খুঁজুন
                               
, ,
           

পা ফেলারও জায়গা নেই পঙ্গু হাসপাতালে 

বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৫ অপরাহ্ণ
পা ফেলারও জায়গা নেই পঙ্গু হাসপাতালে 

ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতাল। ঈদের ছুটিতে এখানে শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সি মানুষ এসেছেন নানা ধরনের আঘাত পেয়ে, আহত হয়ে। কারও হাত ভাঙা, কারও পা। আবার কেউ এসেছেন ছোটখাটো আঘাত নিয়ে। আহতদের বেশিরভাগই মোটরবাইক দুর্ঘটনার শিকার, আবার কেউ কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ি দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে আহত হয়েছেন। কোনো কোনো রোগীর হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থাও রয়েছে। আহতদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ।

মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের ছুটি শেষ হলেও জরুরি বিভাগে প্রতি ঘণ্টায় এমন বহু রোগী আসছেন হাসপাতালে। এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার মতো কোনো জায়গা নেই।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে এক্স-রে রুম, টিকেট কাউন্টার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডাক্তারের রুমের সামনেও দীর্ঘ লাইন। যাদের অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এক হাজার শয্যার হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। আবার শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে রোগীদের। তাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা।

পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের আগে ও পরে গত সাত দিনে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এক হাজার ৭৩৮ জন রোগী জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন, যা দৈনিক গড়ে প্রতিদিন প্রায় আড়াইশ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে গত সাত দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪৬ জন। আর মোট দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৩০০ জন। অর্থাৎ মোট আহতের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশই মোটরবাইক দুর্ঘটনায় আহত।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঈদের আগে ও পরে গত ১৭ মার্চ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন ২৩৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ৬১ জনকে, ১৮ মার্চ আসা ২৩৭ জনের মধ্যে ভর্তি করা হয় ৬৮ জনকে, ১৯ মার্চ ২৪০ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৭২ জন, ২০ মার্চ ২১৩ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৬৫ জন, ২১ মার্চ ২৬৬ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৯১ জন, ২২ মার্চ ২৯০ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৯৬ জন এবং ২৩ মার্চ ২৫৩ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৯৩ জন রোগীকে।

জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন মোজাম্মেল হোসেন নামের এক তরুণ। তিনি বলেন, বনানী এলাকায় আমি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলাম। উল্টো দিক থেকে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা আমার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। পড়ে গিয়ে আমার হাত ভেঙে যায়। তিনি দাবি করেন, দোষ ওই অটোরিকশাচালকেরই ছিল। কিন্তু হাত ভাঙল আমার। এখন এর দায় কে নেবে?

দেখা গেছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে মোটরসাইকেল কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি কিংবা টমটমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। কিছু প্রাইভেটকার দুর্ঘটনাও রয়েছে। রোগীর আঘাতের ধরন অনুযায়ী কাউকে কাউকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এখন তো ঈদের ছুটি শেষ। তাই রোগীর চাপও কমেছে।

ঈদের সময় দুর্ঘটনায় বিষয়ে নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী সময়ে এই হাসপাতালে রোগীর এমনই চাপ থাকে। এবারও রোগীর চাপ প্রচুর ছিল। আমরাও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি। সাধারণত ঈদের ছুটির সময়ে বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা, অতিরিক্ত আরোহী নিয়ে প্রতিযোগিতা বা মহাসড়কে ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ এসবই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

কালের আলো/এম/এএইচ

চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারা বাতিলের দাবি, ৫ অক্টোবর অবস্থান কর্মসূচি

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৯ অপরাহ্ণ
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারা বাতিলের দাবি, ৫ অক্টোবর অবস্থান কর্মসূচি

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ‘বন্দর রক্ষা কমিটি’। একই সঙ্গে আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বন্দর রক্ষা কমিটির উদ্যোগে নগরীর বারিক বিল্ডিং এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বন্দরের দিকে এগিয়ে দুই নম্বর গেটের সামনে পৌঁছালে পুলিশের অনুরোধে কর্মসূচি শেষ করেন আন্দোলনকারীরা।

সমাবেশে শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেন, এনসিটি ও সিসিটি দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে এসব টার্মিনাল কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।

ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। ইজারার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, শ্রমিকদের অধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনার দাবি জানান তিনি।

জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এএম নাজিম উদ্দিন বলেন, বন্দর শুধু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত কৌশলগত স্থাপনা। এনসিটি ও সিসিটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিক নেতা কাজী শেখ নূরুল্লাহ বাহার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন ও দক্ষ জনবল নিয়োগে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হলে রাজস্ব, শ্রমিকদের চাকরি ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এনসিটি ও সিসিটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।

সমাবেশ শেষে ইজারা প্রস্তাব বাতিল ও চট্টগ্রাম বন্দরের স্বার্থ রক্ষার দাবিতে স্লোগান দিয়ে বন্দরের দিকে পদযাত্রা করেন বিক্ষোভকারীরা। আগামী ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেন তারা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

চামড়া-জাহাজ শিল্পে জার্মান প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ চায় সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
চামড়া-জাহাজ শিল্পে জার্মান প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ চায় সরকার

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার এবং হালকা প্রকৌশলসহ সম্ভাবনাময় শিল্পখাতে জার্মান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এসব খাতকে রফতানিমুখী, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পে রূপ দিতে জার্মানির অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সরকার।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) শিল্প মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠকে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-জার্মানি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন, মানোন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, একই ধরনের সাফল্য চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও হালকা প্রকৌশলসহ অন্যান্য শিল্পখাতেও অর্জন করা সম্ভব। এজন্য আন্তর্জাতিক মান, কমপ্লায়েন্স, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরে শিল্পমন্ত্রী বলেন, এ খাতে বিপুল রফতানি সম্ভাবনা থাকলেও পরিবেশগত মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির ব্যবহার কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে শিল্পটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে জার্মান প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে।

জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার খাত প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী বলেন, এ খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশের ইস্পাত, নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে পরিবেশ সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে এ খাতের সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, উন্নত প্রযুক্তি, নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে জার্মানির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার খাতে জার্মান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অংশীদারত্বের বড় সুযোগ রয়েছে।

জার্মান রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের শিল্পখাতের অগ্রগতি ও সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্ব্যবহারসহ সম্ভাবনাময় খাতে সহযোগিতা আরও বাড়াতে জার্মানির আগ্রহ রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পখাতে অংশীদারত্ব এবং উচ্চপর্যায়ের পারস্পরিক সফর বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। এ সময় শিল্প মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জার্মান দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফিরছে শিল্পের গ্যাস

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফিরছে শিল্পের গ্যাস

শিল্প-কারখানায় চলমান গ্যাস সংকট সাময়িকভাবে কাটিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ এক-দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী সমাজ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট, শিল্পে গ্যাসের প্রভাব, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

  • সাময়িক সংকট কাটানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
  • ২০২৭ সালের মধ্যে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল
  • ২০৩৪ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য

বৈঠকের শুরুতে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক উপস্থাপনা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

দুর্ঘটনায় গ্যাস সরবরাহে ধাক্কা
বর্তমান গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে এবং এর প্রভাব শিল্প-কারখানাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ে।

তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে দ্রুতই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।’

এই বক্তব্য শিল্প খাতের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির বার্তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি যুক্ত।

‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের জটিল সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়।

তবে সরকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এখানে সরকারের অবস্থান হলো, সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটকে কেবল একটি তাৎক্ষণিক সরবরাহ সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি নির্ভরতা, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা-সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে যেতে হবে।

২০২৭ সালের মধ্যে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি গত এক মাসে মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।

দ্রুত কাজ শুরু করে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি সক্ষমতা তৈরি হবে। এতে একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনা বা কারিগরি সমস্যার মতো ঘটনায় পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ পড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

২০৩৪ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
ব্যবসায়ী সমাজের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে তারা আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংকট রয়েছে-কিন্তু সেই সংকট মোকাবিলায় কাজও চলছে। তাই হতাশ হওয়ার কারণ নেই।

গণমাধ্যমের কাছেও সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে হলে কার্যকর একটি দল প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারও সেভাবেই কাজ করছে, যাতে দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

একই সঙ্গে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

বৈঠকে ছিলেন মন্ত্রী-উপদেষ্টা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা
মতবিনিময় সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।

ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজেএমএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক এবং বাপা সভাপতি মাহবুব আনাম অংশ নেন।

এছাড়া গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে দৈনিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন আলোচনায় অংশ নেন।

স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি, সামনে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা
আগামীকাল মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা শিল্প খাতের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে এই স্বস্তি কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একটি টার্মিনালের দুর্ঘটনা যে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে, সাম্প্রতিক সংকট সেটিই আবার সামনে এনেছে।

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হবে অন্যতম প্রধান শর্ত। ফলে মঙ্গলবার গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রতিশ্রুতির পর সরকারের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে এই সরবরাহকে স্থায়ী, নির্ভরযোগ্য ও শিল্পবান্ধব ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।

কালের আলো/এম/এএইচ