খুঁজুন
                               
, ,
           

বরিশালের দুর্গম জঙ্গলের সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:০৭ অপরাহ্ণ
বরিশালের দুর্গম জঙ্গলের সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী

পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমীকরণ, হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছদ্মযুদ্ধ এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণের এই যুগে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের অপরিহার্য শর্ত। সোমবার বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার পূর্ব রহমতপুর ৪১ বীর এক্সারসাইজ এরিয়ায়

অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর বিশেষ মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতি এবং দুর্গম জঙ্গলজুড়ে সেনাসদস্যদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ কেবল একটি রুটিন পরিদর্শন ছিল না; এটি ছিল দেশের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং জনগণের সাথে সেনাবাহিনীর আত্মিক বন্ধনের এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বার্তা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব আজ শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রীর এই মহড়া পরিদর্শন এবং সেখানে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

মহড়া চলাকালে তিনি জঙ্গলজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল, অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনাসদস্যদের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

যুদ্ধক্ষেত্র সব সময় সমতল ভূমিতে হয় না। পাহাড়, জঙ্গল, নদী কিংবা জলাভূমি—প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন কৌশল। তাই আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিবেশের অনুকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবুগঞ্জের বিস্তীর্ণ জঙ্গলজুড়ে সেনাসদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, গোপন চলাচল, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, কৌশলগত অগ্রসর হওয়া এবং শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার বিভিন্ন অনুশীলন প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে মহড়ার বিভিন্ন ধাপ এবং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির উপযোগী প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেবল শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিবেশে মানসিক দৃঢ়তাও গড়ে তোলে।

বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ছোট আকারের চালকবিহীন উড়োজাহাজ গোয়েন্দা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টি-ড্রোন মাল্টি-ব্যারেল সিস্টেমের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। সেনা কর্মকর্তারা তাঁকে এই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করেন।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন সেই প্রতিরক্ষাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের যুগে এমন সক্ষমতা একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে।

সামরিক ইতিহাসে একটি বিষয় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে—নেতৃত্বের শক্তি শুধু নির্দেশনায় নয়, উপস্থিতিতেও নিহিত থাকে। মহড়া চলাকালে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গলের ভেতরে কর্মরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করেন। পরে তিনি তাঁদের সঙ্গে মাটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশে প্রস্তুত করা সাধারণ খাবার গ্রহণ করেন। কৌটার মধ্যে মোম জ্বালিয়ে তৈরি আগুনে রান্না করা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, চিংড়ি মাছ ও ডিমের তরকারি গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কাছ থেকে অনুভব করেন।

এ ধরনের প্রতীকী উপস্থিতি নেতৃত্ব ও সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে। একজন রাষ্ট্রনেতা যখন মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশকে সম্মান জানান, তখন সেটি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মহড়া পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, তিনি একটি সেনা পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। তাই সেনাসদস্যদের কাছে এলে তাঁর শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে এবং তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর বক্তব্যকে মানবিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নেতৃত্বের আবেগগত সংযোগেরও প্রতিফলন।

সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু আধুনিক অস্ত্র কিংবা উন্নত প্রযুক্তিতে নয়; জনগণের বিশ্বাসেও নিহিত থাকে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সংকট মোকাবিলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি বারবার পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেনাসদস্যদের শৃঙ্খলা, দক্ষতা, আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশের মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উদ্ধার অভিযান, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে বাহিনীটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে। এই আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সুনাম, মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন করবে। তিনি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ—সবকিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে থাকা দেশের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, বরিশালের বাবুগঞ্জের জঙ্গল থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তাটি দিলেন, তা একাধারে দেশপ্রেমের, আধুনিকায়নের এবং আত্মবিশ্বাসের। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলীয়ান একটি সেনাবাহিনীই পারে একটি স্বাধীন দেশের পতাকাকে চিরকাল সমুন্নত রাখতে। মাঠপর্যায়ের সৈনিকদের সাথে মাটিতে বসে খাবার খাওয়া যেমন নেতৃত্বের মানবিক ও অনন্য উচ্চতাকে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের কার্যকারিতা পরিদর্শন রাষ্ট্রের কৌশলগত কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে।

পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আগামী দিনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলবে—বাবুগঞ্জের এই মহড়া সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক মূর্ত প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন। একই অনুষ্ঠানে আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যানেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন তিনি। উদ্বোধন শেষে স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানের পাশে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভে ৮৩৪ শহীদের নাম

