কিউআর কোডে মাদকের ফাঁদ, টেলিগ্রামে ২৫০ শিক্ষার্থী!
একটি ছোট্ট ভিজিটিং কার্ড, তাতে একটি কিউআর কোড। কোডটি স্ক্যান করলেই ওয়েবসাইট, সেখান থেকে প্রবেশের সুযোগ টেলিগ্রামের গোপন গ্রুপে। অভিযোগ, এই ডিজিটাল পথ ব্যবহার করেই ক্রেতা সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছিল ‘কুশ’ ও ‘সিনথেটিক গাঁজা’। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এমন একটি অনলাইন মাদক বাণিজ্যচক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
- বসুন্ধরার বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক অনলাইন কারবারের সন্ধান
- ওয়েবসাইট বানিয়ে ‘কুশ’ ও সিনথেটিক গাঁজা বিক্রির অভিযোগ; গ্রেপ্তার ১৯ বছরের তরুণ
প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলে মাদক বিক্রির এ অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসে কার্ড বিতরণ, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আগ্রহীদের যুক্ত করা এবং অনলাইনে যোগাযোগের পর বাসায় মাদক পৌঁছে দেওয়া—এমন একটি ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে অধিদপ্তরের তদন্তে। সম্প্রতি রাজধানীর ভাটারার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ সাইম ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনলাইনে মাদক বিক্রির জন্য ওয়েবসাইট তৈরি ও টেলিগ্রামে গোপন গ্রুপ পরিচালনার কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করেছে অধিদপ্তর।
ক্যাম্পাসের কার্ড থেকে গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, চক্রটির সদস্যরা ক্যাম্পাস এলাকায় মাদক সেবনে আগ্রহী বলে মনে হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিজিটিং কার্ড বিতরণ করতেন। কার্ডে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলে একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যেত। পরে সেখান থেকে আগ্রহীদের টেলিগ্রামের একটি গোপন গ্রুপে যুক্ত করা হতো। কর্মকর্তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে সাইম জানিয়েছেন, প্রায় দুই মাস আগে তিনি অনলাইনে মাদক বিক্রির উদ্দেশ্যে ওয়েবসাইট তৈরি করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুই সপ্তাহ ধরে ‘কুশ’ ও ‘সিনথেটিক গাঁজা’ বিক্রি করছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন। ওই টেলিগ্রাম গ্রুপে দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে অধিদপ্তর।
অনলাইনে অর্ডার, বাসায় পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে মাদক কারবারি চক্র সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী। তাঁর ভাষ্য, এলাকায় মাদক কেনাবেচার নির্দিষ্ট কিছু স্থান থাকলেও সম্প্রতি অনলাইনে অর্ডার করে বাসায় মাদক পাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক এ ধরনের ব্যবস্থা মাদক কারবারের প্রচলিত ধরন বদলে দিতে পারে। ক্রেতা ও বিক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ, ক্রেতা সংগ্রহ এবং সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলে প্রচলিত নজরদারিতে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
ভাটারার ফ্ল্যাটে অভিযান, উদ্ধার গাঁজা ও সরঞ্জাম
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদের নেতৃত্বে গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভাটারার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ৩০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে সাইম ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, একটি ব্যবহৃত মুঠোফোনও জব্দ করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানান, সাইবার প্যাট্রোলিংয়ের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক বিক্রির কার্যক্রম শনাক্ত করা হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে উচ্চমাত্রার সিনথেটিক গাঁজা, কুশ সিড এবং মাদক প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অধিদপ্তরের পরিদর্শক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বাদী হয়ে ভাটারা থানায় মামলা করেছেন। এজাহার অনুযায়ী, সাইমের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। তিনি রাজধানীর ভাটারার জোয়ার সাহারা লিচুবাগান এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন।
প্রযুক্তি যখন মাদক বাণিজ্যের হাতিয়ার
বসুন্ধরার এ ঘটনা শুধু মাদক উদ্ধারের একটি অভিযান নয়; এটি অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ক্রেতা সংগ্রহ ও মাদক সরবরাহের নতুন কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ওয়েবসাইট, কিউআর কোড ও গোপন গ্রুপ ব্যবহার করে কারবার পরিচালিত হলে তদন্তকারীদের মাদকের উৎস শনাক্ত করার পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্র এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের অভিযানের পাশাপাশি অনলাইনেও মাদক কারবারিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রযুক্তির আড়ালে থেকে কেউ মাদক ব্যবসা পরিচালনা করলেও তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]