খুঁজুন
                               
, ,
           

দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১০:১৭ অপরাহ্ণ
দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী

ক্ষমতার রাজনীতিতে বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক সময় নীতি ও আদর্শকে ছাপিয়ে যায়। ইতিহাস বলে, অধিকাংশ সরকারই বিরোধী দলের আক্রমণে নয়, বরং নিজেদের ভেতরের সীমাহীন সুবিধাবাদ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহিহীনতার কারণে জনসমর্থন হারায়। সেই বাস্তবতায় বগুড়ার ইউনিয়ন নামকরণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরকারের ভেতরে ও বাইরে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটি হলো—রাষ্ট্র ব্যক্তির চেয়ে বড়, প্রতিষ্ঠান পরিবারের চেয়ে বড় এবং জনগণের স্বার্থ বন্ধুত্বের চেয়েও বড়।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই বার্তারই একটি বাস্তব পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল। কারণ বিষয়টি শুধুমাত্র কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা, পরিবারতন্ত্র, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার ব্যবহার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

যখন একটি ইউনিয়নের নাম প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নামে, দুটি ইউনিয়নের নাম তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে এবং আরেকটি ইউনিয়নের নাম তাঁর ভাতিজির ডাকনামের সঙ্গে মিলে যায়, তখন জনগণের মধ্যে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রে প্রশ্নকে দমন করা যায়, কিন্তু উপেক্ষা করা যায় না।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিষয়টিকে “মিরাকল” বা অলৌকিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কখনো অলৌকিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আইন, নীতি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিতে। জনগণ কাকতালীয় ব্যাখ্যা শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া।

এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যখন বিতর্কিত ইউনিয়নগুলোর নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন, তখন তিনি কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল সংশোধন করেননি; তিনি একটি রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে সরকারের ভাবমূর্তি, জনগণের আস্থা এবং রাষ্ট্রের মর্যাদা কোনো ব্যক্তির চেয়ে বড়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। সাধারণত ক্ষমতার কেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা নানা বিতর্কে জড়িয়েও প্রভাবের বলয়ে সুরক্ষিত থাকেন। কিন্তু তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। এটি এমন একটি বার্তা, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা দৃশ্যমান।

দীর্ঘ দেড় দশকের নির্বাসন জীবনে তারেক রহমান বারবার একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, “I Have A Plan”। তখন অনেকে এটিকে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, তিনি অন্তত একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।

শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক আচরণ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি পরিবর্তনের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ, বক্তব্য এবং সিদ্ধান্তে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, তাঁর চারপাশের সবাই সেই দর্শন ধারণ করতে পারছেন না।

সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি এমন সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন, যা শুধু তাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; পুরো সরকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ব্যক্তিস্বার্থ, পরিবারতন্ত্র, প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সুবিধাবাদী রাজনীতির সংস্কৃতি যেন এখনো কিছু মানুষের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান।

মীর শাহে আলমকে ঘিরে বিতর্কও কেবল ইউনিয়নের নামকরণে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্প বরাদ্দ, পরিবারের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা, স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনাগুলোও জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আইন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য অভিযোগের অস্তিত্বই একটি বড় বিষয়। কারণ রাজনীতিতে শুধু সৎ হওয়াই যথেষ্ট নয়; জনগণের কাছে সৎ হিসেবে প্রতীয়মান হওয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে “Conflict of Interest” বা স্বার্থের সংঘাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কারণ ক্ষমতার অবস্থানে থাকা ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা যদি একই ক্ষমতার কাঠামো থেকে সুবিধা পান, তাহলে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়। সেই সন্দেহ দূর করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা এবং চাপ সৃষ্টির অভিযোগ। সংবাদমাধ্যম কোনো সরকারের শত্রু নয়। বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমই রাষ্ট্র ও সমাজের আয়না। সেই আয়নায় যদি কোনো ত্রুটি প্রতিফলিত হয়, তাহলে আয়না ভাঙার চেষ্টা নয়; ত্রুটি সংশোধনের উদ্যোগই হওয়া উচিত রাষ্ট্রনায়কের কাজ।

এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একা কতদিন এই বোঝা বহন করবেন? সরকারের যাত্রার শুরুতেই যদি কিছু মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো সরকারকেই দিতে হবে। কারণ জনগণ পৃথক কোনো মন্ত্রীকে নয়; পুরো সরকারকেই মূল্যায়ন করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। তারেক রহমান শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন। জনগণের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক পুঁজি অনেক বড় সম্পদ। সেই সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অধিকার কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের নেই।

বিএনপির ভেতরে সৎ, আদর্শবান, ত্যাগী এবং জনমুখী নেতৃত্বের অভাব নেই। সরকার পরিচালনার জন্য অসংখ্য যোগ্য মানুষ রয়েছেন। তাহলে কেন কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির কারণে পুরো সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হবে? কেন একজন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে অন্যের ভুলের বোঝা টেনে নিয়ে যেতে হবে?

সুতরাং আজ সময় এসেছে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, যারা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থের ওপরে স্থান দেন, যারা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেন—তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে যারা সততা, দক্ষতা এবং জনকল্যাণের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে যদি কোনো সিন্ডিকেট, সুবিধাভোগী চক্র কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়ে থাকে, যারা নিয়োগ, বদলি, ব্যবসায়িক সুবিধা অথবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করছে, তাহলে সেই চক্র ভেঙে দিতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো গণতান্ত্রিক সরকার বিরোধী দলের কারণে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজেদের ভেতরের সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কারণে। এর আগেও বহুবার আমি এ কথা বলেছি।

তারেক রহমানের সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত জনগণ। কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো গোষ্ঠী নয়, কোনো সিন্ডিকেট নয়। জনগণের আস্থা হারালে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না। আবার জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারলে সবচেয়ে কঠিন সংকটও মোকাবিলা করা সম্ভব।

মীর শাহে আলম ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কিন্তু একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট নয়। সরকারের ভেতরে যদি সত্যিই কোনো সুবিধাভোগী চক্র, পরিবারতান্ত্রিক প্রবণতা, দুর্নীতি, প্রভাব-বাণিজ্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে থাকে, তাহলে সেগুলোর বিরুদ্ধেও একই কঠোরতা দেখাতে হবে। কারণ একজন প্রধানমন্ত্রী একা একটি রাষ্ট্রকে বদলে দিতে পারেন না। তাঁকে সহায়তা করার জন্য দরকার সৎ, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং জনস্বার্থে নিবেদিত একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো।

তারেক রহমান যদি সত্যিই তাঁর ঘোষিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে তাঁকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কি কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বোঝা বহন করবেন, নাকি জনগণের আস্থাকে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করবেন?

সকলেরই একটি সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করা উচিত যে, ইতিহাসের আদালতে শেষ পর্যন্ত কোনো মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা সিন্ডিকেটের বিচার হয় না; বিচার হয় সরকারের, বিচার হয় নেতৃত্বের।

আজকের বাংলাদেশে জনগণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সচেতন, বেশি তথ্যসমৃদ্ধ এবং বেশি প্রত্যাশাপূর্ণ। তারা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় রাজনৈতিক সততা। তারা শুধু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি চায় না; তারা পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ চায়। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণ, সবচেয়ে বড় বিচারক জনগণ, আর সবচেয়ে বড় ভরসাও জনগণ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা, থাকবে কিউআর কোড

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৮ অপরাহ্ণ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা, থাকবে কিউআর কোড

সারা দেশে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইককে নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। নীতিমালার আওতায় এসব যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণের পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্তের ব্যবস্থা করা হবে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান।

সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যানবাহনের অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট, বিদ্যুৎ ব্যবহার, অনিরাপদ ব্যাটারি এবং অদক্ষ চালকের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তায় নানা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তবে এসব যানবাহনের সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত থাকায় এগুলোকে ঢালাওভাবে উচ্ছেদ না করে নীতিমালার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নতুন নীতিমালায় অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করা হবে। মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল করতে পারবে না। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহারের শর্তও থাকবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে একটি নিবন্ধন বা নম্বর ব্যবহার করে একাধিক যানবাহন চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধে প্রতিটি অটোরিকশাকে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে।

বিদ্যুৎ চুরি রোধে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধেও নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআইভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দখলমুক্ত করার আশ্বাস নৌমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দখলমুক্ত করার আশ্বাস নৌমন্ত্রীর

চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব জায়গা বিগত সরকারের সময়ে অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল, সেসব লিজ বাতিল করে আগামী দুই মাসের মধ্যে বন্দর এলাকার সব জায়গা দখলমুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশ্বাস দেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি অবৈধ লিজ বাতিল করা হয়েছে এবং দুটি জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একটি জায়গা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় সেটি উদ্ধারে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কিছু জায়গার মালিকানা নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে, তা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে আগামী দুই মাসের মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কার্যক্রম তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বন্দরে জাহাজকে এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। বর্তমানে ‘জিরো আওয়ার’ ওয়েটিং টাইমে জাহাজ পরিচালনা এবং প্রায় দুই দিনের মধ্যে পণ্য লোড-আনলোডের কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে।

তিনি জানান, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি লালদিয়ায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ‘গ্রিন টার্মিনাল’ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া গত ছয় মাসে মোংলা বন্দরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে বলেও সংসদকে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

এম মহাসিন মিয়া:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে বিভীষিকাময় এক জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই ভূখণ্ডের একটি বিশেষ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আজও শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত গানপাউডার আর বারুদের গন্ধ শুঁকে দিনাতিপাত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দিয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে জিম্মি করে রাখার অপকৌশল। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যুগে যুগে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থান, অপতৎপরতা এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েমের অশুভ আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব লাভ করেনি পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল বহাল থাকবে, তা আজ গোটা জাতির কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।

‎পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।

‎পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝর্ণা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝর্ণার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝঙ্কার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।

‎সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।

‎পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানসিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।

‎গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।

‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝর্ণা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

‎স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।

‎সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হলে সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আজ সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা, সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-অস্ত্র ব্যবসা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ যুবসমাজকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রলোভন ও ভয়ভীতি থেকে মুক্ত করে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ ও সংবিধান, কোনো অবৈধ অস্ত্রের নলের মুখ নয়। সরকারের সমউপযোগী, কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে সশস্ত্র সহিংসতার কালো ছায়া দূর করে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং পাহাড়িদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

‎লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
‎ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com