অর্থনীতির জন্য বড় চাপ বেকারত্ব
সাম্প্রতিক পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ বলছে, দেশে প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ বর্তমানে বেকার অবস্থায় রয়েছে। যদিও সামগ্রিক বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হয়, বাস্তবে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পরও অনেকেই উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে উচ্চশিক্ষিত একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মহীন থাকছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরুণ। তবে এই জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে তা উল্টো বোঝায় পরিণত হতে পারে। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এছাড়াও প্রায় ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করছে। তরুণদের একটি অংশ আবার শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ—এই তিন ক্ষেত্রের বাইরেই অবস্থান করছে। এই শ্রেণির সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেটা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘যুবসমাজের সম্ভাবনা কাজে লাগানো: বাংলাদেশে যুব উন্নয়নের জন্য নীতিমালা কাঠামো’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জিইডি বলেছে, দেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৩ কোটি ১৬ লাখ তরুণ রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে, আবার অপরদিকে যথাযথ সুযোগ না পেলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে মোট তরুণ বেকারত্বের হার আপাতদৃষ্টিতে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ হলেও শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা একটি গুরুতর সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষায় একটি স্বাধীন মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে সমন্বয় করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া মাদকাসক্তি মোকাবিলায় শাস্তিমূলক পদ্ধতির পরিবর্তে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে পর্তুগালের নীতি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জিইডি সতর্ক করছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন আন্দোলন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো, তরুণদের হতাশা ও সুযোগের অভাবের ইঙ্গিত দেয়। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগ না হলে বাংলাদেশ তার জনমিতিক সুবিধার সুযোগ হারাতে পারে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোক্তা তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা তরুণরা পাচ্ছে না। ফলে তারা নিজেরাও উদ্যোগ নিতে পারছে না। এর ফল হিসেবে একদিকে হতাশা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক তরুণ মাদকাসক্তি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
কালের আলো/এম/এএইচ


নিজস্ব প্রতিবেদক
আপনার মতামত লিখুন
Array