খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর: সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত

সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর: সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে আঞ্চলিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চীন সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী কোন দেশ সফর করবেন, সেই সিদ্ধান্ত কি অন্য কোনো দেশের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা উচিত, নাকি বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্র পরিচালনা, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অগ্রাধিকার ঠিক করার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের জনগণ ও তাদের নির্বাচিত সরকারের। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর কোথায় হবে, সেটি মূলত বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনার বিষয়। এটি অন্য কোনো দেশের অনুমোদন, প্রত্যাশা বা অস্বস্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা নয়।

অনেক সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন বাংলাদেশকে অবশ্যই ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থানকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না। বাংলাদেশ কোনো ভূরাজনৈতিক দাবার গুটি নয়; বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি, যার নিজস্ব উন্নয়ন লক্ষ্য, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক কৌশল রয়েছে। ফলে ঢাকার সিদ্ধান্তকে সব সময় অন্যের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা বাস্তবতাকে সরলীকৃত করে ফেলে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। বৈশ্বিক বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় সব বড় রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয় স্বার্থে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দিল্লি ও বেইজিং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। ইউরোপের নেতারাও নিয়মিত চীন সফর করেন।

তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে সেটিকে অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখার কারণ কোথায়? বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের একটি বড় অংশীদার। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মতো বিষয়ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যদি কোনো আন্তর্জাতিক অংশীদার বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি বা প্রকৌশল সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়, তাহলে সেই সুযোগ বিবেচনা করা স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। কোনো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা মানেই তা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ, নদী ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পানি সম্পদ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে এগিয়ে যায়, তাহলে সেই প্রকল্পের মূল্যায়নও হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

একই সঙ্গে এটাও সত্য যে ভারত বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভৌগোলিক বাস্তবতা, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে ভারতকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। গত কয়েক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা—এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যই হচ্ছে ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পথ এড়িয়ে চলেছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। বরং বহুমুখী অংশীদারিত্ব এখন আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপকে ভারত-চীন প্রতিযোগিতার লেন্স দিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে যে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে—বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—সেগুলোর সমাধান কোনো একক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। এজন্য বহুমাত্রিক ও বাস্তববাদী কূটনীতি প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরকে তাই কেবল প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে না দেখে এর অর্থনৈতিক, উন্নয়নমূলক এবং কূটনৈতিক তাৎপর্য বিবেচনা করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হবে। একটি দেশের সরকারপ্রধান কোথায় সফর করবেন, সেটি শেষ পর্যন্ত সেই দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার, সময়োপযোগী প্রয়োজন এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। বাইরের বিশ্লেষণ থাকতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের মালিক বাংলাদেশই। বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি প্রত্যাশা করে, যা কারও পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখবে। বন্ধু থাকবে অনেক, অংশীদার থাকবে বিভিন্ন দেশ, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে ঢাকার; অন্য কোনো রাজধানীর নয়। এটাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর চীন, ভারত বা অন্য যে কোনো দেশেই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—সেই সফর বাংলাদেশের জন্য কী অর্জন বয়ে আনবে। কারণ পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য সফরের গন্তব্যে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতায় নিহিত। আর সেই জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের রাষ্ট্রেরই।

লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা, থাকবে কিউআর কোড

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৮ অপরাহ্ণ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা, থাকবে কিউআর কোড

সারা দেশে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইককে নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। নীতিমালার আওতায় এসব যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণের পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্তের ব্যবস্থা করা হবে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান।

সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যানবাহনের অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট, বিদ্যুৎ ব্যবহার, অনিরাপদ ব্যাটারি এবং অদক্ষ চালকের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তায় নানা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তবে এসব যানবাহনের সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত থাকায় এগুলোকে ঢালাওভাবে উচ্ছেদ না করে নীতিমালার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নতুন নীতিমালায় অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করা হবে। মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল করতে পারবে না। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহারের শর্তও থাকবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে একটি নিবন্ধন বা নম্বর ব্যবহার করে একাধিক যানবাহন চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধে প্রতিটি অটোরিকশাকে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে।

বিদ্যুৎ চুরি রোধে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধেও নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআইভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দখলমুক্ত করার আশ্বাস নৌমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দখলমুক্ত করার আশ্বাস নৌমন্ত্রীর

চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব জায়গা বিগত সরকারের সময়ে অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল, সেসব লিজ বাতিল করে আগামী দুই মাসের মধ্যে বন্দর এলাকার সব জায়গা দখলমুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশ্বাস দেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি অবৈধ লিজ বাতিল করা হয়েছে এবং দুটি জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একটি জায়গা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় সেটি উদ্ধারে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কিছু জায়গার মালিকানা নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে, তা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে আগামী দুই মাসের মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কার্যক্রম তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বন্দরে জাহাজকে এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। বর্তমানে ‘জিরো আওয়ার’ ওয়েটিং টাইমে জাহাজ পরিচালনা এবং প্রায় দুই দিনের মধ্যে পণ্য লোড-আনলোডের কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে।

তিনি জানান, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি লালদিয়ায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ‘গ্রিন টার্মিনাল’ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া গত ছয় মাসে মোংলা বন্দরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে বলেও সংসদকে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

এম মহাসিন মিয়া:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে বিভীষিকাময় এক জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই ভূখণ্ডের একটি বিশেষ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আজও শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত গানপাউডার আর বারুদের গন্ধ শুঁকে দিনাতিপাত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দিয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে জিম্মি করে রাখার অপকৌশল। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যুগে যুগে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থান, অপতৎপরতা এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েমের অশুভ আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব লাভ করেনি পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল বহাল থাকবে, তা আজ গোটা জাতির কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।

‎পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।

‎পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝর্ণা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝর্ণার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝঙ্কার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।

‎সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।

‎পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানসিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।

‎গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।

‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝর্ণা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

‎স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।

‎সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হলে সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আজ সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা, সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-অস্ত্র ব্যবসা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ যুবসমাজকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রলোভন ও ভয়ভীতি থেকে মুক্ত করে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ ও সংবিধান, কোনো অবৈধ অস্ত্রের নলের মুখ নয়। সরকারের সমউপযোগী, কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে সশস্ত্র সহিংসতার কালো ছায়া দূর করে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং পাহাড়িদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

‎লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
‎ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com