গুপ্তরা দেশে নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে: তারেক রহমান
বরিশাল ও ফরিদপুর প্রতিবেদক, কালের আলো:
দেশে নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘গুপ্ত দলের লোকেরা জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নতুন জালেম, যাদের মানুষ ‘গুপ্ত’ হিসেবে চেনে, সেই জালেমদের নেতা নারীদের নিয়ে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন। এরা ইসলামের রাজনীতি করে কিন্তু নারীদের নিয়ে কীভাবে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করে।’
বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) বরিশাল নগরীর বেলস পার্ক মাঠে নির্বাচনী জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘দেশে নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করে। এমনকি কৃষিকাজেও পুরুষের সঙ্গে নারীরা কাজ করছেন ফসল উৎপাদনে। বিশেষ করে, গার্মেন্টস শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন নারীরা। আর গুপ্ত রাজনৈতিক দলটি প্রকাশ্যে সেই নারীদের নিয়ে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করছে। মা-বোনের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, সেই দলের কাছ থেকে দেশ অগ্রগতি আশা করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘দেশে নারীদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। নারীদের ঘরে বন্দি করে রেখে দেশের উন্নয়ন কোনও দিনই সম্ভব নয়। দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না। গুপ্ত সংগঠন নারী সমাজের বিরুদ্ধে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করে তাদের দূরে ঠেলে রাখতে চাচ্ছে।’ গুপ্ত সংগঠনের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কুমিল্লা জেলায় বাড়ি গুপ্ত সংগঠনের এক নেতা তার নেতাকর্মীদের বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জনগণের পা ধরতে, নির্বাচনের পর জনগণ তাদের পা ধরবে।’ এসব লোক নির্বাচিত হলে দেশের কী অবস্থা হবে তা ভেবে দেখতে বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষা বিনামূল্যে করেছিলেন। এইচএসসি পর্যন্ত মেয়েরা বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আগামীতে আমরা দায়িত্ব পেলে নারীদের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাদের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কর্মজীবী করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে দেশের বড় একটি অংশ বেকার যুবক। তাদের কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সেখানে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।’

বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ অঞ্চলে কৃষিজমি বেশি। এ কারণে কৃষকও ফসল উৎপাদনে বেশি মনোযোগী। কিন্তু সেভাবে তারা মূল্য পাচ্ছে না। তারা যাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পান এ জন্য একাধিক হিমাগারের ব্যবস্থা করা হবে। সেই হিমাগারে উৎপাদিত ফসল রাখা হলে কৃষক তার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারবে। ‘কৃষকদের জন্য কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। সেই কার্ড দিয়ে কৃষক তার জমি অনুপাতে সার ও বীজসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারবেন। এমনকি যাদের ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ রয়েছে, দেশের দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা মওকুফ করা হবে।’
‘ভোলাকে সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে বরিশাল-ভোলা ব্রিজ করা হবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভোলায় মেডিক্যাল স্থাপন করা হবে। শের ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার উন্নয়ন করা হবে। বিশেষ করে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকট এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দূর করা হবে।
‘বরিশালের বেশির ভাগ এলাকা নদী ভাঙনকবিলত। ভাঙনের কারণে সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি মা-বাবার কবরও ধরে রাখতে পারছেন না। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। আর এসব উন্নয়ন সম্ভব হবে ধানের শীষকে নির্বাচিত করলে। এ জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি কঠিনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যারা যে বিষয়ে পারদর্শী তাদের সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞ করে গড়ে তোলা হবে। দেশের জনগণের মাঝে পরিবর্তন করতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে।’
তারেক রহমান জানান, ১৯৭৮ সালে তার বাবা জিয়াউর রহমান পল্লী বিদ্যুতের লাইন চালু করেছিলেন। এরপর তার মা বেগম খালেদা জিয়া বরিশালকে বিভাগ করেন। বরিশাল নিয়ে তার অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। তা সম্ভব হবে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর। বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুকের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন– বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা) আসনের প্রার্থী রাজীব আহসান, ঝালকাঠী-২ (ঝালকাঠী-সদর) আসনের ইলেন ভুট্টো, বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আবুল হোসেন খান, বরগুনা-২ আসনের নুরুল ইসলাম মণি, বরিশাল-৫ (সদর) আসনের মজিবর রহমান সরোয়ার, ভোলা-১ (ভোলা সদর) আন্দালিব রহমান পার্থ, ভোলা-৩ আসনের হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, পটুয়াখালী-১ আসনের আলতাফ হোসেন চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানসহ অন্যরা।

তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নযোগ্য
বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় জনসমাবেশে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য বলেই মনে করছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের বক্তব্যে উঠে এসেছে অতীত অভিজ্ঞতা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং বিএনপির শাসনামলের নানা উদাহরণ।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বরিশালের বেলস পার্কে বিএনপির বিভাগীয় জনসমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী ১২ তারিখ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচিত হলে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নই হবে দলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, ১৩ তারিখ থেকেই দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাল খনন, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নসহ অনেক কাজ করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে গৃহিণীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, নদীভাঙন রোধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। পাশাপাশি জনগণের ভোটে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার কথাও তুলে ধরেন।
সমাবেশে অংশ নেওয়া বরিশাল নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা মোসলেম গাজী বলেন, তারেক রহমান শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি।
তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার পর দেশকে নতুন দিশা দিয়েছেন। আর তার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। এই পরিবার জানে রাষ্ট্র চালাতে হয় কীভাবে। বরিশালের মহিপুর থেকে আসা প্রবীণ সমর্থক মাহতাব ভুইয়া বলেন, অতীতে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অনেকটাই বাস্তবায়ন করেছে।
গ্রামগঞ্জে সড়ক নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, কৃষিতে ভর্তুকি সবই মানুষ চোখে দেখেছে। সেই ধারাবাহিকতার কারণেই তারেক রহমানের কথায় আমরা আস্থা রাখছি। তিনি আমাদের আস্থার প্রতীক। বাবুগঞ্জ থানার এক তরুণ সমর্থক তসলিম মিয়া বলেন, আমরা রাজনীতি দেখি ভবিষ্যতের জন্য। তারেক রহমান তরুণদের কথা বলেছেন, চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরির কথা বলেছেন। এ কারণেই তরুণ প্রজন্ম তার নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি সবসময় আমাদের পাশে থাকবেন।
ফরিদপুরকে বিভাগ করার ঘোষণা
দল সরকার গঠন করলে এবং ফরিদপুরে বিভাগ গঠন করলে যদি জনগণের উপকার হয়, উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় তবে জেলাটিকে বিভাগ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনী সফরের অংশ হিসেবে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় যোগ দিয়ে তিনি ফরিদপুরবাসীকে এ আশ্বাস দেন। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে দেশের সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, সেই বিশ্বাস থেকেই দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়।

ফরিদপুর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা নদীভাঙনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দ্রুত পদ্মা ও সংশ্লিষ্ট নদীভাঙন সমস্যার কার্যকর সমাধান করা হবে। কৃষিখাতে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের জন্য বিশেষ কৃষক কার্ড চালু করা হবে, যার মাধ্যমে সহজে বীজ, সার ও কীটনাশক পাওয়া যাবে।
ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচার হটিয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা হয়েছে।
একটি দলকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এক গুপ্ত দলের নেতা মা-বোনদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালেও তাদের ভূমিকা ছিল কলঙ্কজনক। ভাষণে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানে সঠিক নীতি ও সুশাসন থাকলে এই অঞ্চল দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে।
কালের আলো/এমএএইচ/এইচএন



আপনার মতামত লিখুন
Array