বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ আবারও দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ, জাইকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএসএআইডির মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে প্রায় ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই অর্থায়ন প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন অর্থের ব্যয় বেড়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এই বাড়তি প্রতিশ্রুতি অর্থনীতির সম্ভাবনা ও উন্নয়ন চাহিদা—দুইয়ের প্রতিই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মনোযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এবার অর্থায়নের বড় অংশ যাচ্ছে এমন সব খাতে, যেগুলো ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্ত করার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
- ১১.৭ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিতে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা
- আস্থার কেন্দ্রে বড় বাজার ও তরুণ জনগোষ্ঠী
- জলবায়ু, অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও সংস্কারে মিলছে নতুন অর্থায়নের সুযোগ
শুধু ঋণ নয়, বাড়ছে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব
বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় বড় অবকাঠামো প্রকল্পই বৈদেশিক সহায়তার প্রধান ক্ষেত্র ছিল। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু অভিযোজন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, নারী উদ্যোক্তা, এসএমই, সবুজ শিল্প ও রাজস্ব সংস্কার। অর্থাৎ নতুন অর্থায়নের লক্ষ্য শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি নয়; অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের জন্য এ পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আগামী দিনের প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, যোগাযোগ ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর।
৩.৫ বিলিয়ন ডলারে বিশ্বব্যাংকের বড় বার্তা
চলতি বছরে বিশ্বব্যাংক প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এ অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থায়নের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে জলবায়ু ঝুঁকির কারণে। বাংলাদেশের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় প্রতিবছর বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ফলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও অভিযোজন কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ তৈরির সুযোগ তৈরি করছে। একই অর্থায়ন কর্মসূচিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য যুক্ত হওয়ায় মানবসম্পদ উন্নয়নও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে যে দক্ষ ও সুস্থ কর্মশক্তি প্রয়োজন, এসব বিনিয়োগ সেই ভিত্তিই শক্ত করতে পারে।
অবকাঠামোর সঙ্গে এবার গুরুত্ব এসএমইতেও
এডিবির প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অবকাঠামো, জ্বালানি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতিতে এই তিনটি খাতের প্রভাব বহুমাত্রিক। অবকাঠামো উন্নত হলে পণ্য পরিবহন ও ব্যবসার ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হলে শিল্প উৎপাদন বাড়তে পারে।
আর এসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়লে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এডিবির অর্থায়নকে শুধু প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা হিসেবে দেখার বদলে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে সক্ষমতা তৈরির বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যায়।
জাইকার অর্থে শহর, বন্দর ও দক্ষ জনশক্তি
জাপানের জাইকা প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে। মেট্রোরেল, বন্দর ও কারিগরি শিক্ষায় এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এই তিনটি ক্ষেত্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। উন্নত নগর পরিবহন কর্মঘণ্টা ও চলাচলের ব্যয় কমাতে পারে। বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে আমদানি-রপ্তানির গতি বাড়ার সুযোগ থাকে। আর কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
আইএমএফের অর্থে সংস্কারের সুযোগ
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ আইএমএফ। সংস্থাটি প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর সঙ্গে বাজেট সহায়তা ও রাজস্ব সংস্কারের বিষয়টি যুক্ত। আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে।
প্রায় ১০ দিনের সফরে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির পঞ্চম কিস্তি ছাড়ের আগে নির্ধারিত শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। নতুন সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা এগোতে পারে। আইএমএফের এই সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত ও সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও সক্ষম করার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের বড় শক্তি জনসংখ্যা ও বাজার
আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর আগ্রহের পেছনে বাংলাদেশের বিশাল বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ হওয়ায় এখানে ভোগ ও সেবার বড় বাজার রয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক সম্পদ। এই জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে পারলে উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেবা ও উদ্যোক্তা খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা, স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা ও কারিগরি শিক্ষার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভূরাজনীতিও বাড়াচ্ছে অংশীদারিত্ব
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, যোগাযোগ, সমুদ্রবন্দর, সরবরাহব্যবস্থা ও আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের বিভিন্ন উদ্যোগে তাই অবকাঠামোর পাশাপাশি বাণিজ্য, সবুজ অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলোও সামনে আসছে।
অর্থায়নের আসল সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবহারে
বাংলাদেশের জন্য বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিধি একই সঙ্গে বাড়ছে এবং বৈচিত্র্যও আসছে। বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু ও মানবসম্পদ বিনিয়োগ, এডিবির অবকাঠামো ও এসএমই সহায়তা, জাইকার পরিবহন ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইএমএফের সংস্কার সহায়তা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে সক্ষমতা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই সুযোগকে স্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকৃত মূল্য শুধু কত বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেল, তার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল সম্পদ, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ আয়ের উৎস তৈরি করতে পারল তার ওপর। বর্তমান প্রবাহ সেই সম্ভাবনার দরজাই নতুন করে খুলে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—আন্তর্জাতিক আস্থার এই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতায় রূপ দেওয়া।
এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array