তু স্বভাবতই তিনিই প্রথম কোন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী যিনি জনগণকে এ তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এটিও দেশ-বিদেশে কুড়িয়েছে সুনাম। দেখা হচ্ছে সাক্ষাৎকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে।
- তারেক রহমান অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে সাক্ষাৎকারে শব্দচয়ন করেছেন, অত্যন্ত গাইডেড কথা বলেছেন
অ্যাডভোকেট শিশির মনির
সাবেক সেক্রেটারি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে এত দিন যে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে দলের নেতা-কর্মীরা প্রায়ই অস্পষ্টতার আশ্রয় নিতেন, সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই সেটা স্পষ্ট করেছেন অনেকটাই। বলেছেন, ‘কিছু সঙ্গত কারণে এখনো দেশে ফেরা হয়ে ওঠেনি। এখন ফেরার সময় চলে এসেছে। দ্রুতই দেশে ফিরব ইনশাআল্লাহ।’
সেই সঙ্গত কারণের মধ্যে নিরাপত্তা ছাড়াও হয়তো এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেটা আমাদের মতো সাধারণের বোধের বিষয় নয়। তবে তাঁর বা জিয়া পরিবারের নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর বাংলাদেশের খোলনলচে বদলে যাওয়ার মতো ঝুঁকি যে আছে, সেটা সম্ভবত সাধারণের অজানা নয়। স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘নির্বাচনের সময় কেমন করে দূরে থাকব? নির্বাচনের সময় জনগণের সঙ্গে, জনগণের মধ্যেই থাকব ইনশাআল্লাহ।’
দলের মনোনয়ন বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর মন্তব্য শুধু একটি কৌশলগত ঘোষণা নয়-এটি বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির সংস্কারধারায় এক সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তারেক রহমান জানিয়ে দিয়েছেন, মনোনয়নের মূল মাপকাঠি হবে এলাকার মানুষের সঙ্গে প্রার্থীর যোগসূত্র, গ্রহণযোগ্যতা এবং সমস্যাবোধ। এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে এটি হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কারের এক কার্যকর সূচনা-যেখানে দলীয় পরিচয় নয়, জনগণের আস্থা হবে প্রার্থীতার ভিত্তি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। সবিনয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘এখানে মাস্টারমাইন্ড কোনো ব্যক্তি বা দল নয়। দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণই গণ-অভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড। এ উপলব্ধি সর্বজনীন হলে আমরা জাতীয় ঐক্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছাতে পারতাম।’
- তারেক রহমানের বক্তব্য দেশের মানুষের হৃদয়-মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে দিয়েছে
আক্তারুজ্জামান বাচ্চু
সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারে কোন বিতর্কিত মন্তব্য না থাকায় তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে সাক্ষাৎকারে শব্দচয়ন করেছেন। সকালে উঠে বিবিসির সাক্ষাৎকার শুনেছি। অত্যন্ত গাইডেড কথা বলেছেন তিনি। সুচিন্তিত জবাব দিয়েছেন।’

কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ময়মনসিংহের দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, প্রায় দেড় যুগ পর দেশের কাণ্ডারি তারেক রহমানের বক্তব্য দেশের মানুষের হৃদয়-মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে দিয়েছে। দেশ ছাপিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছেন আমাদের প্রিয় নেতার একটি শোভন সাক্ষাৎকার। যেখানে প্রচলিত রাজনৈতিক কদর্যতা নেই। কাউকে চরিত্রহনন বা অশ্লীল আক্রমণ নেই। যেখানে তিনি স্থাপন করেছেন উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী বলেন, ‘অসাধারণ। একজন ম্যাচিউরিটি লিডার। আমরা গর্বিত।’ তারেক রহমানের বক্তব্যে প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানের বক্তব্যে আক্রমণ নেই, প্রতিহিংসা নেই। এটাই জাতি প্রত্যাশা করে।’
ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সভাপতি ও কারা নির্যাতিত ছাত্র নেতা শাহ মোহাম্মদ শাহাবুল আলম বলেন, ‘আমাদের ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবাই স্পষ্ট বার্তা পেয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞায় সবাইকে মুগ্ধ করেছেন। আগামীতে কীভাবে দেশ ও সরকার পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে দেশের মানুষ।’
কালের আলো/এমএএইচ/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array