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভটির বাইরের দিকে রয়েছে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য। ভেতরের দিকে রয়েছে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু আরেকটি রিলিফ ভাস্কর্য।

এসব ভাস্কর্যে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন অধ্যায় স্থান পেয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটির মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।

আধুনিকায়নে নতুন রূপ পেল ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি উদ্বোধন করা হয়েছে রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রকল্প। উদ্যানটিকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ করে নতুন বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে এবং তৈরি করা হয়েছে সবুজ দ্বীপ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যানটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা

আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যানে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা এবং জলাশয়ের ঘাট। উদ্যানটিতে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটির সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে রয়েছে দ্রুত চলাচলের পথ। নতুন অবকাঠামো ও সবুজায়নের মাধ্যমে ওসমানী উদ্যানকে নগরবাসীর বিনোদন, হাঁটাচলা ও শরীরচর্চার উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়নের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও রাজধানীর নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে। একটি প্রকল্পে শহীদদের নাম ও বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অন্যটিতে নাগরিকদের জন্য সবুজ ও আধুনিক উন্মুক্ত পরিসর গড়ে তোলা হয়েছে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

সীমান্তের গেট বন্ধ, খাদ্যসংকটে ১৫০ হাতি—বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

শেরপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ণ
সীমান্তের গেট বন্ধ, খাদ্যসংকটে ১৫০ হাতি—বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

ভারতের মেঘালয় থেকে আসা প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি দুই বছর ধরে নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারছে না। শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড় এলাকায় বিচরণ করা হাতিগুলোর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় থাকা গেট বন্ধ থাকায়। এতে হাতির খাদ্যসংকট বাড়ার পাশাপাশি কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ক্ষতি এবং মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হাতিগুলো কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। এসব দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয় ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে ফসল নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় থেকে ১০ থেকে ১৫টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরে বংশবিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫০টিতে পৌঁছেছে। একসময় হাতির দল নিয়মিত বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচল করত। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে শেরপুর ও জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। হাতির চলাচল সহজ রাখতে সেখানে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতিগুলো আগের মতো সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ফিরতে পারছে না বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। হাতির আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে তারা খাদ্যের সন্ধানে কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে একদিকে কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হাতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার কৃষক যোসেফ মারাক বলেন, এমন কোনো বছর নেই, যে বছর হাতি এসে ফসলের ক্ষতি করে না। বছরের পর বছর ফসল নষ্ট হওয়ায় ঠিকমতো ঘরে ধান তুলতে পারেন না তাঁরা। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল হাতি নষ্ট করে দেওয়ায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। একই এলাকার কৃষানি আশালতা বলেন, ধান পাকার সময় এলেই হাতির আতঙ্ক বাড়ে। কখন হাতির পাল এসে জমির ফসল নষ্ট করে, সেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ফসল রক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সব ফসল বাঁচানো সম্ভব হয় না।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে মানুষ-হাতির সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতির সঙ্গে সংঘাতে ১০ জন মানুষ ও চারটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে। এ পরিসংখ্যান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানুষ ও বন্যহাতির সহাবস্থান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। হাতির দল লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হাতিরও প্রাণহানি ঘটে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যার জন্য শুধু লোকালয়ে হাতির প্রবেশকে দায়ী করলে মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে। হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং মানুষের কৃষি ও বসতি সম্প্রসারণ—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়তে পারে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে তাঁর মত। বন্যহাতি পরিযায়ী প্রাণী। তাদের চলাচলের পথ এক দেশের সীমান্তে আটকে গেলে আবাসস্থল, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের সংযোগ বজায় রাখা এবং হাতির চলাচলের উপযোগী পথ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১০ অক্টোবর শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসন ও বন্যহাতি সংরক্ষণবিষয়ক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হবে। হাতির চলাচল সহজ করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া শেরপুরের বনাঞ্চলকে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যহাতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। গারো পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যহাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তের গেট খোলার বিষয়ে দুই দেশের সমন্বয়, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার মতো উদ্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

খুন-ধর্ষণ-নারী নির্যাতনে উদ্বেগ, কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ প্রাণহানি

কুমিল্লা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ণ
খুন-ধর্ষণ-নারী নির্যাতনে উদ্বেগ, কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ প্রাণহানি

