হাতি-ঘোড়া-পুতুল গড়তে নির্ঘুম কনিকা রানী, পূজার মেলায় ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা
সকাল থেকে রাত—দম ফেলার ফুরসত নেই কনিকা রানী পালের। দুর্গাপূজার মেলা সামনে রেখে মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পুতুল ও নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁর। দোকানিদের কাছ থেকে আগেই পাওয়া পাইকারি অর্ডার নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে দিন-রাত কাজ করছেন তিনি। এক হাতে কাদামাটি, অন্য হাতে রংতুলি—এভাবেই চলছে তাঁর কর্মযজ্ঞ। মাটির তৈরি এসব পণ্য বিক্রির আয়েই চলে তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারের সংসার।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মামাবাড়ি কালীর মেলা গ্রামের বাসিন্দা কনিকা রানী পাল। বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁর পরিবার। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বছরের এই সময়টিতে কাজের চাপও বেড়ে যায়। তবে বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও প্লাস্টিকের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাঁদের।
পূজার মৌসুমে বাড়ে কাজ, রাতদিন পরিশ্রম
কনিকা রানীর পরিবার সারা বছরই কমবেশি মাটির পণ্য তৈরি করে। তবে দুর্গাপূজার মৌসুম তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় বিভিন্ন মেলার দোকানিরা আগে থেকেই যোগাযোগ করে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের অর্ডার দেন। অল্প সময়ের মধ্যে সেই অর্ডার পূরণ করতে পরিবারের সবাইকে ব্যস্ত থাকতে হয়। কনিকা রানীর স্বামী শিবু চন্দ্র পাল ও শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল মেলায় এবং বিভিন্ন হাটবাজারে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করেন। অন্যদিকে, বাড়িতে বসে কাদামাটি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকৃতির পণ্য তৈরির প্রধান কাজটি করেন কনিকা রানী। পরিবারের অন্য নারী-পুরুষেরাও তাঁকে সহযোগিতা করেন।
কনিকা রানীর শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল বলেন, ‘সারাবছর কমবেশি মাটির কাজ হলেও দুর্গাপূজার এই সময়ের জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি। এ সময় মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দোকানিরা আগে যোগাযোগ করে চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার দেন। আমাদেরও অল্প সময়ের মধ্যে সেই কাজ তুলতে হয়।’
মাটির হাতি-ঘোড়া থেকে হাঁড়ি-পাতিল, উঠানজুড়ে কর্মযজ্ঞ
কনিকা রানীর বাড়ির উঠানজুড়ে এখন মাটির ঘ্রাণ আর রঙের সমারোহ। শিশুদের জন্য তৈরি হচ্ছে মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পুতুল ও টাকা জমানোর ব্যাংক। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে হাঁড়ি, পাতিল, কলস, কুলা, ধূপদানি, সানকি ও সানাইসহ নানা ধরনের সামগ্রী। প্রথমে কাদামাটি দিয়ে পছন্দমতো আকৃতি তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো শুকিয়ে চুল্লিতে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়। সবশেষে পণ্যের গায়ে লাল, নীল, হলুদ ও সবুজসহ বিভিন্ন রঙের ছোঁয়া দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়। প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় সময়, শ্রম ও দক্ষতার। রাজারহাটের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর ও চিলমারীর বিভিন্ন পালপাড়াতেও এখন একই ব্যস্ততা। দুর্গাপূজার মেলাকে সামনে রেখে এসব এলাকার মৃৎশিল্পীরাও অর্ডার অনুযায়ী পণ্য তৈরিতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন।
পূজার আয়েই মেটে সংসারের বড় অংশের খরচ
কনিকা রানীর কাছে মৃৎশিল্প শুধু বংশপরম্পরায় পাওয়া একটি পেশা নয়, পরিবারের জীবিকা নির্বাহেরও প্রধান অবলম্বন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় পূজার মৌসুমে কাজ ও বিক্রির সুযোগ বাড়ে। এ সময়ের আয় দিয়ে সংসারের বার্ষিক খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কনিকা রানী পাল বলেন, ‘আমার বাবার বাড়িতেও মৃৎশিল্পের কাজ করতাম। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর বাড়িতেও করি। পূজার মৌসুমের আয় দিয়ে বছরের সংসার খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়।’ তাই মেলার আগে অর্ডার পাওয়া তাঁদের জন্য যেমন কাজের চাপ বাড়ায়, তেমনি সংসারের প্রয়োজন মেটানোর আশাও তৈরি করে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য তৈরি ও সরবরাহ করতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
মাটি-লাকড়ি-রঙের দাম বাড়ায় বাড়ছে উৎপাদন খরচ
উৎসবের মৌসুমে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা বাড়লেও তাঁদের দুশ্চিন্তা কম নয়। মাটি, লাকড়ি ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য তৈরির খরচও বেড়েছে। কিন্তু মেলার বাজারে সব সময় শ্রম ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক কম দামের প্লাস্টিকের পণ্যের প্রতিযোগিতা। কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামেও মৃৎশিল্পীরা দিন-রাত পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত। তবে বাড়তি ব্যয়ের কারণে তাঁদের লাভের পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। স্থানীয় মৃৎশিল্পের প্রবীণ কারিগর ব্রজেন্দ্র নাথ পাল বলেন, ‘প্লাস্টিকের জিনিস যদি বন্ধ হয়ে যায় আবার এই মাটির কাজ ভালোভাবে চলবে। আমরা ভালোভাবে চলতে পারব।’
তাঁর বক্তব্যে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সঙ্গে প্লাস্টিকের সামগ্রীর প্রতিযোগিতা নিয়ে কারিগরদের উদ্বেগ উঠে এসেছে। মৃৎশিল্পীদের মতে, ঐতিহ্যবাহী এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে তাঁদের তৈরি পণ্যের বাজার ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
সহযোগিতার আশ্বাস বিসিকের
মৃৎশিল্পীদের কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং তাঁদের সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, কনিকা রানী পাল আবেদন করলে বিসিক থেকে তাঁকে সহযোগিতা করা হবে। এ ধরনের সহযোগিতা মৃৎশিল্পীদের উৎপাদন ও বিপণনের সুযোগ বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে সহায়তার ধরন ও বাস্তবায়নের ওপর।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]