প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর: সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে আঞ্চলিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চীন সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী কোন দেশ সফর করবেন, সেই সিদ্ধান্ত কি অন্য কোনো দেশের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা উচিত, নাকি বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্র পরিচালনা, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অগ্রাধিকার ঠিক করার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের জনগণ ও তাদের নির্বাচিত সরকারের। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর কোথায় হবে, সেটি মূলত বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনার বিষয়। এটি অন্য কোনো দেশের অনুমোদন, প্রত্যাশা বা অস্বস্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা নয়।
অনেক সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন বাংলাদেশকে অবশ্যই ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থানকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না। বাংলাদেশ কোনো ভূরাজনৈতিক দাবার গুটি নয়; বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি, যার নিজস্ব উন্নয়ন লক্ষ্য, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক কৌশল রয়েছে। ফলে ঢাকার সিদ্ধান্তকে সব সময় অন্যের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা বাস্তবতাকে সরলীকৃত করে ফেলে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। বৈশ্বিক বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় সব বড় রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয় স্বার্থে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দিল্লি ও বেইজিং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। ইউরোপের নেতারাও নিয়মিত চীন সফর করেন।
তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে সেটিকে অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখার কারণ কোথায়? বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের একটি বড় অংশীদার। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মতো বিষয়ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যদি কোনো আন্তর্জাতিক অংশীদার বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি বা প্রকৌশল সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়, তাহলে সেই সুযোগ বিবেচনা করা স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। কোনো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা মানেই তা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ, নদী ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পানি সম্পদ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে এগিয়ে যায়, তাহলে সেই প্রকল্পের মূল্যায়নও হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
একই সঙ্গে এটাও সত্য যে ভারত বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভৌগোলিক বাস্তবতা, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে ভারতকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। গত কয়েক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা—এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যই হচ্ছে ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পথ এড়িয়ে চলেছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। বরং বহুমুখী অংশীদারিত্ব এখন আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপকে ভারত-চীন প্রতিযোগিতার লেন্স দিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে যে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে—বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—সেগুলোর সমাধান কোনো একক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। এজন্য বহুমাত্রিক ও বাস্তববাদী কূটনীতি প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরকে তাই কেবল প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে না দেখে এর অর্থনৈতিক, উন্নয়নমূলক এবং কূটনৈতিক তাৎপর্য বিবেচনা করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হবে। একটি দেশের সরকারপ্রধান কোথায় সফর করবেন, সেটি শেষ পর্যন্ত সেই দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার, সময়োপযোগী প্রয়োজন এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। বাইরের বিশ্লেষণ থাকতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের মালিক বাংলাদেশই। বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি প্রত্যাশা করে, যা কারও পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখবে। বন্ধু থাকবে অনেক, অংশীদার থাকবে বিভিন্ন দেশ, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে ঢাকার; অন্য কোনো রাজধানীর নয়। এটাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর চীন, ভারত বা অন্য যে কোনো দেশেই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—সেই সফর বাংলাদেশের জন্য কী অর্জন বয়ে আনবে। কারণ পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য সফরের গন্তব্যে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতায় নিহিত। আর সেই জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের রাষ্ট্রেরই।
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


আপনার মতামত লিখুন
Array