১৭১ বছরের চা চাষের ইতিহাসে উৎপাদনে রেকর্ড
রপ্তানি তলানিতে নামলেও উৎপাদনে চমক দেখিয়ে চলেছে চা। বছর বছর উৎপাদন বাড়তে থাকা পণ্যটি দেশের চাহিদা মেটাচ্ছে প্রতিনিয়ত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চা রপ্তানি থেকে ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার আয় করেছে বাংলাদেশে। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা) টাকার অঙ্কে এ অর্থের পরিমাণ ৪১ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বাড়ায় আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছিল চা শিল্প। চাহিদা মেটাতে ২০১০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে আমদানিও শুরু হয়। চা আমদানিনির্ভর হয়ে যাবে কি না, এমন শঙ্কাও ছিল। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে চাহিদার চেয়ে বেশি চা উৎপাদন করে চা শিল্পে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন উৎপাদকরা। শুধু তা–ই নয়, এই অঞ্চলে ১৭১ বছরের চা চাষের ইতিহাসে উৎপাদনেও রেকর্ড হয়েছে। আগের মত আর আমদানি করতে হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের চা শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।রোববার (২৬ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের চা শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত এক সভায় তিনি চা শিল্পের বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং চা শিল্প-সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে চা বাগান মালিকদের বিদ্যমান ঋণের দায় সহজীকরণ এবং স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশ চা বোর্ডের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৩ সালে ১০ কোটি ২৯ লাখ ১৮ হাজার (১০২.৯২ মিলিয়ন) কেজি চা উৎপাদন হয় দেশে। পরের দুই বছরেও (২০২৪ ও ২০২৫) প্রায় ১০ কোটি কেজি উৎপাদন হয়। চলতি ২০২৬ সালেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
চা বোর্ডের কর্মকর্তা ও বাগান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চা উৎপাদনে রেকর্ড সাফল্যের নেপথ্যে আছে গত এক দশকে সরকার ও বাগান মালিকদের নেওয়া নানামুখী পদক্ষেপ। উত্তরাঞ্চলে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবানে চা চাষের আওতা বাড়ছে। পরিত্যক্ত বাগান চা চাষের আওতায় এসেছে। কয়েক বছর ভালো দাম পাওয়ায় বাগান মালিকেরাও নতুন বিনিয়োগ করেছেন। বাগানে প্রযুক্তিগত ব্যবহারও বেড়েছে। চলতি বছর চায়ের উৎপাদন ১০ কোটি কেজির বেশি হবে জানিয়ে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো.মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জুন পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭০ লাখ কেজি বেশি চা উৎপাদন হয়েছে। এবার আমরা লক্ষ্যমাত্রা ধরেছি ১০ কোটি ৪০ লাখ (১০৪ মিলিয়ন) কেজি। আশা করছি, বছর শেষে লক্ষ্য অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড হবে।’
তিনি বলেন, ‘চায়ের উৎপাদন বাড়াতে আমরা পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন ১২৫ থেকে ১৩০ মিলিয়ন (১২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১৩ কোটি) কেজিতে নিয়ে যাওয়া। আশা করছি, চা শ্রমিক, বাগান মালিক ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেটা সফল হবে।’
চায়ের উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানিসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ফলে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় চা রপ্তানি কমেছে। দেশীয় চা শিল্প সুরক্ষার লক্ষ্যে চা আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, চা উৎপাদন বাড়ানো, গুণগত মান উন্নয়ন এবং রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য সরকার ২০২৬ সালের ৭ জুন একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। ওই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array