তারেক রহমানের নির্বাচনী মিশন শুরু
কালের আলো রিপোর্ট:
প্রায় দেড় দশকের নিরলস সংগ্রামী পথচলা তারেক রহমানকে দিয়েছে স্বতন্ত্র এক পরিচিতি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে পাড়ি দিয়েছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথ। সামাল দিয়েছেন বহু শোক আর সংকট। ১৭ বছরেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। তবে দল পরিচালনায় আধুনিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল অবলম্বন করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নে নিজ ভূমিতে ফিরতে না পারলেও প্রবাস থেকেই দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন। ঐক্য বজায় রেখেছেন। ভার্চুয়াল সভা, সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক বার্তা প্রদান করেছেন। দীর্ঘ সময়ে দলের নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন। যে কারণে শত নির্যাতনের পরও বিএনপির ঐক্য বিনষ্ট হয়নি বা দল দুর্বল হয়নি। রাজনীতিতে তাঁর দূরদর্শিতা এক কিংবদন্তি। সৃষ্টি করেছে নতুন এক অধ্যায়ের।
১৭ বছর পর দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখার আনন্দ লাভ পেয়েছেন। যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন। এ সময়টিতে একজন ধীরস্থির, শান্ত, সৌম্য ও হৃদয়বান এক তারেক রহমানকেই দেখতে পেরেছেন সাধারণ মানুষ। নিজের স্বকীয় রাজনৈতিক স্টাইলে ছড়াচ্ছেন মুগ্ধতা। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিকল্পিত লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন, অবিচল থাকছেন। দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার গুরুদায়িত্বও তাঁর কাঁধে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। প্রতিহিংসা মূলক কোনো ধরনের কথা বলেননি। সাদামাটা জীবন যাপনে অভ্যস্ত বলেই কীনা লাল-সবুজের বিশেষ বাসে করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে মানুষের ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন। দেশগড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেছেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিকল্পনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে দেশের মানুষকে আশ^স্ত ও উদ্দীপ্ত করেছেন। নিয়মিতই রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে অন্তিম শয্যাশায়ী মা বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থাকছেন।
দেশে ফিরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ করেই ওইদিন বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। সংবর্ধনা মঞ্চ থেকে নেতা-কর্মীদের ভিড় ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা। বিমানবন্দর থেকে নেমে কেন শয্যাশায়ী মায়ের কাছে না গিয়ে আগে জনসমাবেশে এলেন, তার ব্যাখ্যা দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাঁদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, অর্থাৎ আপনারা-এই মানুষগুলোকে। সেই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি, টেলিভিশনগুলোর মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে যাঁরা আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।’
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিনদিন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যস্ত সময় পার করেছেন। বিমান বন্দর থেকে নেমেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। পরদনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। গত শনিবার জুলাই আন্দোলনের চেনা মুখ ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেছেন। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আনুষ্ঠানিকতাও শেষ করে পিলখানায় শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একইভাবে পারিবারিক দায়িত্বও পালন করেছেন। শয্যাশায়ী মাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকেই। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেদে ফেলেন তারেক রহমান। সবশেষ শনিবার নিজের ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে হয়েছেন আবেগাপ্লুত।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো উপস্থিত হন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তারেক রহমানের আগমনেই উজ্জীবিত হয়ে উঠেন দলটির নেতাকর্মীরা। দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে তিনি গুলশান কার্যালয়ে পৌঁছান এবং দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বেগম সেলিমা রহমান। এছাড়াও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস ছাত্তার এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, আসার পর এই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রথম অফিস করলেন। নির্বাচন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য আমীর খসরু বলেন, দলীয় কার্যালয়ে তারেক রহমানকে পেয়ে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি যাত্রা করবেন। দেশের মানুষ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন তারেক রহমানের আগমনে তা পূরণ হবে। স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র মন্তব্য করেন, তারেক রহমানের আগমন দলের মনোবল অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যোগ করেন, তারেক রহমানের গুলশান কার্যালয়ে আগমন দলকে নতুন উদ্দীপনা দেবে।
বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনের জন্য দলীয় মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে তিনি এই দুই আসনের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন। দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট দুই আসনের নির্বাচনী সমন্বয়কদের সঙ্গে নিয়ে এক সংক্ষিপ্ত সভায় বসেন তারেক রহমান। সভা শেষে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে তিনি নিজ হাতে মনোনয়নপত্রে সই সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী দাপ্তরিক কার্যক্রম বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতারা।
এর আগে গুলশানের ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হয়েছেন তারেক রহমান। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুর ১টায় আগারগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে গিয়ে আঙুলের ছাপ, আইরিশের প্রতিচ্ছবি আর বায়োমেট্রিক তথ্য দেন। এরপর ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছিলেন, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে তারেক রহমান শনিবার আনুষ্ঠানিকতা সারলেও তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে সময় লাগবে একদিন। রোববার (২৮ ডিসেম্বর) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ইসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রুহুল আমিন মল্লিক সাংবাদিকদের তারেক রহমানের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশন অনুমোদন করেছে।
এদিকে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেছেন দলীয় নেতারা। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) গভীর রাতে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের কাছ থেকে এই স্বাক্ষরিত মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বগুড়া-৭ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ থাকলেও শহীদ জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান ও বেগম জিয়ার শ্বশুরবাড়ি এলাকা হওয়ায় এবং বগুড়ার মানুষের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই মনোনয়নপত্রে সই করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু। এতেই স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। এর আগে গত ২১ ও ২২ ডিসেম্বর জেলা নির্বাচন অফিস, গাবতলী ও শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে ৩টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতারা এসব ফরম উত্তোলন করেন। পরে মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাতে ফরমগুলো নির্ভুলভাবে পূরণের পর তা সই করার জন্য গুলশান কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বগুড়া-৭ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু জানান, গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ম্যাডাম জিয়ার ব্যক্তিগত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের কাছ থেকে বগুড়া-৭ আসনের স্বাক্ষরিত মনোনয়নপত্রটি সংগ্রহ করা হয়েছে। এসময় গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টন উপস্থিত ছিলেন। আমরা আশাবাদী তিনি নির্বাচনে লড়বেন। তফসিল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই মনোনয়নপত্র সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা বিএনপি।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমএসআইপি


আপনার মতামত লিখুন
Array