সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ফোনের পর্দায় একবার চোখ বুলানো, কাজের ফাঁকে বন্ধুদের পোস্ট দেখা, অবসরে রিলস কিংবা ভিডিওতে ডুবে থাকা—আধুনিক জীবনের পরিচিত চিত্র এটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বিনোদন, খবর, নতুন পণ্য বা কনটেন্টের সন্ধান এবং ব্যবসারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বজুড়ে এর বিস্তার কতটা গভীর, তা বোঝা যায় একটি পরিসংখ্যানে—পৃথিবীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫৭৯ কোটি।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ এখন কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন। একজন নিয়মিত ব্যবহারকারী মাসে গড়ে ছয়টির বেশি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকেন। অর্থাৎ, মানুষ শুধু একটি মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই; প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এখন ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন, বিনোদন ও বৈশ্বিক ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই।
প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটা সময় যাচ্ছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে সেখানে ব্যয় করা সময়ও। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একজন ব্যক্তি গড়ে সপ্তাহে ১৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট কাটাচ্ছেন। দৈনিক হিসাবে যা প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট।
এই সময়কে বিশ্বের সব ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে হিসাব করলে প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ কোটি ঘণ্টারও বেশি। সংখ্যাটি শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বোঝায় না; মানুষের মনোযোগ এখন কত বড় অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে, সেটিও তুলে ধরে।
এই বিপুল সময়ের একটি অংশ কাটে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে, কেউ খোঁজেন খবর, কেউ দেখেন বিনোদনমূলক ভিডিও, আবার অনেকে ব্যবহার করেন পড়াশোনা কিংবা পেশাগত কাজের জন্য। তবে প্রয়োজনীয় ব্যবহার আর অভ্যাসের বশে দীর্ঘ সময় স্ক্রল করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিদিন কতক্ষণ অনলাইনে থাকছেন, তার পাশাপাশি সেই সময় কীভাবে কাজে লাগছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপনের বাজারে মেটার দাপট
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তিকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে মেটা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করেছে বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মেটার এসব সেবার দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সম্মিলিত সংখ্যা ছিল ৩৫৬ কোটি। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, বাজারে নতুন প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব হলেও মেটার সেবাগুলোর ব্যবহার এখনো বাড়ছে। শুধু ব্যবহারকারী নয়, বিজ্ঞাপনের বাজারেও প্রতিষ্ঠানটির আয় বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, মেটার বিজ্ঞাপননির্ভর আয় আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিজ্ঞাপনপ্রতি গড় খরচ বেড়েছে ১২ শতাংশ।
ভিডিও কনটেন্টের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন লক্ষণীয়। ফেসবুকে ভিডিও দেখার সময় আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম রিলসে ব্যবহারকারীদের কাটানো সময় বেড়েছে ১০ শতাংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার ব্যবহারও বাড়ছে; মেটার ৮০ লাখের বেশি বিজ্ঞাপনদাতা অন্তত একটি এআই বিজ্ঞাপন টুল ব্যবহার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রবণতা দেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু মানুষের উপস্থিতি বাড়ানোই নয়, তাঁদের মনোযোগ ধরে রাখাও প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় লক্ষ্য। ভিডিও সুপারিশ, কনটেন্টের ক্রম নির্ধারণ এবং ব্যক্তিভেদে বিজ্ঞাপন দেখানোর মতো প্রযুক্তি সেই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করছে।
স্ন্যাপচ্যাট ও রেডিটের বাড়তি গতি
বাজারে মেটার প্রভাব থাকলেও অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোও নিজেদের ব্যবহারকারী ও আয়ের পরিধি বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে স্ন্যাপচ্যাটের দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ৩০ লাখে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৯৫ কোটি ৬০ লাখে। একই সময়ে প্ল্যাটফর্মটির আয় বেড়ে হয়েছে ১৫৩ কোটি ডলার, যা প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে অনলাইন ফোরামভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম রেডিটের প্রবৃদ্ধিও নজর কেড়েছে। এর দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৬৮ লাখে। একই সময়ে রাজস্ব বেড়েছে ৬৯ শতাংশ, যার পরিমাণ ৬৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর মধ্যে বিজ্ঞাপন থেকে আয় হয়েছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার—আগের বছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি।
স্ন্যাপচ্যাট ও রেডিটের এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাজারে সাফল্য কেবল মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করছে না। নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট, ব্যবহারকারীর আগ্রহ এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে সেই ব্যবহারকারীদের গুরুত্বও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
নতুন সিনেমা, গান কিংবা পণ্যের খোঁজ—সবখানেই সোশ্যাল মিডিয়া
একসময় নতুন সিনেমা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান কিংবা গানের খবর পেতে মানুষ নির্ভর করতেন টেলিভিশন, সংবাদপত্র বা পরিচিতজনের পরামর্শের ওপর। এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কোনো শিল্পীর নতুন গান, আলোচিত সিনেমার দৃশ্য কিংবা নতুন পণ্যের প্রচারণা মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ডেলয়েটের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, শিল্পী বা কনটেন্টের নিয়মিত ভক্তদের ৫২ শতাংশ জানিয়েছেন, নতুন টিভি শো, সিনেমা, গান, গেম কিংবা ইভেন্ট সম্পর্কে জানার প্রধান মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৭৩ শতাংশ।
অর্থাৎ, নতুন কিছু আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ব্যবহারকারীরা বন্ধুদের শেয়ার করা পোস্ট, নির্মাতাদের ভিডিও, ট্রেন্ডিং বিষয় কিংবা অ্যালগরিদমের সুপারিশ থেকে নতুন কনটেন্টের সন্ধান পাচ্ছেন। একইভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে এই মাধ্যমকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
পছন্দ সোশ্যাল মিডিয়ায়, কেনাকাটা অন্য জায়গায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পণ্য বা কনটেন্টের সন্ধান পাওয়া মানেই যে ব্যবহারকারী সেখানেই তাঁর কাজ শেষ করছেন, তা নয়। অনেকেই আগ্রহী হওয়ার পর বিস্তারিত জানতে, ভিডিও দেখতে কিংবা কেনাকাটা করতে অন্য ওয়েবসাইট বা অ্যাপে চলে যান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সমীক্ষা অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কোনো কনটেন্ট বা পণ্যের সন্ধান পাওয়ার পর প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ সেটি দেখতে বা কিনতে অন্য প্ল্যাটফর্মে যান। জেন-জির ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ।
এখানেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেলেও সেই আগ্রহকে সরাসরি কেনাকাটায় রূপ দেওয়া সব সময় সহজ হয় না। ব্যবহারকারীকে শেষ পর্যন্ত পণ্য কেনা, ভিডিও দেখা কিংবা সেবা গ্রহণের জন্য অন্য প্ল্যাটফর্মে যেতে হতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এখন শুধু কতজন বিজ্ঞাপন দেখলেন বা পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানালেন, সেটিই বড় বিষয় নয়; সেই আগ্রহ বাস্তব সিদ্ধান্তে কতটা রূপ নিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে আরও বড় হচ্ছে ডিজিটাল প্রতিযোগিতা
বিশ্বজুড়ে ৫৭৯ কোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান ডিজিটাল জীবনের ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে এই সংখ্যার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সময়, মনোযোগ এবং পছন্দের পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন কনটেন্ট ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে বিজ্ঞাপনদাতারা তাঁদের কাছে পৌঁছানোর আরও কার্যকর উপায় খুঁজছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই এখন আর নিছক অবসর কাটানোর জায়গা নয়। এটি তথ্য পাওয়ার মাধ্যম, বিনোদনের জগৎ, ব্যবসার বাজার এবং মানুষের মনোযোগ ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।
তবে ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, ডিজিটাল সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি নিজের সময় ও মনোযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা। কারণ, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও প্রত্যেকের কাছে নিজের সময়ের মূল্য আলাদা।
কালের আলো/এএএন/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]