সকালের নাশতার টেবিলে কিংবা ব্যস্ত নগরজীবনের দ্রুতগতির সকালে এক স্লাইস পাউরুটি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রধান অনুষঙ্গ। দুধে ভেজানো পাউরুটি শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবার কাছেই পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার হিসেবে সমাদৃত। কিন্তু এই নরম, সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় ফোলানো পাউরুটির প্রতি স্লাইসেই যে লুকিয়ে আছে মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতো এক বিষাক্ত ফাঁদ, তা আমাদের অজানা থেকে যাচ্ছে। অতি মুনাফালোভী একশ্রেণীর বেকারি মালিক ও সরকারের তদারকি সংস্থার চরম উদাসীনতায় প্রতিদিন দেশের কোটি কোটি মানুষ বিষ গিলে খাচ্ছে। প্রাতঃরাশের এই সাধারণ উপাদানটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরবে ডেকে আনছে মহা বিপর্যয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি রিট আবেদন খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও জনসমক্ষে এনে দাঁড় করিয়েছে। মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গুড গভর্নেন্স ফাউন্ডেশন (এমএইচআরজিএফ)-এর পক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান কবীর আলমগীর জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি করেন। এতে পাউরুটি উৎপাদনের সময় বিষাক্ত পটাশিয়াম ব্রোমেটের (Potassium Bromate – \text{KBrO}_3) ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সাথে বাজারজাতকৃত পাউরুটির প্যাকেটের গায়ে ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার হয়নি’—এই মর্মে স্পষ্ট ঘোষণা রাখা বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই আইনি পদক্ষেপের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বোঝা যায় রিটে বিবাদী হিসেবে অভিযুক্তদের তালিকা দেখলে। রিটে খাদ্যসচিব, বিএসটিআই মহাপরিচালক, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান—যেমন প্রাণ ফুডস, নাবিস্কো, ডেনিস, ফ্রেশ (মেঘনা গ্রুপ), আকিজ ফুড এবং হক ফুডের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিবাদী করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেবল কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, বাজারে বিদ্যমান অনিয়মের লাগাম টানার এক কঠোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পাউরুটি তৈরির চিরাচরিত ও নিরাপদ পদ্ধতি ছিল ইস্ট (Yeast) বা খাবার সোডার ব্যবহার। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ এবং বাজার দখলের অসম প্রতিযোগিতায় উৎপাদন ত্বরান্বিত ও সস্তা করার কৌশল হিসেবে নব্বইয়ের দশক থেকে বেকারিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের অনুপ্রবেশ ঘটে।
পটাশিয়াম ব্রোমেট প্রধানত আটার খামিরকে দীর্ঘস্থায়ী করা, রুটিকে তুলতুলে রাখা এবং অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে তোলার ‘ডফ ইম্প্রুভার’ (Dough Improver) বা আটা প্রক্রিয়াজাতকরণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। এটি সস্তা এবং খুবই অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলেও পাউরুটির চেহারা চমৎকার ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচলিত ইস্টের বাড়তি খরচ বাঁচাতে বেকারির মালিকেরা অজান্তেই বা জেনেশুনেই এই বিপজ্জনক রাসায়নিক উপাদানের ওপর ঝুঁকছেন।
বিশ্বের প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে বেকারি খাদ্যে রাসায়নিকটির ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) একে ‘গ্রুপ টু-বি কারসিনোজেন’ (Group 2B Carcinogen) হিসেবে চিহ্নিত করেছে—যা মানবদেহে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিকভাবে এমন উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল দীর্ঘসূত্রতায় ভরা। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ২০১৬ সালে পাউরুটির মান নির্ধারণের সময় ১ কেজি পাউরুটিতে ৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক গবেষণার ভিত্তিতে ২০১৮ সালে বিএসটিআই এবং ২০২২ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বেকারি খাদ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
কিন্তু খাতা-কলমে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও বাস্তবে ঢাকা শহরসহ জেলা ও উপজেলার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অগণিত অনিবন্ধিত ও অপরিকল্পিত বেকারিতে এর ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালিত এক ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ১৯টি পাউরুটির নমুনার মধ্যে ১৬টিতেই—অর্থাৎ ‘৮৪ শতাংশ নমুনায়’—অতিরিক্ত মাত্রায় পটাশিয়াম ব্রোমেট বিদ্যমান ছিল। যার মাত্রা ছিল ৩.৩১ পিপিএম থেকে ১২.৯১ পিপিএম পর্যন্ত। এমনকি ২০২৫ সালেও নতুন করে নেওয়া একাধিক নমুনায় পটাশিয়াম ব্রোমেট এবং সহনশীল মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ক্ষতিকর ‘ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেট’ (১.৫৭%, যেখানে অনুমোদিত মাত্র ০.৭%) পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
ভেজাল খাদ্যের এই তাণ্ডবে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ১ লাখ ১৭ হাজারের বেশি মানুষ এই মরণব্যাধিতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। এ ছাড়া দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ নানা ধরনের কিডনি জটিলতায় ভুগছে।
খাদ্যে বিদ্যমান পটাশিয়াম ব্রোমেট কেবল সাধারণ ক্যানসার নয়, এটি একটি ‘জেনোটক্সিক কারসিনোজেন’—যা সরাসরি মানুষের ডিএনএ এবং জিনগত গঠনে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম। এটি থাইরয়েড গ্রন্থির ম্যালিগন্যান্সি এবং কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম অনুঘটক।
আমাদের রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেভাবে কোনো নিয়ম-কানুন ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেকারি গড়ে উঠছে, তা সত্যি উদ্বেগের। সেখানে একদিকে যেমন নেই ন্যূনতম পরিচ্ছন্নতা, তেমনি নেই কোনো টেকনিশিয়ান বা রসায়নবিদ, যিনি উপাদান পরিমাপ করতে পারেন। আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে আটার খামিরে।
এখানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নজরদারির অভাব স্পষ্ট। কেবল মাঝেমধ্যে কিছু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং নামমাত্র জরিমানা করে খাদ্য নিরাপত্তার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিয়মিত ল্যাব টেস্টিং, কঠোর মনিটরিং এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীরা আদালতের নির্দেশ কিংবা কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্যানসারের এই বিষাক্ত হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে রাষ্ট্রকে কঠোর ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে:
১.হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পাউরুটি ও বেকারি খাদ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে একটি স্থায়ী তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।
২.সকল প্রক্রিয়াজাত পাউরুটির প্যাকেটে ব্যবহৃত উপাদানের বিস্তারিত তালিকা এবং ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট-মুক্ত’ সনদ প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
৩.যেসকল বেকারি বা ব্র্যান্ড নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করবে, তাদের কারখানা তাৎক্ষণিক সিলগালা এবং মালিক পক্ষকে দৃশ্যমান মেয়াদের কারাদণ্ড দিতে হবে।
৪.ঐতিহ্যগত ও নিরাপদ উপাদান যেমন ভালো মানের ইস্ট এবং প্রাকৃতিক এনজাইম ব্যবহারে বেকারি মালিকদের উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
৫.সাধারণ মানুষকে প্লাস্টিক বা সাধারণ প্যাকেটে মোড়কহীন এবং অনিবন্ধিত বেকারির লোভনীয় ফোলানো পাউরুটি কেনা থেকে সতর্ক থাকতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই,একটি জাতির সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। বিষাক্ত খাদ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রেখে কোনো দেশ কখনো উন্নত বা কল্যাণকামী হতে পারে না। প্রাতঃরাশের স্লাইস পাউরুটি যেন পরিবারের কারো জন্য ক্যান্সারের টিকিট হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আদালতের দরজায় হানা দিয়ে সচেতন নাগরিকেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন; এখন সময় এসেছে প্রশাসনিক যন্ত্রের জাগরণের। নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি কোনো দয়া নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকার। সুতরাং আর কাল বিলম্ব না করে এই বিষাক্ত ফাঁদ গুঁড়িয়ে দিয়ে সুস্থ ও ক্যান্সারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এখনই চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অভিশাপ থেকে আমরা কেউ বাঁচতে পারব না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট,রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
আপনার মতামত লিখুন
Array