কুমিল্লায় খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ও স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সম্প্রতি সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় জেলাজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে কুমিল্লায় ১১১টি খুন ও ১৩৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৩২টি।

জেলার ১৮টি থানার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নয় মাসে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে মোট চার হাজার ৯৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অপহরণের ১৪টি ও ডাকাতির ৩৬টি ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া দাঙ্গা, দস্যুতা, চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। পুলিশের দাবি, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে তারা সক্ষম হয়েছে। তবে ধারাবাহিক অপরাধের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে অপরাধের চিত্র

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে কুমিল্লায় ১৪টি খুন, ১৬টি ধর্ষণ ও ১৭টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৪৯১টি অপরাধের মামলা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ১২টি খুন, ৮টি ধর্ষণ ও ১৯টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মামলা হয় ৪০৭টি।

মার্চে ১১টি খুন, ৯টি ধর্ষণ ও ১৮টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট মামলার সংখ্যা ছিল ৫১৭। এপ্রিলে ১০টি খুন, ২০টি ধর্ষণ ও ২৮টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মামলা হয় ৫৮৪টি। মে মাসে খুনের সংখ্যা বেড়ে ১৭টিতে দাঁড়ায়, যা উল্লেখিত মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ মাসে ১২টি ধর্ষণ ও ২৪টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৬১২টি অপরাধের মামলা হয়। জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৪১টি, যা ওই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ মাসে ১০টি খুন ও ২১টি ধর্ষণের ঘটনাসহ মামলা হয় ৫৭৭টি।

জুলাইয়ে ১০টি খুন, ২২টি ধর্ষণ ও ৩০টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৫০৯টি মামলা হয়। আগস্টে ১১টি খুন, ১৭টি ধর্ষণ ও ২১টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মামলা হয় ৫৮৫টি। সেপ্টেম্বর মাসে খুনের সংখ্যা বেড়ে ১৬টিতে দাঁড়ায়। এ মাসে ১৪টি ধর্ষণ ও ৩৪টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৬৮১টি অপরাধের মামলা নথিভুক্ত হয়।

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা

এপ্রিল মাসের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা। ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে এসে কুমিল্লার ঝাগুরঝুলি এলাকায় মহাসড়কে নামার পর তিনি ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন এবং নিহত হন। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সোহাগ, এমরান, রাহাত ও সুজন নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

আইফোনের জন্য স্কুলছাত্র অপ্রতিমকে হত্যা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের বরাতে জানা যায়, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। একটি মুঠোফোনের জন্য স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনা কিশোর অপরাধ, অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ

সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি ঘটে অক্টোবরে। গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বের হয় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। এরপর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনাটি শিশু-কিশোরীদের নিরাপত্তা এবং যৌন সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে।

দেবিদ্বারে বৃদ্ধা হত্যার পর মরদেহ টুকরো করার ঘটনা

গত ৭ আগস্ট রাতে দেবিদ্বার উপজেলা সদরে ফরিদা ইয়াসমিন নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরদিন পাশের একটি ডোবা থেকে পলিথিনে মোড়ানো মরদেহের খণ্ডগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তার ও তাঁর সহযোগী আমির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডও জেলার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

‘শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, কিশোর অপরাধসহ সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়েছে। শুধু অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে এখন আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শিশু-কিশোরেরা যেন মুঠোফোনে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সজাগ থাকার পরামর্শও দেন এই শিক্ষাবিদ।

ধর্ষণ মামলার বিচার বিলম্বের কারণ

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মুহাম্মদ বদিউল আলম বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীরগতি, একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, ডাক্তারি পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং সাক্ষী পাওয়া নিয়ে জটিলতার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষী সময়মতো না পাওয়াও বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, অনেক সময় আলামত নষ্ট হওয়ার পর ভুক্তভোগীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য আনা হয়। পোশাকসহ অন্যান্য আলামতও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি আলামত সংরক্ষণ, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের গুরুত্ব উঠে এসেছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত ও নির্ভুল তদন্ত বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পুলিশের দাবি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চলছে অভিযান

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য স্বল্প সময়ের মধ্যে উদ্‌ঘাটনে পুলিশ সক্ষম হয়েছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা বিভাগ, এসআরবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। তিনি আরও জানান, কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দুই সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। নানা ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি