সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম- এসব অভ্যাস নিঃসন্দেহে উপকারী। কিন্তু সুস্থ থাকার এই চেষ্টাই যখন প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটি উল্টো মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘হেলথ-ম্যাক্সিং’ বা ‘ওয়েলনেস অপটিমাইজেশন’ নিয়ে তাই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিটি অভ্যাসের হিসাব
কত ঘণ্টা ঘুম হলো, দিনে কত পা হাঁটা হলো, শরীরে কতটা পানি গেল, কত গ্রাম প্রোটিন খাওয়া হলো-এসব তথ্য এখন স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ট্র্যাকার ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই জানা যায়। ২০২৬ সালে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির বাজারেও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও তার ভিত্তিতে পরামর্শ দেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়ছে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হতে পারে তখনই, যখন এসব তথ্য স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার বদলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘুমের স্কোর একটু কম হলেই দুশ্চিন্তা, নির্দিষ্ট সংখ্যক পদক্ষেপ পূরণ না হলে অপরাধবোধ কিংবা প্রতিদিনের ব্যায়ামের লক্ষ্য পূরণ না হলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করা – এ ধরনের আচরণ অনেকের জীবনকে আরও চাপপূর্ণ করে তুলতে পারে।
‘আরও ভালো’ হওয়ার চাপ
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে অনেক সময় এমন একটি লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন নিজেকে আগের দিনের চেয়ে আরও ভালো করতে হবে। বেশি ব্যায়াম, আরও নিখুঁত খাবার, আরও ভালো ঘুম, আরও বেশি উৎপাদনশীলতা- সবকিছুতেই যেন সর্বোচ্চ ফল পাওয়ার চেষ্টা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ম্যাক্সিং’ সংস্কৃতি এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘হেলথ-ম্যাক্সিং’-এর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য অতিরিক্ত বা প্রমাণভিত্তিক নয় এমন কিছু পদ্ধতিও অনুসরণ করা হতে পারে।
স্মার্টওয়াচ কি সবসময় স্মার্ট সিদ্ধান্ত দেয়?
স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি বা ওয়্যারেবল অবশ্যই উপকারী হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য থেকে নিজের শারীরিক অবস্থার কিছু পরিবর্তন বোঝা যায়। তবে একটি দিনের কোনো একটি স্কোর বা রিডিংকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ওয়্যারেবলের তথ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি অংশ হিসেবে দেখা, পুরো স্বাস্থ্য নির্ধারণের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে নয়।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও দেখা গেছে, ওয়্যারেবল থেকে পাওয়া স্বাস্থ্য-তথ্য একা ব্যবহার করে উদ্বেগ নির্ধারণ করা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। গবেষকেরা বরং এসব তথ্যের সঙ্গে ব্যক্তির নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল তথ্য মিলিয়ে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঘুম নিয়েও বাড়ছে অতিরিক্ত চিন্তা
ভালো ঘুমের জন্য ঘুমের সময় ও মান পর্যবেক্ষণ করা উপকারী হতে পারে। কিন্তু ঘুমের প্রতিটি পর্যায়, স্কোর কিংবা ‘রিকভারি’ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করলে ঘুম নিজেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, ঘুমানোর উদ্দেশ্য যদি বিশ্রাম নেওয়া হয়, তাহলে ঘুমের স্কোর ঠিক রাখার চাপ যেন সেই বিশ্রামকেই নষ্ট না করে-সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
তাহলে কি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ছেড়ে দিতে হবে?
একেবারেই নয়। বরং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মূল কথা হলো ভারসাম্য। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-এসবকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক জরিপেও চরম ধরনের ‘বায়োহ্যাকিং’ বা দীর্ঘায়ু বাড়ানোর কঠিন কৌশলের বদলে মানুষ ছোট, বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা যায়-এমন অভ্যাসের দিকে বেশি ঝুঁকছে বলে উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য মানেই নিখুঁত হওয়া নয়
দিনে ১০ হাজার পা হাঁটতে না পারলেও আপনি ব্যর্থ নন। একদিন ব্যায়াম না করলেও পুরো রুটিন নষ্ট হয়ে যায় না। কোনো রাতে ঘুমের স্কোর খারাপ এলেও আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক ও উপভোগ্য করা-জীবনকে আরও একটি পরীক্ষায় পরিণত করা নয়।
সাম্প্রতিক ‘ওয়েলনেস অপটিমাইজেশন’ নিয়ে আলোচনাও শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নই সামনে আনছে-সুস্থ থাকার জন্য আমরা প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবহার করছি, নাকি শেষ পর্যন্ত তথ্যের পেছনেই ছুটে নিজেদের ওপর আরও চাপ তৈরি করছি?
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array