উদ্বেগজনক মোড় নিতে পারে ডেঙ্গু
সারা দেশে মশা নিধন কার্যক্রমের দুর্বলতার কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক মোড় নিতে পারে। গত মাসের তুলনায় চলতি জুন মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে।চলতি বছরের মে মাসের ২৫ দিনে যেখানে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬০৯ জন সেখানে জুন মাসের ২৫ দিনে ভর্তি হয় ২ হাজার ৩১৮ জন। এক মাসের ব্যবধানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ২৮১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এডিস মশার বিস্তার এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে জুলাইয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পাঁচগুণ এবং আগস্টে দশগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার মশা নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত ফগিং বা ধোঁয়া দেওয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের উচিত মশার লার্ভা ধ্বংস করা এবং উৎপত্তিস্থল নির্মূলের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। শুধু যেখানে ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, সেই নির্দিষ্ট স্থানগুলোতেই ফগিং করা উচিত। ঢালাওভাবে ফগিং করে কোনো লাভ হচ্ছে না, অথচ এটিই এখন মশা নিধনের প্রধান পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসের ২৫ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৪০০ জন। আর জুন মাসের ২৫ দিনে ভর্তি হয় ৪ হাজার ৫২৫ জন। বৃদ্ধির হার ছিল ২২৩ শতাংশ। আর মে মাসের ২৫ থেকে জুনের ২৫ তারিখ পর্যন্ত এক মাসে ভর্তি হয় ৪ হাজার ৮৯৮ জন। বৃদ্ধির হার ছিল ২৫০ শতাংশ। গত বছর পুরো মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসের রোগী ভর্তি ৬০ শতাংশ রোগী কম। ২০২৫ সালের মে মাসে ভর্তি হয় ১ হাজার ৭৭৩ জন। এবার ভর্তি হয়েছে ৭১৪ জন।
ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে গত ২৩ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’র প্রথম সভা হয়েছে। সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ সভায় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চলতি মাসের শুরুতে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১০ শতাংশ বেড সংরক্ষণ করবে। এসব রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভিজিট ফি নেওয়া হবে না। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়ে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণে সভা শেষে সাংবাদিকদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। করোনার সময়ের মতো সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল মালিক, গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু কীভাবে প্রতিরোধ করতে হয় তা আমাদের সবারই জানা আছে। এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমরা যদি মশার বিস্তার আটকাতে না পারি, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমানো যাবে না। এখন যেখানে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা দেখে দেখে সেই সব জায়গা ব্যাপকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এবার এখন পর্যন্ত যা দেখছি সরকার আন্তরিক। সরকারপ্রধান নিজেই এটা নিয়ে কথা বলছেন, কাজ করছেন। এটা ভালো দিক। তবে আমাদের আর বেশি সতর্ক হতে হবে। কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array