খুঁজুন
                               
, ,
           

হাতি-ঘোড়া-পুতুল গড়তে নির্ঘুম কনিকা রানী, পূজার মেলায় ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

কুড়িগ্রাম,সংবাদদাতা কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ
হাতি-ঘোড়া-পুতুল গড়তে নির্ঘুম কনিকা রানী, পূজার মেলায় ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

সকাল থেকে রাত—দম ফেলার ফুরসত নেই কনিকা রানী পালের। দুর্গাপূজার মেলা সামনে রেখে মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পুতুল ও নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁর। দোকানিদের কাছ থেকে আগেই পাওয়া পাইকারি অর্ডার নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে দিন-রাত কাজ করছেন তিনি। এক হাতে কাদামাটি, অন্য হাতে রংতুলি—এভাবেই চলছে তাঁর কর্মযজ্ঞ। মাটির তৈরি এসব পণ্য বিক্রির আয়েই চলে তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারের সংসার।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মামাবাড়ি কালীর মেলা গ্রামের বাসিন্দা কনিকা রানী পাল। বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁর পরিবার। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বছরের এই সময়টিতে কাজের চাপও বেড়ে যায়। তবে বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও প্লাস্টিকের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাঁদের।

পূজার মৌসুমে বাড়ে কাজ, রাতদিন পরিশ্রম

কনিকা রানীর পরিবার সারা বছরই কমবেশি মাটির পণ্য তৈরি করে। তবে দুর্গাপূজার মৌসুম তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় বিভিন্ন মেলার দোকানিরা আগে থেকেই যোগাযোগ করে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের অর্ডার দেন। অল্প সময়ের মধ্যে সেই অর্ডার পূরণ করতে পরিবারের সবাইকে ব্যস্ত থাকতে হয়। কনিকা রানীর স্বামী শিবু চন্দ্র পাল ও শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল মেলায় এবং বিভিন্ন হাটবাজারে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করেন। অন্যদিকে, বাড়িতে বসে কাদামাটি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকৃতির পণ্য তৈরির প্রধান কাজটি করেন কনিকা রানী। পরিবারের অন্য নারী-পুরুষেরাও তাঁকে সহযোগিতা করেন।

কনিকা রানীর শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল বলেন, ‘সারাবছর কমবেশি মাটির কাজ হলেও দুর্গাপূজার এই সময়ের জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি। এ সময় মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দোকানিরা আগে যোগাযোগ করে চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার দেন। আমাদেরও অল্প সময়ের মধ্যে সেই কাজ তুলতে হয়।’

মাটির হাতি-ঘোড়া থেকে হাঁড়ি-পাতিল, উঠানজুড়ে কর্মযজ্ঞ

কনিকা রানীর বাড়ির উঠানজুড়ে এখন মাটির ঘ্রাণ আর রঙের সমারোহ। শিশুদের জন্য তৈরি হচ্ছে মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পুতুল ও টাকা জমানোর ব্যাংক। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে হাঁড়ি, পাতিল, কলস, কুলা, ধূপদানি, সানকি ও সানাইসহ নানা ধরনের সামগ্রী। প্রথমে কাদামাটি দিয়ে পছন্দমতো আকৃতি তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো শুকিয়ে চুল্লিতে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়। সবশেষে পণ্যের গায়ে লাল, নীল, হলুদ ও সবুজসহ বিভিন্ন রঙের ছোঁয়া দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়। প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় সময়, শ্রম ও দক্ষতার। রাজারহাটের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর ও চিলমারীর বিভিন্ন পালপাড়াতেও এখন একই ব্যস্ততা। দুর্গাপূজার মেলাকে সামনে রেখে এসব এলাকার মৃৎশিল্পীরাও অর্ডার অনুযায়ী পণ্য তৈরিতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন।

পূজার আয়েই মেটে সংসারের বড় অংশের খরচ

কনিকা রানীর কাছে মৃৎশিল্প শুধু বংশপরম্পরায় পাওয়া একটি পেশা নয়, পরিবারের জীবিকা নির্বাহেরও প্রধান অবলম্বন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় পূজার মৌসুমে কাজ ও বিক্রির সুযোগ বাড়ে। এ সময়ের আয় দিয়ে সংসারের বার্ষিক খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কনিকা রানী পাল বলেন, ‘আমার বাবার বাড়িতেও মৃৎশিল্পের কাজ করতাম। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর বাড়িতেও করি। পূজার মৌসুমের আয় দিয়ে বছরের সংসার খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়।’ তাই মেলার আগে অর্ডার পাওয়া তাঁদের জন্য যেমন কাজের চাপ বাড়ায়, তেমনি সংসারের প্রয়োজন মেটানোর আশাও তৈরি করে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য তৈরি ও সরবরাহ করতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।

মাটি-লাকড়ি-রঙের দাম বাড়ায় বাড়ছে উৎপাদন খরচ

উৎসবের মৌসুমে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা বাড়লেও তাঁদের দুশ্চিন্তা কম নয়। মাটি, লাকড়ি ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য তৈরির খরচও বেড়েছে। কিন্তু মেলার বাজারে সব সময় শ্রম ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক কম দামের প্লাস্টিকের পণ্যের প্রতিযোগিতা। কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামেও মৃৎশিল্পীরা দিন-রাত পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত। তবে বাড়তি ব্যয়ের কারণে তাঁদের লাভের পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। স্থানীয় মৃৎশিল্পের প্রবীণ কারিগর ব্রজেন্দ্র নাথ পাল বলেন, ‘প্লাস্টিকের জিনিস যদি বন্ধ হয়ে যায় আবার এই মাটির কাজ ভালোভাবে চলবে। আমরা ভালোভাবে চলতে পারব।’

তাঁর বক্তব্যে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সঙ্গে প্লাস্টিকের সামগ্রীর প্রতিযোগিতা নিয়ে কারিগরদের উদ্বেগ উঠে এসেছে। মৃৎশিল্পীদের মতে, ঐতিহ্যবাহী এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে তাঁদের তৈরি পণ্যের বাজার ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

সহযোগিতার আশ্বাস বিসিকের

মৃৎশিল্পীদের কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং তাঁদের সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, কনিকা রানী পাল আবেদন করলে বিসিক থেকে তাঁকে সহযোগিতা করা হবে। এ ধরনের সহযোগিতা মৃৎশিল্পীদের উৎপাদন ও বিপণনের সুযোগ বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে সহায়তার ধরন ও বাস্তবায়নের ওপর।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রের অধিকার সবার সমান’—জগন্নাথ হলে রিজভী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১২ অপরাহ্ণ
ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রের অধিকার সবার সমান’—জগন্নাথ হলে রিজভী

ধর্মবিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের অধিকার সমান বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক নাগরিক যেন স্বাধীনভাবে নিজের ধর্মীয় অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পান, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিক ও উপস্থিত পূজার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ড. দেবাশীষ পালসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। রুহুল কবির রিজভী বলেন, উৎসব মানুষকে সব ধরনের সীমারেখা অতিক্রম করতে শেখায় এবং ভ্রাতৃত্ববোধকে উন্মুক্ত করে। সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবের সর্বজনীন আহ্বানে অন্য ধর্মের মানুষও আনন্দ ও সংহতি অনুভব করেন। তিনি বলেন, আবহমান কাল ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

দুর্গাপূজার তাৎপর্য তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, দানবীয় অসুররূপী সমাজে অসত্যকে বিনাশ করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাই দুর্গাপূজার মূল মর্মবাণী। এই আনন্দ-উৎসবের বার্তা কোনো একটি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। রিজভী বলেন, মা দুর্গার আরেক নাম দুর্গতিনাশিনী। তিনি দুর্গতি বিনাশ করে শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই বার্তা ধারণ করে সমাজের অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছুটির মেয়াদ বাড়িয়েছে এবং পূজামণ্ডপগুলোতে চালের বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। তিনি আরও বলেন, এখন থেকে প্রতিটি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েতদের সরকার থেকে মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং এখন তা বাস্তবায়ন করছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, এ দেশের মানুষ একসঙ্গে জারি-সারি গান শোনে, বিভিন্ন পার্বণে অংশ নেয় এবং কীর্তনসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করে। গম্ভীরা ও অন্যান্য লোকজ সাংস্কৃতিক ধারাতেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ শত শত বছর ধরে একসঙ্গে অংশ নিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, ধর্ম ও বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার প্রয়োগের সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেছেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

৬ বছরে পানিফলের আবাদ কমেছে ৪২ শতাংশ, সংকটে চাষিরা

জামালপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০২ অপরাহ্ণ
৬ বছরে পানিফলের আবাদ কমেছে ৪২ শতাংশ, সংকটে চাষিরা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, পোকার আক্রমণ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে সংকটে পড়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পানিফল চাষ। একসময় স্বাদ ও আকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত ছিল এ অঞ্চলের পানিফল। স্থানীয় বিভিন্ন বিল ও জলাশয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এ চাষ এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। কমেছে ফলন, বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়; একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানিফল সরবরাহের বাজারও।

দেওয়ানগঞ্জের চুলকানি বিল, পুঁটিমারি বিল, গুজিমারি বিল, ভেগি বিল, টেংরাগুড়া বিল, ডাকাতিয়া বিল, ভেলামারি বিল ও চুনিয়াপাড়া কোলা একসময় পানিফল চাষের জন্য পরিচিত ছিল। উপজেলার অন্যান্য জলাশয়েও ব্যাপকভাবে এ ফলের আবাদ হতো। কিন্তু বৃষ্টিপাত ও বন্যার ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি জলাভূমিতে পানি কমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় পানিফল চাষের উপযোগী জমি সংকুচিত হয়েছে। কোথাও কোথাও এসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা হচ্ছে।

ছয় বছরে আবাদ কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জে বছরে ৬০ হেক্টরের বেশি জমিতে পানিফল চাষ হতো। এরপর থেকেই আবাদি জমির পরিমাণ কমতে থাকে। ২০২৩ সালে পানিফল চাষ হয় ৪৫ হেক্টর জমিতে, ২০২৪ সালে ৪২ হেক্টর, ২০২৫ সালে ৪০ হেক্টর এবং ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ হেক্টরে।

কৃষি অফিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পানিফল চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। জলাভূমিতে পানির সংকট এবং চাষের খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষক আগের মতো পানিফল চাষ ধরে রাখতে পারছেন না। এভাবে আবাদ কমতে থাকায় শুধু কৃষকদের আয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, স্থানীয়ভাবে পানিফল চাষের সঙ্গে জড়িত বীজ সংগ্রহ, ফল পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ধারাবাহিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

খরচ বেড়েছে, ফলন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি

চুলকানি বিলের পানিফল চাষি হাসমত আলী, জাহের আলী ও করিম মিয়া জানান, ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে পানিফল চাষ করতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হতো। অনুকূল পরিবেশে এক বিঘা জমিতে ফলন পাওয়া যেত প্রায় ৩০ মণ। কিন্তু বর্তমানে একই জমিতে ফলন কমে ১৪ থেকে ১৫ মণে নেমেছে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকায়। প্রতি মণ পানিফল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না তাঁরা।

চাষিরা জানান, আগে একই চারা থেকে তিন দফায় পানিফল সংগ্রহ করা যেত। এখন দুই দফার বেশি ফল পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাষের ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পানিফলের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে পানিফলের বীজকে ‘পুল’ বলা হয়। পর্যাপ্ত ফলন না হওয়ায় পরবর্তী মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করাও চাষিদের কাছে আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।

লাল-কালো পোকার আক্রমণে বাড়ছে ক্ষতি

পানিফল চাষি বেলাল, মজেন, সুফিয়া ও ওমিছা বেগম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পানিফলে লাল-কালো পোকার আক্রমণ বেড়েছে। এসব পোকা দমনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও তাঁরা আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। চাষিদের ভাষ্য, একসময় ‘ইন্ডিয়ান ডিডিটি পাউডার’ নামে পরিচিত একটি কীটনাশক পাওয়া যেত, যা তাঁদের মতে পোকার আক্রমণ দমনে কার্যকর ছিল। আগে ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও পরে এর দাম বেড়ে ৩০০ টাকায় দাঁড়ায়। বর্তমানে ওই কীটনাশক আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তাঁরা। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অথচ ফলন বাড়ছে না। এর সঙ্গে জলাভূমিতে পানির ঘাটতি যুক্ত হয়ে পানিফল চাষকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

ঢাকায় সরবরাহ কমেছে, স্থানীয় বাজারনির্ভরতা বেড়েছে

পানিফল ব্যবসায়ী সমিরুল জানান, একসময় দেওয়ানগঞ্জ থেকে প্রতিদিন দুটি লোকাল ট্রেন ও ট্রাকযোগে পানিফল ঢাকায় পাঠানো হতো। রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও সদরঘাটের আশপাশের বাজারে এসব ফল বিক্রি হতো। এতে স্থানীয় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা বড় বাজারে পণ্য সরবরাহের সুযোগ পেতেন।

কিন্তু ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, উৎপাদন কমে আসা এবং পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে এখন আর আগের মতো ঢাকায় পানিফল পাঠানো হয় না। মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে পানিফল পাঠানো হলেও উৎপাদিত ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দূরের বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগও সীমিত হয়েছে। স্থানীয় বাজারে বিক্রির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় পানিফল চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আয় ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে পানির স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রতন মিয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন ও বন্যার স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন এসেছে। গত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে বন্যা কম হওয়ায় জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমেছে। এর ফলে পানিফল চাষ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জানান, পানিফল চাষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাষিদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পানিফল চাষের সংকট মোকাবিলায় জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদ্ধতি শেখানো, উন্নত চাষপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

দেওয়ানগঞ্জের পানিফল চাষের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি, জীবিকা ও বাজারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, পানির ঘাটতি, রোগবালাই ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ ঐতিহ্য এখন অনিশ্চয়তার মুখে। চাষিদের সহায়তা, জলাভূমি সংরক্ষণ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, নিরাপদ ও কার্যকর বালাই ব্যবস্থাপনা, উন্নত চাষপদ্ধতি এবং সহজ বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে পানিফল চাষ টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বাজারব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

একসঙ্গে বিদেশে বহু শিক্ষক, নোবিপ্রবিতে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম

নোয়াখালীর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ণ
একসঙ্গে বিদেশে বহু শিক্ষক, নোবিপ্রবিতে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য একসঙ্গে অনেক শিক্ষক বিদেশে অবস্থান করায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) তীব্র শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি ছুটির কারণে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং কয়েকজন শিক্ষকের সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রমে অনুপস্থিতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৪২৮টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে ১২৮ জন শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের ছুটিতে রয়েছেন। সে হিসাবে মোট শিক্ষক পদের প্রায় ৩০ দশমিক ১৪ শতাংশের সমপরিমাণ শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। কোনো কোনো বিভাগে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষক ছুটিতে থাকায় সীমিত জনবল দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায় প্রশাসন (ডিবিএ) বিভাগে মোট ১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ৯ জন ছুটিতে রয়েছেন। অর্থাৎ বিভাগটির ৬০ শতাংশ শিক্ষক বর্তমানে ছুটিতে। অর্থনীতি বিভাগে ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন বা ৫৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ২৩ জনের মধ্যে ১১ জন বা ৪৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। এ ছাড়া বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (বিজিই) বিভাগে ২০ জনের মধ্যে ৮ জন এবং বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (বিএমবি) বিভাগে ১০ জনের মধ্যে ৪ জন শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। এ দুই বিভাগেই ছুটিতে থাকা শিক্ষকের হার ৪০ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই কমবেশি শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। তবে বিভাগভেদে ছুটিতে থাকা শিক্ষকের অনুপাতের পার্থক্য থাকায় কোথাও সংকট তুলনামূলক বেশি, কোথাও আবার সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

শিক্ষাছুটি ও সাধারণ ছুটির বাইরে আরও কিছু কারণে নোবিপ্রবির কয়েকটি বিভাগে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স (ফিমস) বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুজ্জামান (রিমন), রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর এবং আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাদশা মিয়া অফলাইন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ফিমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) প্রো-ভিসি এবং ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হানিফ (মুরাদ) লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (লবিপ্রবি) উপাচার্য হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাঁদের নিজ নিজ বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রমে শিক্ষকসংকটের চাপ তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষক ঘাটতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে অস্থায়ী শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসিএসইতে ২ জন, পরিসংখ্যান বিভাগে ১ জন, আইআইটিতে ১ জন, আইআইএসে ২ জন, শিক্ষা প্রশাসনে ১ জন, বিএমবিতে ১ জন, সওএসে ১ জন এবং রসায়ন বিভাগে ১ জন অস্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন। তবে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের পরও বিভাগগুলোর প্রয়োজনীয় শিক্ষকসংখ্যা নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের বিপরীতে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ঘাটতি পূরণের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, কিছু বিষয়ে মাত্র একজন শিক্ষককে একাধিক ব্যাচে পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁরা বলেন, উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য শিক্ষকদের বিদেশে যাওয়ার বিরোধিতা করছেন না তাঁরা। তবে শিক্ষকসংকটের কারণে যেন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত না হয়, সে জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ করে নিয়মিত ক্লাস চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি ছুটির কারণে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মতে, প্রতিটি বিভাগে ছয় থেকে সাতটি ব্যাচ সচল থাকায় সীমিতসংখ্যক শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ দিয়ে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া শিক্ষকদের বিপরীতে বিকল্প বা খণ্ডকালীন (গেস্ট) শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর চাপ কমবে এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও সিলেবাস সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।

শিক্ষক সংকট ও শিক্ষাছুটি প্রসঙ্গে নোবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, শিক্ষাছুটি শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার এবং একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।  শিক্ষক ঘাটতি পূরণে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। প্রয়োজনে ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে গেস্ট শিক্ষক নিয়োগ বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে শূন্যতা পূরণের কথাও উল্লেখ করেন উপাচার্য।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি