খুঁজুন
                               
, ,
           

নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের বড় রায়, দুই আসামির ফাঁসি বহাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ২:০৭ অপরাহ্ণ
নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের বড় রায়, দুই আসামির ফাঁসি বহাল

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন পাওয়া চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

অন্যদিকে কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন ও মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলরকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, ১৬ আসামির বিরুদ্ধে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল। হাইকোর্টের বিচারিক পর্যালোচনায় ১০ জনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে।

রায়ে নিম্ন আদালতের বিচারকের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, এক হত্যাকাণ্ডে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াকে হাইকোর্ট ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে ওই বিচারককে ফৌজদারি মামলার বিচার ও সাজা দেওয়ার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আনার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি

ক্ষমতার জৌলুস নয়, মানুষের আস্থা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
ক্ষমতার জৌলুস নয়, মানুষের আস্থা

রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন শাসক আর শাসিতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ক্ষমতার প্রাসাদ যত উঁচু হয়, মানুষের বাস্তব জীবন থেকে নেতৃত্ব তত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সত্যটি খুবই সরল– ক্ষমতা মানুষের জন্য, মানুষ ক্ষমতার জন্য নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ছয় মাসের রাজনৈতিক আচরণ ও কিছু সিদ্ধান্তকে এই বাস্তবতার আলোকে দেখলে একটি ব্যাপক পরিবর্তনের ধারা চোখে পড়ে। বিষয়টি শুধু তাঁর সাদামাটা পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দাপ্তরিক কাজে নিজের নাম ও পদের আগে ‘মাননীয়’ বা এ ধরনের সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার পরিহার করতে বলেছেন, সেইসাথে অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও আড়ম্বর কমানো, সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়ানো, তার ছবি সংবলিত কোন ব্যানার ব্যবহার না করা, নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখা, সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত করে রাস্তা বন্ধ না করা, আহত সেনাসদস্য বা দলীয় কর্মিদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়া– এসব ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মতো একটি প্রাক-উপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে পাচ দশকের অধিককাল চলমান ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত প্রচলিত দূরত্ব ও জৌলুসকে কমিয়ে আনার একটি বার্তা দিচ্ছেন।

একইরকম বার্তা পাওয়া যায় তাঁর ব্যক্তিগত আচরনের ক্ষেত্রেও। পোশাকের সাধারণত্ব, জনসমক্ষে অনাড়ম্বর উপস্থিতি এবং আচরণে তুলনামূলক সংযমকে তাই কেবল তার ব্যক্তিগত রুচি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, সেটিও ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির একটি বহিঃপ্রকাশ। তিনি যখন ক্ষমতার দৃশ্যমান চাকচিক্য কমান, নিজেকে বিনয়ের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন, তখন সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও অনেকাংশে কমে যায়।

তবে গত ছয় মাসে সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে তার রাজনৈতিক ভাষায়। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, হুমকি, বিদ্রূপ এবং প্রতিপক্ষকে প্রায় শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের ভাষায় অভ্যস্ত। সেই বাস্তবতায় সংসদ কিংবা সংসদের বাহিরে বিরোধী পক্ষের অমার্জিত কটাক্ষ, সমালোচনা ও উদ্বেগের জবাবে তারেক রহমানের তুলনামূলক সংযত, শালীন ও গঠনমূলক শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন এবং জনমনে তার রুচি ও শিষ্টাচার বোধের এক ব্যতিক্রমি উদাহরন সৃষ্টি করেছে। তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতার ভাষায় না নিয়ে রাজনৈতিক ভাষাতেই মোকাবিলা করার যে প্রবণতা দেখাচ্ছেন, তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক discourse-এ আগামী দিনে একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।

তবে এর প্রভাব শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। ক্ষমতার শীর্ষে ব্যবহৃত ভাষা ধীরে ধীরে তৃনমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। নেতা যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও সেটিকেই রাজনৈতিক আচরণের মডেল হিসবে অনুশীলন করে। বিপরীতে শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত থাকে, ভিন্নমতকে রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিরোধীদের উদ্বেগের জবাব শালীনভাবে দেয়, তবে দলের তৃণমূলেও একটি ভিন্ন বার্তা যায়। বাংলাদেশের সংঘাতপ্রবণ রাজনীতিতে তারেক রহমানের এই পরিবর্তিত tone-setting এর সম্ভাব্য প্রভাব তাই ব্যক্তিগত শিষ্টাচারের চেয়ে অনেক বড়। সুক্ষভাবে অনুসরন করলে, এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে । সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ কিংবা মাঠ পর্যায়ের কর্মিদের মধ্যেও ভাষা কিংবা আচরনের মধ্যে ক্রমাগত শালিনতা এবং বিনয়ের ভাব ক্রমান্বয়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট– আড়ম্বর দিয়ে সাময়িক বিস্ময় তৈরি করা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আস্থা সৃষ্টি করা যায় না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ধারার একটি শক্তি ছিল মানুষের কাছে যাওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্রমাগত প্রচেষ্টা। শহীদ জিয়া দেশের প্রতিটি প্রান্তরে প্রান্তরে মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছেন, নিরন্তর ছিল তার পথচলা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যেও সেই ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক দর্শনের একটি আধুনিক প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: রাজনীতি তাহলে কাদের জন্য…?
এই প্রশ্নের উত্তরও শুধু বক্তৃতায় নয়, কাজে দিতে হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি উদ্যোগের কেন্দ্রে তাই আরেকটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটা হলো, সরকারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা, জনসেবা সহজ করা। সরকারের কর্মকাণ্ডকে মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগগুলো সফল হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা হল– রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমে যাওয়া।

কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন বক্তৃতার চেয়ে ফলাফল চায়। তারা জানতে চায় না সরকার কী বলছে, তারা দেখতে চায় সরকার কী করছে। একজন কৃষক সার, কীটনাশক পাচ্ছে কি না, তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, একজন ব্যবসায়ী অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়া কাজ করতে পারছেন কি না, একজন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না, মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস পাচ্ছে কি না– এসবই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত Performance Indicator।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিনয়ের সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হলো সরকারের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করা। ১৫ বছরের অধিক একটা স্বৈরশাসনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি, বিদ্যুত-গ্যাস এর প্রকত সমস্যা রয়েছে। সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি এ ধরনের বাস্তবতা স্বীকার করার রাজনৈতিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রচলিত ক্ষমতার সংস্কৃতিতে সরকার সাধারণত নিজের সাফল্য তুলে ধরে, ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা স্বীকারের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সেই জায়গায় তারেক রহমান অকপটে প্রকৃত অবস্থা শিকার করে বিভিন্নমুখি পদক্ষেপ গ্রহনের সংসদে জানিয়েছেন এবং জনগণের কাছে আরও সময়, সহযোগিতা চেয়েছেন– এটা কোন দুর্বলতা নয় বরং এটি রাজনৈতিক বিনয় (Humility) – এর একটি শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। এই Humanization of Power বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিশাল বিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

সুতরাং তারেক রহমানের সাদামাটা পোশাক, প্রটোকলে সংযম, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি পরিমিত ভাষা কিংবা সরকারের সীমাবদ্ধতা স্বীকার– এ সবগুলোকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে সম্ভবত পুরো চিত্রটি অনুধাবন করা মুশকিল। বাংলাদেশের মতো একটি সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একসঙ্গে দেখলে এগুলো ক্ষমতা সম্পর্কে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার ইঙ্গিত বহন করে। তারেক রহমানের এই ক্ষমতাকে প্রদর্শন না করে পরিমিত ব্যবহার করা, প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান না করে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করা এবং নিজের অবস্থানকে অভ্রান্ত না ভেবে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা– এই ধারনা প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক সম্ভাবনাময় সূর্যের আভা দৃশ্যমান হবে। সুতরাং, তারেক রহমানের বিগত ছয় মাসকে শুধু একটি নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস হিসেবে দেখলে সম্ভবত এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক উপেক্ষিত হবে।

ইতিহাস কোনো সরকারের গাড়িবহর, প্রটোকল কিংবা ক্ষমতার জৌলুস মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে, কে ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কে তাদের কণ্ঠ শুনেছিল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি ছিল, কে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল এবং কে রাষ্ট্রের শক্তিকে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের মর্যাদা বাড়াতে ব্যবহার করেছিল।

তাই আজকের রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ক্ষমতা কার হাতে, তা নয়। তারেক রহমানের গত ছয় মাসের পদক্ষেপগুলো অন্তত একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে– বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষমতার জৌলুস থেকে মানুষের আস্থার দিকে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে প্রতিষ্ঠানমুখিতার দিকে এবং কথার রাজনীতি থেকে কাজের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার কোনো বিশেষণ নয়, ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার হলো মানুষের আস্থা।

লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.), প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।

রাশিয়ার গোপন প্রযুক্তিতে ইরানের ‘সুপারসনিক’ উত্থান

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ণ
রাশিয়ার গোপন প্রযুক্তিতে ইরানের ‘সুপারসনিক’ উত্থান

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে রাশিয়া ও ইরানের কথিত গোপন ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতা। ফাঁস হওয়া নথি, যোগাযোগপত্র ও ভ্রমণ রেকর্ড বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মস্কো ইরানকে র‍্যামজেট ইঞ্জিনচালিত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। ‘সি-ফোর-থ্রি-জিরো-এল’ নামে একটি প্রকল্পকে ঘিরে এই সহযোগিতা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দাবি সত্য হলে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ফাঁস নথিতে গোপন প্রকল্পের তথ্য
২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম বিষয়টি সামনে আসে। ফাঁস হওয়া রুশ যোগাযোগপত্র, ভ্রমণ নথি ও সামরিক প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে প্রকল্পটির অস্তিত্বের দাবি করা হয়। পরে দ্য আইরিশ টাইমসসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচিটির সূচনা ২০২৩ সালে। লক্ষ্য ছিল ইরানকে এমন প্রযুক্তি দেওয়া, যার মাধ্যমে দেশটি র‍্যামজেট ইঞ্জিনচালিত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক সংস্থা রসোবোরোনএক্সপোর্ট প্রকল্পটির সমন্বয়ে যুক্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে।

ইরানে রুশ প্রকৌশলীদের সফর
ফাঁস হওয়া ভ্রমণ নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রুশ অস্ত্র কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা একাধিকবার ইরান সফর করেন। একই বছরের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রুশ পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ইরানের র‍্যামজেট প্রযুক্তি ও পরীক্ষামূলক উড্ডয়নসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে রুশ বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন বলে নথিতে ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ ইরানের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত তথ্য পাওয়ার পর রুশ বিশেষজ্ঞরা ওই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অস্ত্র বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজের মতে, দাবি সত্য হলে এটি হবে ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি অর্জন। কারণ, র‍্যামজেট প্রযুক্তি ক্ষেপণাস্ত্রকে দীর্ঘ সময় উচ্চগতিতে উড়তে সহায়তা করতে পারে।

কেন উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের
সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মূলত যুদ্ধজাহাজ ও স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে এমন অস্ত্র কার্যকরভাবে তৈরি ও মোতায়েন করতে পারলে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে বিমানবাহী রণতরী ও বড় যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা ইরানের প্রতিরোধ কৌশলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে ইরান এরই মধ্যে এই প্রযুক্তির ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে—এমন নিশ্চিত প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ঘনিষ্ঠ মস্কো-তেহরান
রাশিয়া-ইরানের সামরিক সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক রয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে। যুদ্ধ শুরুর পর মস্কো ও তেহরানের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে কথিত সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। একই সঙ্গে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়ছে।

আসল প্রশ্ন প্রকল্পটি কতদূর
ফাঁস নথিতে সহযোগিতার দাবি থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবে কতদূর এগিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান পূর্ণাঙ্গ সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে কি না, ‘সি-ফোর-থ্রি-জিরো-এল’ কর্মসূচি বর্তমানে সক্রিয় কি না—এসব প্রশ্নেরও নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। রাশিয়া ও ইরান অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি মন্তব্য করেনি।

তবে দাবি সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু মস্কো-তেহরানের সামরিক সহযোগিতার বড় নজির হবে না; মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতাতেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ, উচ্চগতির এই প্রযুক্তি ইরানের হাতে কার্যকরভাবে পৌঁছালে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হিসাব, বিশেষ করে উপসাগরীয় জলসীমায়, নতুন করে সাজাতে হতে পারে।

কালের আলো/এম/এএইচ

একটি গানও স্বৈরতন্ত্রের ভিত কাঁপাতে পারে: রিজভী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ণ
একটি গানও স্বৈরতন্ত্রের ভিত কাঁপাতে পারে: রিজভী

রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল করতে সাংস্কৃতিক কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, সাংস্কৃতিক শক্তি কখনো কখনো পরমাণু বোমার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে স্বৈরতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে ‘একজন নেতার কথা বলছি’ শীর্ষক নতুন গানের সিডির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
রিজভী বলেন, কোনো রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক বাহিনী ছাড়া চূড়ান্ত সফলতা পেতে পারে না। একটি গান বা গানের কয়েকটি চরণও সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঢেউ তুলতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাসেও সাংস্কৃতিক কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রসেনানী। তারা সুসংগঠিত না থাকলে কোনো আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে কয়েকজন শিল্পীর সমালোচনা করে রিজভী বলেন, শিল্পী হলেই কেউ মানবতাবাদী বা উদার মনের হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। ইতিহাসে স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিস্ট শক্তির সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকের সম্পৃক্ততার উদাহরণ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ যার মধ্যে রয়েছে, তিনিই প্রকৃত শিল্পী। অন্যথায় শিল্পীর পরিচয়ের আড়ালেও কেউ ফ্যাসিবাদের সহযোগীতে পরিণত হতে পারেন।
অনুষ্ঠানে জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক ইথুন বাবুর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, শাম্মী আক্তার এমপি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ জাসাসের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি