খুঁজুন
                               
, ,
           

জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

জাতীয় নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল সীমান্ত রক্ষা কিংবা সামরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র তার সমগ্র ভূখণ্ডে কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তাকে আজ একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের দুর্গম রেতলাং এলাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক সফল সামরিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে তাদের তৎপরতা পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এসব কার্যক্রম শুধু স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করেনি; বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। এই বাস্তবতায় পরিচালিত অভিযান প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দেশের কোনো অঞ্চলই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

রেতলাংয়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই অভিযানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খাড়া পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্গম পথ এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী এবং আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সফল অভিযান পরিচালনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এটি কেবল একটি ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিকূল পরিবেশেও রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—তিনটি দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে। বিশেষত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকপাচারের ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র প্রায়ই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে বান্দরবান বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। পাশাপাশি কৃষি, বনজ সম্পদ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং সীমান্ত বাণিজ্য এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, অন্যদিকে স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটনের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাকে কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযানও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। এটি শুধু একটি সফল সামরিক অভিযান নয়; বরং পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি কৌশলগত নিরাপত্তা কার্যক্রম। সামরিক কৌশলবিদ সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Art of War-এ উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত বিজয় অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্বপ্রস্তুতি, তথ্য এবং সঠিক পরিকল্পনার ওপর। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম, বিশেষায়িত বাহিনীর দক্ষতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনাই আজকের নিরাপত্তা অভিযানের সফলতার প্রধান ভিত্তি।

রেতলাং অভিযানের আরেকটি তাৎপর্য হলো এটি স্থানীয় জনগণের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যখন রাষ্ট্র জনগণের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তখন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে সামরিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু অভিযানের ফলাফলে নয়, বরং সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী নিরাপত্তা, জনআস্থা এবং উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সামরিক সাফল্য কোনো সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা কখনোই এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। অন্যথায় সাময়িক নিরাপত্তা অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।

কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক ধরে রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (Revolutionary Armed Forces of Colombia–FARC) নামের মার্ক্সবাদী গেরিলা সংগঠন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার একদিকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংলাপ, গ্রামীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে পর্যটন, কৃষি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং বহু অঞ্চল ধীরে ধীরে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর দেশটি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পর্যটন উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে। যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ফিলিপাইনের মিন্ডানাও অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরাপত্তা অভিযানকে রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় না করলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের সফল অভিযানকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। সামরিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কার্যকর সমন্বয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক অভিযান ভবিষ্যতে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিশ্বে অনেক নিরাপত্তা হুমকি জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের সক্রিয় অংশীদার বলে অনুভব করলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সংযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে। তাই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। পরিবেশসম্মত পর্যটন, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য, ফল ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান তত বাড়বে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও তত শক্তিশালী হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এই পারস্পরিক সম্পর্কই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি।
একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পাশাপাশি বজায় থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য অপরিহার্য।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং কৌশলগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের যেকোনো অঞ্চলে তার আইনগত কর্তৃত্ব ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তবে এই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই নিরাপত্তায় রূপ দিতে হলে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশীদার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

অতএব, সামরিক সাফল্যকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা, স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদার করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এই সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।ড. মোঃ মিজানুর রহমান
Mizan12bd@yahoo.com

চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

শরতের নীল আকাশ, সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনা আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, আবার কিছু কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।

হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিংয়ের চাপ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা বুকিংয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলোতে আগাম বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চা-বাগান, ঝরনা ও হাওরের টানে পর্যটকেরা

মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ, পাহাড়ি পথ, ঝরনার পানি এবং হাওরের বিস্তৃত জলরাশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। শরতের আবহে এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটির সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পর্যটকদের আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যও মৌলভীবাজার ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। ফলে পূজার ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আকর্ষণ

কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে। সেখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে পর্যটন কার্যক্রমের সুফল স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

পূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পূজার ছুটিতে আগাম বুকিংয়ের উচ্চ হার স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় হারের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয়েছে তাওহিদ হৃদয়ের দল। আবুধাবিতে শনিবার ৯৯ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। ম্যাচে শুরুতে বল হাতে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ২৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের বড় জুটি জিম্বাবুয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। পরে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

টেলর-আরভিনের ১৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়াল জিম্বাবুয়ে

টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের সামনে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। তবে এই অবস্থায় দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। আরভিনের ব্যাট থেকে আসে ১০৬ বলে ৯৩ রান। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান সংগ্রহ করে দলটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রান।

তাসকিনের তিন উইকেটেও থামেনি জিম্বাবুয়ে

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৪৪ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। শুরুতে তাঁর বোলিংয়েই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান দুটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে টেলর ও আরভিনের জুটি ভাঙতে দেরি হওয়ায় জিম্বাবুয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয়।

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সৌম্য সরকার ৯ রান করে ব্লেসিং মুজারাবানির বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেই ছন্দপতন শুরু হয়। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৪৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। তিনি করেন ১৩ রান। দলীয় ৯৭ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে আউট হন অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। ২১ বলে ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। অধিনায়কের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ১৭২ রানেই শেষ

হৃদয়ের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। মোসাদ্দেক হোসেনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ ২৬ বলে ৩২ রানের জুটি গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। রিশাদ করেন ২৩ রান, আর তাসকিন ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। তিনি নেন ৪ উইকেট। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

 

ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে উড়িয়ে বসুন্ধরার টানা তিন জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে উড়িয়ে বসুন্ধরার টানা তিন জয়

ব্যাট হাতে খালেদ মাসুদের ঝোড়ো অর্ধশতক আর বল হাতে তাপস ঘোষের বিধ্বংসী বোলিংয়ে দাপুটে জয় পেয়েছে বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। এবিজি স্পোর্টস সিটির আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফ্রস্ট ব্লাস্ট টি-টোয়েন্টি করপোরেট ক্রিকেটের তৃতীয় আসরের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে হারিয়েছে দলটি। এ জয়ে টুর্নামেন্টে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিল বসুন্ধরা। শনিবার আগে ব্যাট করতে নেমে ১৯.৩ ওভারে ১৪০ রানে অলআউট হয় বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। জবাবে ব্যাট করতে নেমে তাপস ঘোষের বোলিং তোপে ১৬.৫ ওভারে মাত্র ৮৯ রানেই গুটিয়ে যায় ঢাকা ক্রিকেটার্সের ইনিংস।

খালেদ মাসুদের ঝোড়ো ফিফটিতে লড়াকু সংগ্রহ 

ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্সের। দলীয় ৯ রানে মাহমুদুল হাসান শেখের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার মাহেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ২ রান। আগের দুই ম্যাচে ভালো ছন্দে থাকা শেহজাদ আকবর সোবহানও এদিন বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। তিনি করেন ৬ রান। প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে দ্বিতীয় উইকেটে ৩৯ রানের জুটি গড়েন খালেদ মাসুদ ও সুমন আহমেদ। তবে ১৭ বলে ১০ রান করে সুমন ফিরে গেলে আবারও চাপে পড়ে দলটি। একপ্রান্ত আগলে রেখে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান খালেদ। তাঁর ব্যাটে রান আসতে থাকায় বড় সংগ্রহের আশা জাগে বসুন্ধরা শিবিরে। মাত্র ৩৫ বলে ৬টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৫৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। দলীয় ৯৬ রানে ফিরোজ রশিদের বলে খালেদ আউট হলে ফের ছন্দপতন ঘটে বসুন্ধরার ব্যাটিংয়ে। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি।

শেষ দিকে বাবুর ব্যাটে ১৪০ রান

মাঝের ওভারে অন্তু ১৩ বলে ১৭ এবং রাজি ১১ রান করে দলের সংগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন। শেষ দিকে বাবুর অপরাজিত ১৭ রানের ইনিংসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৬ বলের ইনিংসটি খেলে বসুন্ধরাকে ১৪০ রানে পৌঁছে দেন তিনি। ঢাকা ক্রিকেটার্সের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ফিরোজ রশিদ। ২৩ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। মাহমুদুল হাসান শেখ এক মেডেনসহ ১৩ রান খরচায় শিকার করেন ২ উইকেট। ১৪১ রানের লক্ষ্য খুব বড় না হলেও বসুন্ধরার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সের সামনে তা তাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্সের জন্য।

তাপস ঘোষের তোপে ভেঙে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্স

লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্স। বসুন্ধরার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। ব্যাটারদের কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ঢাকা ক্রিকেটার্সের হয়ে সর্বোচ্চ ২৪ রান করেন ফারুক টিটো। ২৯ বলের ইনিংসে দুটি চার ও একটি ছক্কা মারেন তিনি। রাসেল করেন ১১ রান এবং তাসবিহ ইবতিসাম রাফির ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। বাকি ব্যাটারদের কেউই দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। অতিরিক্ত থেকে যোগ হয় ১৭ রান।

বসুন্ধরার হয়ে বল হাতে ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখান তাপস ঘোষ। মাত্র ৩.৫ ওভারে ৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে নেন তিনি। তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়েই দ্রুত গুটিয়ে যায় ঢাকা ক্রিকেটার্সের ব্যাটিং লাইনআপ। খালেদ মাসুদও বল হাতে অবদান রাখেন। ২ ওভারে ৮ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। রাজি ৪ ওভারে ২০ রান খরচায় শিকার করেন আরও ২ উইকেট। এ ছাড়া মাহেন ও লাজিম একটি করে উইকেট নেন। খালেদ মাসুদের ৫৯ রানের ইনিংস বসুন্ধরাকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়। এরপর তাপস ঘোষের দুর্দান্ত বোলিং এবং অন্য বোলারদের কার্যকর ভূমিকা ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৮৯ রানেই আটকে দেয়।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি