জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
জাতীয় নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল সীমান্ত রক্ষা কিংবা সামরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র তার সমগ্র ভূখণ্ডে কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তাকে আজ একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের দুর্গম রেতলাং এলাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক সফল সামরিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে তাদের তৎপরতা পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এসব কার্যক্রম শুধু স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করেনি; বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। এই বাস্তবতায় পরিচালিত অভিযান প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দেশের কোনো অঞ্চলই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।
রেতলাংয়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই অভিযানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খাড়া পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্গম পথ এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী এবং আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সফল অভিযান পরিচালনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এটি কেবল একটি ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিকূল পরিবেশেও রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—তিনটি দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে। বিশেষত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকপাচারের ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র প্রায়ই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে বান্দরবান বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। পাশাপাশি কৃষি, বনজ সম্পদ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং সীমান্ত বাণিজ্য এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, অন্যদিকে স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটনের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাকে কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।
বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযানও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। এটি শুধু একটি সফল সামরিক অভিযান নয়; বরং পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি কৌশলগত নিরাপত্তা কার্যক্রম। সামরিক কৌশলবিদ সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Art of War-এ উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত বিজয় অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্বপ্রস্তুতি, তথ্য এবং সঠিক পরিকল্পনার ওপর। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম, বিশেষায়িত বাহিনীর দক্ষতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনাই আজকের নিরাপত্তা অভিযানের সফলতার প্রধান ভিত্তি।
রেতলাং অভিযানের আরেকটি তাৎপর্য হলো এটি স্থানীয় জনগণের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যখন রাষ্ট্র জনগণের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তখন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে সামরিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু অভিযানের ফলাফলে নয়, বরং সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী নিরাপত্তা, জনআস্থা এবং উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সামরিক সাফল্য কোনো সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা কখনোই এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। অন্যথায় সাময়িক নিরাপত্তা অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।
কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক ধরে রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (Revolutionary Armed Forces of Colombia–FARC) নামের মার্ক্সবাদী গেরিলা সংগঠন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার একদিকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংলাপ, গ্রামীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে পর্যটন, কৃষি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং বহু অঞ্চল ধীরে ধীরে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর দেশটি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পর্যটন উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে। যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ফিলিপাইনের মিন্ডানাও অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরাপত্তা অভিযানকে রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় না করলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের সফল অভিযানকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। সামরিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কার্যকর সমন্বয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক অভিযান ভবিষ্যতে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিশ্বে অনেক নিরাপত্তা হুমকি জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের সক্রিয় অংশীদার বলে অনুভব করলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সংযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে। তাই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। পরিবেশসম্মত পর্যটন, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য, ফল ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান তত বাড়বে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও তত শক্তিশালী হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এই পারস্পরিক সম্পর্কই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি।
একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পাশাপাশি বজায় থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য অপরিহার্য।
বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং কৌশলগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের যেকোনো অঞ্চলে তার আইনগত কর্তৃত্ব ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তবে এই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই নিরাপত্তায় রূপ দিতে হলে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।
এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশীদার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।
অতএব, সামরিক সাফল্যকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা, স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদার করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এই সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।ড. মোঃ মিজানুর রহমান
Mizan12bd@yahoo.com


আপনার মতামত লিখুন
Array