সীমান্তে বিএসএফের বাড়াবাড়ি প্রশ্নের মুখে ভারতীয় নীতি
সীমান্ত একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা মাত্র নয়; এটি তার সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা এবং নিরাপত্তার সুস্পষ্ট প্রতীক। এ কারণেই কোনো দেশের সীমান্তে অন্য দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর একতরফা পদক্ষেপ শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং পারস্পরিক কূটনৈতিক আচরণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। ফলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ কার্যক্রম নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিছক একটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয় নয়; এটি দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃতি এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যখন অভিযোগ উঠছে যে যথাযথ যাচাই-বাছাই, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রত্যাবাসনের স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কিছু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে—এ ধরনের কর্মকাণ্ড আদৌ কি বিধিসম্মত?
আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি হলো, কোনো রাষ্ট্র অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর একতরফাভাবে তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হন, তবে তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আর যদি তিনি বাংলাদেশের নাগরিক না হন, তাহলে তাকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কাজেই ‘পুশইন’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতি আইনগতভাবে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভারত সব সময়ই নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে। আন্তর্জাতিক ফোরামে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবিও করে। কিন্তু সীমান্তে বারবার যে আচরণ দেখা যায়, তা সেই ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বহু বছর ধরেই নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সীমান্ত হত্যা, গুলি চালানো, নাগরিক হয়রানি, কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে বিরোধ, পানি বণ্টন সংকট—এসবের সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে পুশইনের অভিযোগ। প্রশ্ন হচ্ছে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দাবিদার একটি রাষ্ট্রের সীমান্ত আচরণ কেন বারবার বিতর্কের জন্ম দেয়?
এখানে একটি সত্য আমাকে স্বীকার করতেই হবে। ভারতের সঙ্গে যেসব দেশের সীমান্ত রয়েছে, বিশেষ করে যেসব দেশের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এমন একতরফা আচরণ খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায়ই এমন মনোভাব লক্ষ্য করা যায়, যেন ঢাকা নয়াদিল্লির সমমর্যাদার অংশীদার নয়, বরং নির্দেশ গ্রহণকারী কোনো অধস্তন পক্ষ। ভারতের এই মানসিকতাই সমস্যার মূল।
বাংলাদেশ কোনো করদ রাজ্য নয়, কোনো প্রটেক্টরেট নয়, কোনো প্রভাব বলয়ের উপনিবেশও নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। ফলে সীমান্তে যে কোনো কর্মকাণ্ড পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সময়কালও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে নতুন কিছু বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। তিস্তা প্রকল্প, পানি ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং পদ্মা ব্যারাজের মতো বৃহৎ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এসব উন্নয়ন স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
এখানে সরাসরি কোনো কারণ-ফল সম্পর্কের দাবি করা কঠিন। তবে এটাও সত্য যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাপ প্রয়োগের ভাষা সব সময় প্রকাশ্য হয় না। অনেক সময় সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি কিংবা নিরাপত্তা ইস্যুকেও কৌশলগত বার্তা দেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
তবে যে কারণই থাকুক না কেন, সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে কোনো ইতিবাচক বার্তা দেওয়া যায় না। বরং এতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বন্ধুত্বের কথা বললেও সীমান্তের বাস্তবতা তখন সেই বক্তব্যকে দুর্বল করে দেয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে অনেক সময় ভারতের পক্ষ থেকে এমন আচরণ দেখা যায়, যেন বাংলাদেশ প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মেনে নেবে। এই ধারণা শুধু ভুল নয়, বিপজ্জনকও। কারণ মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন নীরব থাকতে পারে না। ভারতের এই সত্য উপলব্ধি করা একান্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশের জনগণ ভারতের শত্রু নয়। বাংলাদেশের জনগণ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বিশ্বাস করে। কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো একতরফা হতে পারে না। বন্ধুত্বের নামে যদি সীমান্তে গুলি চলে, মানুষ মারা যায়, কিংবা কথিত পুশইনের মাধ্যমে অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হতে বাধ্য।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো রাষ্ট্রের শক্তিমত্তার প্রকৃত পরিচয় প্রতিবেশীর ওপর প্রভাব খাটানোর মধ্যে নয়; বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনার মধ্যেই নিহিত। ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে আচরণের ধরন পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশেরও উচিত এই বিষয়ে আরও দৃঢ়, সুস্পষ্ট এবং নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা। সীমান্তে কোনো ধরনের অবৈধ পুশইন, একতরফা সিদ্ধান্ত কিংবা আন্তর্জাতিক আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। কারণ আজ যদি সীমান্তে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করা হয়, কাল সেটি আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে।
পুশইনের অভিযোগ তাই কেবল সীমান্তের একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সত্যিই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সীমান্তে বারবার এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি কেন ঘটছে?
একটি বিষয় পরিষ্কার—বন্ধুত্ব কখনো শক্তির প্রদর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বন্ধুত্ব দাঁড়িয়ে থাকে সম্মান, আস্থা এবং পারস্পরিক মর্যাদাবোধের ওপর। সীমান্তে একতরফা পদক্ষেপ, কথিত পুশইন, সীমান্ত হত্যা কিংবা আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে পরিচালিত কর্মকাণ্ড সেই আস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করা উচিত যে, আজকের বাংলাদেশ আর কোনো দুর্বল বা নীরব রাষ্ট্র নয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের কারণে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা না করে যদি এখনো পুরোনো আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকে সীমান্ত ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনার চেষ্টা করা হয়, তবে সেটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে।
বাংলাদেশের জনগণ কখনো ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু তারা নিজেদের রাষ্ট্রের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে আপস করতেও প্রস্তুত নয়। সীমান্তে প্রতিটি গুলি, প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি পুশইন অভিযোগ এবং প্রতিটি একতরফা পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে—ভারত কি সত্যিই বাংলাদেশকে সমমর্যাদার বন্ধু হিসেবে দেখে, নাকি কেবল একটি কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কূটনৈতিক বিবৃতিতে নয়, সীমান্তের বাস্তব আচরণেই নিহিত।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, তবে সেই সম্পর্ক অবশ্যই সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে হতে হবে। বন্ধুত্বের নামে আধিপত্য কিংবা সহযোগিতার আড়ালে একতরফা চাপ গ্রহণযোগ্য নয়। নয়াদিল্লি যত দ্রুত এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করবে, ততই দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।


আপনার মতামত লিখুন
Array