প্রথম ছয় মাস যেকোনো সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস। ছয় মাসে সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, আবার কয়েকটি দৃশ্যমান সাফল্য দিয়েও একটি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ বিচার করা যায় না। তবু ১৬ আগস্ট ২০২৬-এ বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তির মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইছে—কী পেলাম, কী পেলাম না এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে?
আমার পর্যবেক্ষণে, এই ছয় মাসের হিসাব একেবারে একপাক্ষিক নয়। সরকারের কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, আবার কয়েকটি ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনার দরজাও খুলেছে। সামগ্রিক বিচারে এখন পর্যন্ত সাফল্যের পাল্লা কিছুটা ভারী; তবে সেই সাফল্যকে টেকসই করার পরীক্ষাই হবে আগামী ছয় মাস।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি আলোচিত দিক হলো তাঁর তুলনামূলক বিনয়ী ও কর্মমুখী উপস্থিতি। নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ, সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ততা ক্ষমতাসীন রাজনীতিতে একটি ভিন্ন বার্তা তৈরি করেছে। অবশ্যই কোনো প্রধানমন্ত্রীর পোশাক বা ব্যক্তিগত আচরণ দিয়ে রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ করা যায় না; কিন্তু নেতৃত্বের আচরণ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি প্রতীকী প্রভাব ফেলে।
ক্ষমতা যদি নাগরিকের কাছাকাছি আসে, রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কমে। আর রাষ্ট্র যদি জাঁকজমকের পরিবর্তে কাজকে অগ্রাধিকার দেয়, প্রশাসনের নিচের স্তরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণেই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সংযমকে শুধু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাব্য প্রশাসনিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সরকারের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের প্রবণতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দুর্বল নজরদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
কারণ সরকারি অর্থ কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের করের টাকা। প্রতিটি টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিনিময়ে জনগণ কী পাচ্ছে—এই প্রশ্নের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক শর্ত।
জন লকের রাষ্ট্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য—“Government has no other end, but the preservation of property.”অর্থাৎ, সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণ করা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর অর্থ শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা নয়; রাষ্ট্রের সম্পদও জনগণের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। তাই সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ নিজেই একটি জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ।
তবে ব্যয় কমানো মানেই উন্নয়ন কমানো নয়। বরং সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত—অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিতে ব্যয় বাড়াতে হলে অপচয় বন্ধ করতেই হবে।
ছয় মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ড। মার্চে এর পাইলট কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ইউনিটে ৬ হাজার ৫০০ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়; দীর্ঘমেয়াদে দুই কোটি পরিবারকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। কার্ডধারী নারীপ্রধান পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা পাওয়ার কথা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন রয়েছে—“ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।”সামাজিক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন ভাতা থেকে একটি সমন্বিত পরিবারভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের এই চেষ্টা সফল হলে এটি বাংলাদেশের কল্যাণরাষ্ট্রের কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য কাগজে নয়, বাস্তবায়নে। প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে তালিকাভুক্ত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন, ডিজিটাল যাচাই এবং দুর্নীতিমুক্ত অর্থ বিতরণ নিশ্চিত করতে না পারলে একটি ভালো উদ্যোগও পুরোনো ভাতা-নির্ভর ব্যবস্থার মতো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন রলসের ন্যায়বিচারের দর্শনের সারকথা এখানে প্রাসঙ্গিক—সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষও ন্যায্যভাবে উপকৃত হয়।
সুতরাং সামাজিক সুরক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য তাই শুধু ভাতা নয়; দারিদ্র্য থেকে মানুষকে সক্ষমতার দিকে নিয়ে যাওয়া।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্যের সবচেয়ে সহজ মাপকাঠি হলো—চাকরি আছে কি না, আয় বাড়ছে কি না এবং সংসারের খরচ সামলানো যাচ্ছে কি না।
সরকার নিজস্ব ছয় মাসের মূল্যায়নে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক কর্মসূচিতে অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছে; একই সঙ্গে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জনগণের প্রত্যাশার তুলনায় বাস্তব কর্মদক্ষতার আরও উন্নতি দরকার।
এখানে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ বাড়ানো, বেসরকারি খাতকে আস্থা দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করা। এক্ষেত্রে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
একটি সরকার যতই ভালো সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করুক, যদি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সুরক্ষার ওপর চাপ বাড়তেই থাকবে।
অতএব সরকারের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত—ভাতা থেকে কর্মসংস্থান, নির্ভরতা থেকে সক্ষমতা এবং ভোগ থেকে উৎপাদনের দিকে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া।
তারেক রহমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার জায়গা পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনোই নিরাপদ নয়। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে জরুরি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক যোগাযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১০ আগস্ট ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে একটি “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত কিছু সংবেদনশীল বিষয়ও আলোচনার অংশ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে; ২০–২৫ আগস্টের একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যদিও চূড়ান্ত তারিখ তখনও নিশ্চিত হয়নি।
এখানে তারেক রহমানের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের বহুমাত্রিক ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতির অভিজ্ঞতা এবং তাঁর মা খালেদা জিয়ার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানের ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যদি বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারও ওপর নয়—এই নীতিকে বাস্তব কূটনীতিতে রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে।
তবে কূটনীতির সাফল্য শুধু সফর, বৈঠক বা ছবি দিয়ে বিচার করা যাবে না। বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা, জ্বালানি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং শ্রমবাজারে বাংলাদেশ কতটা বাস্তব সুবিধা অর্জন করতে পারছে—সেটিই হবে চূড়ান্ত মাপকাঠি।
সরকারের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের কিছু অপ্রাপ্তি স্পষ্ট। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, অপরাধী চক্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব—এসব নিয়ে নাগরিক উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিশেষ করে চাঁদাবাজি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য একটি গভীর সমস্যা। একজন ব্যবসায়ী যখন বৈধভাবে ব্যবসা করার পরও একাধিক পক্ষকে চাঁদা দিতে বাধ্য হন, তখন সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ চাঁদাবাজির মূল্য পরিশোধ করে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাই।
সরকার এ ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার কিছু দৃশ্যমান বার্তা দিয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারই শেষ সমাধান নয়। চাঁদাবাজির পেছনের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের উৎস এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও চিহ্নিত করতে হবে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান হতে হবে দল-মত নির্বিশেষে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যদি তদন্তের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে।
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের সঙ্গে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার সরাসরি যুক্ত। রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন, বদলি কিংবা নেতৃত্ব নির্বাচন কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য টেকসই ব্যবস্থা হতে পারে না।
পুলিশের নেতৃত্বে থাকতে হবে সততা, পেশাদারিত্ব, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মদক্ষতা। যোগ্য কর্মকর্তাকে যোগ্য জায়গায় বসানো শুধু পুলিশের স্বার্থ নয়—এটি নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থের বিনিময়ে পদায়নের সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা যদি একটি পদ পাওয়াকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে পুলিশি সেবা দুর্নীতির চক্রে আটকে যেতে পারে।
ম্যাক্স ভেবারের আধুনিক আমলাতন্ত্রের ধারণার মূল শিক্ষা ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, নিয়ম, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষের অপ্রাপ্তি এখনো সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি নীতি, বাজেট বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারের ব্যাগে কতগুলো পণ্য কেনা যাচ্ছে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, মজুত, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সমন্বিত নজরদারি দরকার।
সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোন পণ্য কোথায় কত দামে উৎপাদিত হচ্ছে, কত দামে পরিবাহিত হচ্ছে এবং কত দামে বিক্রি হচ্ছে—এই তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকট দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
কারণ অর্থনীতির শেষ বিচারক কোনো মন্ত্রণালয় নয় বরং সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগ।
একটি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হচ্ছে তার ওপর। একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী বা দক্ষ মন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু রাষ্ট্রকে টেকসইভাবে ভালো রাখতে হলে ভালো প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।
আগামী দিনে সরকারের উচিত প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মসূচি নির্ধারণ করা। ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস নিয়েও আলোচনা চলছে এবং ছয় মাসের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
এটি যদি হয়, তবে পরিবর্তনের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দক্ষতা বৃদ্ধি ও ফলাফল নিশ্চিত করা রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা নয়।
সরকারের সামনে এখন অন্তত আটটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—
প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা।
দ্বিতীয়ত, পুলিশ ও প্রশাসনে মেধা, সততা ও পেশাদারিত্বভিত্তিক পদায়ন।
তৃতীয়ত, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা।
চতুর্থত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংস্কার।
পঞ্চমত, ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী নিশ্চিত করা।
ষষ্ঠত, সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ ফল নিশ্চিত করা।
সপ্তমত, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনা।
অষ্টমত, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করা।
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের বিখ্যাত বক্তব্য—“The rule of law is better than that of any individual.” বাংলা অর্থ—“কোনো ব্যক্তির শাসনের চেয়ে আইনের শাসন উত্তম।” অতএব আগামী বাংলাদেশের জন্য এই নীতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়,বিএনপি সরকারের ছয় মাসকে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যের চোখে দেখা যাবে না; দেখতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ফলাফলের আলোকে। এই ছয় মাসে সরকার কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে—সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড, সরকারি ব্যয়ে সংযমের চেষ্টা, প্রশাসনিক কর্মপরিকল্পনা এবং কূটনীতিতে ভারসাম্যের প্রচেষ্টা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো বড় কাজ বাকি।
সুতরাং সরকারের ছয় মাসের রায় হতে পারে—সাফল্য আছে, ব্যর্থতাও আছে; কিন্তু সম্ভাবনা সবচেয়ে বড়।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে সরকারকে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—জনগণ প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা ফলাফল দেখতে চায়।
প্রথম ছয় মাস ছিল পথচলার শুরু। আগামী ছয় মাস হবে প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেয় তার পরীক্ষা। যদি সরকার যোগ্য মানুষকে যোগ্য জায়গায় বসাতে পারে, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন থাকতে পারে, বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে, কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থানে রাখতে পারে—তাহলে এই ছয় মাসের ইতিবাচক ভিত্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র-সংস্কারের সূচনায় পরিণত হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
আপনার মতামত লিখুন
Array