দেশে একের পর এক হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ এবং বরাদ্দ বাড়লেও প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও দক্ষ জনবল, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় হাইটেক পার্কগুলোর লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘আজকের অ্যাজেন্ডা’ ভার্চুয়াল সিরিজের ‘হাইটেক পার্কস: মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এম. রকনুজ্জামান জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ৩৯টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। অবকাঠামো তৈরি করলেই প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও বিপ্লব ঘটবে—এমন ধারণা থেকেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেম, দক্ষ জনবল ও শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
যশোর হাইটেক পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্কটিতে বর্তমানে ৪০টি কোম্পানি রয়েছে। তবে কার্যকর ইকোসিস্টেম সহায়তা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেকটা নিজেদের উদ্যোগেই টিকে থাকতে হচ্ছে। প্রশিক্ষিত জনবলের চলে যাওয়া, স্থাপনার দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং বেশি ইউটিলিটি খরচও বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাজশাহী হাইটেক পার্কের অভিজ্ঞতায় কিছুটা আশার চিত্র তুলে ধরেন নেট্রো সিস্টেমস ও টেলজেনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির। তাঁর মতে, রাজশাহীর প্রযুক্তি উদ্যোগগুলো বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছালেও হাইটেক পার্কে কোম্পানিগুলোর সুবিধা এখনো মূলত কর অব্যাহতির মধ্যেই সীমিত। স্টার্টআপগুলোর জন্য সরাসরি সহায়তাও খুব কম।
ইউওয়াই সিস্টেমসের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা এ. রহমান বলেন, হাইটেক পার্ক নিয়ে দেশে বড় বড় প্রতিশ্রুতির একটি দীর্ঘ চক্র তৈরি হয়েছে। কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে জমি বরাদ্দ পাওয়ার পরও সহায়ক সেবা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বরাদ্দ ফিরিয়ে দিয়েছে।
ডিএনএস সফটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফেল কবির বলেন, হাইটেক পার্কগুলোর পরিকল্পনার সঙ্গে সরকারি নীতিরও অসঙ্গতি রয়েছে। শুধু রপ্তানি প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে মাদারবোর্ড ও চিপ ফ্যাব্রিকেশনের মতো মৌলিক প্রযুক্তি উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, হাইটেক পার্কের অবস্থান নির্বাচনকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তাইয়েব। তাঁর মতে, বিদ্যমান ইপিজেড বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় না করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকায় পার্ক স্থাপন করায় অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়নি।
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য শুধু ভৌত অবকাঠামো নয়, সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পচালিত প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তাদের মতে, হাইটেক পার্কের মডেল পুরোপুরি বাতিল করার প্রয়োজন নেই। বরং উন্নত ইউটিলিটি সুবিধা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর ব্যবসায়িক সহায়তা নিশ্চিত করে মডেলটিকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। কোম্পানিগুলোকে শুধু ভাড়াটে হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা গেলে দেশের প্রযুক্তি খাত ও বিনিয়োগে হাইটেক পার্কগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array