ছোট কম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস
বাংলাদেশে একের পর এক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন ভূতত্ত্ববিদরা। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত চার দিনে অন্তত ৬ দফা ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠায় সাধারণ মানুষের মনে কাজ করছে বড় ধরনের আতঙ্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন এই ছোট ছোট কম্পন বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস।
সোমবার (২২ জুন) ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। যার উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জ। এই ঘটনা আবারও দেশের ভূমিকম্পের ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তিও দীর্ঘদিন ধরে জমা রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে অতীতে কয়েকটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ১৭৬২ সালের গ্রেট আরাকান ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫। ১৮৯৭ সালে আসামে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এছাড়া ১৯১৮ সালে সিলেট এবং ১৯৩০ সালে আসামে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঘটনা রয়েছে।
চলতি বছরে দেশে আরও কয়েক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিত ধারাবাহিক কম্পন নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি জানান, সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো এই ফল্ট লাইনটি বর্তমানে পুরোপুরি ‘লকড’ বা আটকে আছে। কোনো স্লিপ বা ছোটখাটো মুভমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে এই শক্তি অবমুক্ত হচ্ছে না। শক্তি বের না হয়ে প্রতিনিয়ত জমা হতে থাকাটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ঙ্কর অবস্থা। অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, বাংলাদেশ নিজে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা না হলেও, এই লকড কন্ডিশনের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। তাই এখানে যখনই কোনো বড় ভাঙন হবে, তা প্রলয়ঙ্করী রূপ নেবে। ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে সিলেট পর্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় সেখানে ভূগর্ভে শক্তি জমা হয়েছে। এই শক্তি একবারে বা ধাপে ধাপে বের হয়ে বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চল। বিশেষ করে ঢাকার ঘনবসতি, সরু রাস্তা এবং দুর্বল ভবন বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) জানিয়েছে, নির্মাণবিধি না মেনে তৈরি হওয়া অনেক ভবন ভূমিকম্পের সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে দেশের প্রায় ৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এর পেছনের কারণ হিসেবে বলছেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, জরুরি সেবার দুর্বলতা, সচেতনতার অভাব ইত্যাদি। এর জন্য দরকার বিল্ডিং কোডের কঠোর প্রয়োগ, সিসমিক ম্যাপিং, উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণ, জরুরি পরিকল্পনা ইত্যাদি। এ এমন এক বিপর্যয় যা মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু কিছু জরুরি বিষয় আছে যেগুলো অনুসরণে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা এড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজধানী ঢাকা। ঢাকার অধিকাংশ ভবন রাজউক ও সিটি করপোরেশনের নিয়মানুযায়ী নির্মিত নয়। এর ফলে এসব ভবন বড় ভূমিকম্পের সম্মুখীন হলে সহজেই ধসে পড়বে। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও অনেক ভবন সহ্য করতে পারবে না। ফলে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া ঢাকায় অনেক পুরনো ভবন রয়েছে, যেগুলোর নির্মাণকাল অনেক আগের। এ ধরনের ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনে অত্যন্ত অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং কোনো শক্তিশালী কম্পনে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বেশি। আমাদের দেশের ভূমিকম্প বিষয়ে জনসচেতনতার অভাবও ব্যাপক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: জিল্লুর রহমান বলেন, মিয়ানমান বা নেপালের মতো অত বেশি ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকি আমাদের নেই। ওদের ওখানে সর্বশেষ ১৯৪৬ সালে বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ফলে ৮০ বছরের মধ্যে সেখানে আবারো বড় ভূমিকম্প হয়ে গেল। আমাদের এখানে কিন্তু সর্বশেষ ১৯১৮ সালে বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এক শ’ বছরের বেশি হয়ে গেছে। এখানে দেড় শ’ বা ২০০ বছর পরপর ওই ধরনের ভূমিকম্প হয়। সে হিসাবে আমরাও ঝুকির মধ্যে আছি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ছোট ও মাঝারি ভূকম্পনে বড় শক্তি বের হওয়ার একটা প্রবণতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তার মানে, যেকোনো সময় একটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বড়মাত্রার ভূকম্পন হলে কি ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে যদি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে সারা দেশে ৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়বে। ১১ লাখ ৯ হাজার পাকা ভবন, ২১ লাখ ১৪ হাজার সেমিপাকা স্থাপনা, ৪০২টি খাদ্যগুদাম, ১৪টি গ্যাসফিল্ড, ১৯৫টি হাসপাতাল। এক হাজার আটটি কল্যাণকেন্দ্র, দুই হাজার ৮০০ উচ্চবিদ্যালয়, এক হাজার ৯০০ মাদ্রাসা, ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছয় হাজার ৮০০ পুলিশ স্টেশন, এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, সাত হাজার ৪০০ কিলোমিটার স্থানীয় সড়ক, ২০ হাজার ব্রিজ, এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশে যে ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রস্তুতির অভাব রয়েছে তাও স্বীকার করা হয়েছে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array