খুঁজুন
                               
, ,
           

সীমান্তের গেট বন্ধ, খাদ্যসংকটে ১৫০ হাতি—বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

শেরপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ণ
সীমান্তের গেট বন্ধ, খাদ্যসংকটে ১৫০ হাতি—বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

ভারতের মেঘালয় থেকে আসা প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি দুই বছর ধরে নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারছে না। শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড় এলাকায় বিচরণ করা হাতিগুলোর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় থাকা গেট বন্ধ থাকায়। এতে হাতির খাদ্যসংকট বাড়ার পাশাপাশি কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ক্ষতি এবং মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হাতিগুলো কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। এসব দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয় ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে ফসল নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় থেকে ১০ থেকে ১৫টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরে বংশবিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫০টিতে পৌঁছেছে। একসময় হাতির দল নিয়মিত বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচল করত। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে শেরপুর ও জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। হাতির চলাচল সহজ রাখতে সেখানে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতিগুলো আগের মতো সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ফিরতে পারছে না বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। হাতির আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে তারা খাদ্যের সন্ধানে কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে একদিকে কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হাতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার কৃষক যোসেফ মারাক বলেন, এমন কোনো বছর নেই, যে বছর হাতি এসে ফসলের ক্ষতি করে না। বছরের পর বছর ফসল নষ্ট হওয়ায় ঠিকমতো ঘরে ধান তুলতে পারেন না তাঁরা। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল হাতি নষ্ট করে দেওয়ায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। একই এলাকার কৃষানি আশালতা বলেন, ধান পাকার সময় এলেই হাতির আতঙ্ক বাড়ে। কখন হাতির পাল এসে জমির ফসল নষ্ট করে, সেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ফসল রক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সব ফসল বাঁচানো সম্ভব হয় না।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে মানুষ-হাতির সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতির সঙ্গে সংঘাতে ১০ জন মানুষ ও চারটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে। এ পরিসংখ্যান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানুষ ও বন্যহাতির সহাবস্থান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। হাতির দল লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হাতিরও প্রাণহানি ঘটে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যার জন্য শুধু লোকালয়ে হাতির প্রবেশকে দায়ী করলে মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে। হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং মানুষের কৃষি ও বসতি সম্প্রসারণ—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়তে পারে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে তাঁর মত। বন্যহাতি পরিযায়ী প্রাণী। তাদের চলাচলের পথ এক দেশের সীমান্তে আটকে গেলে আবাসস্থল, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের সংযোগ বজায় রাখা এবং হাতির চলাচলের উপযোগী পথ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১০ অক্টোবর শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসন ও বন্যহাতি সংরক্ষণবিষয়ক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হবে। হাতির চলাচল সহজ করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া শেরপুরের বনাঞ্চলকে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যহাতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। গারো পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যহাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তের গেট খোলার বিষয়ে দুই দেশের সমন্বয়, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার মতো উদ্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

ওআইসি সম্মেলন শেষে নাজাফে হযরত আলীর মাজারে হুমায়ুন কবির

কুটনৈতিক প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৯ অপরাহ্ণ
ওআইসি সম্মেলন শেষে নাজাফে হযরত আলীর মাজারে হুমায়ুন কবির

ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর পবিত্র মাজার ও ঐতিহাসিক মসজিদ জিয়ারত করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সোমবার (১৯ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর ইরাক সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে দেশটি সফর করছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।সফরের অংশ হিসেবে তিনি নাজাফ নগরীতে যান। সেখানে হযরত আলী (রা.)-এর পবিত্র মাজার ও ঐতিহাসিক মসজিদ জিয়ারত করেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রের অধিকার সবার সমান’—জগন্নাথ হলে রিজভী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১২ অপরাহ্ণ
ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রের অধিকার সবার সমান’—জগন্নাথ হলে রিজভী

ধর্মবিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের অধিকার সমান বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক নাগরিক যেন স্বাধীনভাবে নিজের ধর্মীয় অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পান, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিক ও উপস্থিত পূজার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ড. দেবাশীষ পালসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। রুহুল কবির রিজভী বলেন, উৎসব মানুষকে সব ধরনের সীমারেখা অতিক্রম করতে শেখায় এবং ভ্রাতৃত্ববোধকে উন্মুক্ত করে। সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবের সর্বজনীন আহ্বানে অন্য ধর্মের মানুষও আনন্দ ও সংহতি অনুভব করেন। তিনি বলেন, আবহমান কাল ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

দুর্গাপূজার তাৎপর্য তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, দানবীয় অসুররূপী সমাজে অসত্যকে বিনাশ করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাই দুর্গাপূজার মূল মর্মবাণী। এই আনন্দ-উৎসবের বার্তা কোনো একটি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। রিজভী বলেন, মা দুর্গার আরেক নাম দুর্গতিনাশিনী। তিনি দুর্গতি বিনাশ করে শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই বার্তা ধারণ করে সমাজের অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছুটির মেয়াদ বাড়িয়েছে এবং পূজামণ্ডপগুলোতে চালের বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। তিনি আরও বলেন, এখন থেকে প্রতিটি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েতদের সরকার থেকে মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং এখন তা বাস্তবায়ন করছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, এ দেশের মানুষ একসঙ্গে জারি-সারি গান শোনে, বিভিন্ন পার্বণে অংশ নেয় এবং কীর্তনসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করে। গম্ভীরা ও অন্যান্য লোকজ সাংস্কৃতিক ধারাতেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ শত শত বছর ধরে একসঙ্গে অংশ নিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, ধর্ম ও বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার প্রয়োগের সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেছেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

৬ বছরে পানিফলের আবাদ কমেছে ৪২ শতাংশ, সংকটে চাষিরা

জামালপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০২ অপরাহ্ণ
৬ বছরে পানিফলের আবাদ কমেছে ৪২ শতাংশ, সংকটে চাষিরা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, পোকার আক্রমণ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে সংকটে পড়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পানিফল চাষ। একসময় স্বাদ ও আকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত ছিল এ অঞ্চলের পানিফল। স্থানীয় বিভিন্ন বিল ও জলাশয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এ চাষ এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। কমেছে ফলন, বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়; একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানিফল সরবরাহের বাজারও।

দেওয়ানগঞ্জের চুলকানি বিল, পুঁটিমারি বিল, গুজিমারি বিল, ভেগি বিল, টেংরাগুড়া বিল, ডাকাতিয়া বিল, ভেলামারি বিল ও চুনিয়াপাড়া কোলা একসময় পানিফল চাষের জন্য পরিচিত ছিল। উপজেলার অন্যান্য জলাশয়েও ব্যাপকভাবে এ ফলের আবাদ হতো। কিন্তু বৃষ্টিপাত ও বন্যার ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি জলাভূমিতে পানি কমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় পানিফল চাষের উপযোগী জমি সংকুচিত হয়েছে। কোথাও কোথাও এসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা হচ্ছে।

ছয় বছরে আবাদ কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জে বছরে ৬০ হেক্টরের বেশি জমিতে পানিফল চাষ হতো। এরপর থেকেই আবাদি জমির পরিমাণ কমতে থাকে। ২০২৩ সালে পানিফল চাষ হয় ৪৫ হেক্টর জমিতে, ২০২৪ সালে ৪২ হেক্টর, ২০২৫ সালে ৪০ হেক্টর এবং ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ হেক্টরে।

কৃষি অফিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পানিফল চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। জলাভূমিতে পানির সংকট এবং চাষের খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষক আগের মতো পানিফল চাষ ধরে রাখতে পারছেন না। এভাবে আবাদ কমতে থাকায় শুধু কৃষকদের আয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, স্থানীয়ভাবে পানিফল চাষের সঙ্গে জড়িত বীজ সংগ্রহ, ফল পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ধারাবাহিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

খরচ বেড়েছে, ফলন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি

চুলকানি বিলের পানিফল চাষি হাসমত আলী, জাহের আলী ও করিম মিয়া জানান, ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে পানিফল চাষ করতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হতো। অনুকূল পরিবেশে এক বিঘা জমিতে ফলন পাওয়া যেত প্রায় ৩০ মণ। কিন্তু বর্তমানে একই জমিতে ফলন কমে ১৪ থেকে ১৫ মণে নেমেছে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকায়। প্রতি মণ পানিফল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না তাঁরা।

চাষিরা জানান, আগে একই চারা থেকে তিন দফায় পানিফল সংগ্রহ করা যেত। এখন দুই দফার বেশি ফল পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাষের ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পানিফলের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে পানিফলের বীজকে ‘পুল’ বলা হয়। পর্যাপ্ত ফলন না হওয়ায় পরবর্তী মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করাও চাষিদের কাছে আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।

লাল-কালো পোকার আক্রমণে বাড়ছে ক্ষতি

পানিফল চাষি বেলাল, মজেন, সুফিয়া ও ওমিছা বেগম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পানিফলে লাল-কালো পোকার আক্রমণ বেড়েছে। এসব পোকা দমনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও তাঁরা আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। চাষিদের ভাষ্য, একসময় ‘ইন্ডিয়ান ডিডিটি পাউডার’ নামে পরিচিত একটি কীটনাশক পাওয়া যেত, যা তাঁদের মতে পোকার আক্রমণ দমনে কার্যকর ছিল। আগে ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও পরে এর দাম বেড়ে ৩০০ টাকায় দাঁড়ায়। বর্তমানে ওই কীটনাশক আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তাঁরা। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অথচ ফলন বাড়ছে না। এর সঙ্গে জলাভূমিতে পানির ঘাটতি যুক্ত হয়ে পানিফল চাষকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

ঢাকায় সরবরাহ কমেছে, স্থানীয় বাজারনির্ভরতা বেড়েছে

পানিফল ব্যবসায়ী সমিরুল জানান, একসময় দেওয়ানগঞ্জ থেকে প্রতিদিন দুটি লোকাল ট্রেন ও ট্রাকযোগে পানিফল ঢাকায় পাঠানো হতো। রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও সদরঘাটের আশপাশের বাজারে এসব ফল বিক্রি হতো। এতে স্থানীয় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা বড় বাজারে পণ্য সরবরাহের সুযোগ পেতেন।

কিন্তু ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, উৎপাদন কমে আসা এবং পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে এখন আর আগের মতো ঢাকায় পানিফল পাঠানো হয় না। মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে পানিফল পাঠানো হলেও উৎপাদিত ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দূরের বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগও সীমিত হয়েছে। স্থানীয় বাজারে বিক্রির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় পানিফল চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আয় ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে পানির স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রতন মিয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন ও বন্যার স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন এসেছে। গত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে বন্যা কম হওয়ায় জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমেছে। এর ফলে পানিফল চাষ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জানান, পানিফল চাষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাষিদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পানিফল চাষের সংকট মোকাবিলায় জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদ্ধতি শেখানো, উন্নত চাষপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

দেওয়ানগঞ্জের পানিফল চাষের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি, জীবিকা ও বাজারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, পানির ঘাটতি, রোগবালাই ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ ঐতিহ্য এখন অনিশ্চয়তার মুখে। চাষিদের সহায়তা, জলাভূমি সংরক্ষণ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, নিরাপদ ও কার্যকর বালাই ব্যবস্থাপনা, উন্নত চাষপদ্ধতি এবং সহজ বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে পানিফল চাষ টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বাজারব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি