বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু কবি আছেন, যাঁদের জীবনকাল দীর্ঘ না হলেও তাঁদের সৃষ্টি সময়কে অতিক্রম করেছে। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁদেরই একজন। মাত্র ২০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেও ক্ষুধা, শোষণ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বৈষম্য ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কবিতার শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় তাঁর মাতুলালয়ে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। তাঁর বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য কলকাতায় বইয়ের ব্যবসা করতেন। ফলে জন্মস্থান ও পৈতৃক নিবাস নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়।
কলকাতাতেই তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে। কমলা বিদ্যামন্দিরের পর তিনি বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এরই মধ্যে ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনেরও সমাপ্তি ঘটে।
কৈশোর থেকেই সাহিত্যচর্চায় যুক্ত সুকান্ত পরবর্তী সময়ে মার্কসবাদী আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো সময়ের সংকট তাঁর লেখায় সরাসরি প্রতিফলিত হয়। ১৯৪৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। পরের বছর কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতা-র ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন।
তাঁর কবিতার কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন। এই কারণেই তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতার চেয়ে বাস্তবতা এবং প্রতিবাদের স্বর অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
সুকান্তের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ছাড়পত্র’, ‘পূর্বাভাস’, ‘মিঠেকড়া’, ‘অভিযান’, ‘ঘুম নেই’, ‘হরতাল’ ও ‘গীতিগুচ্ছ’। এর মধ্যে ‘ছাড়পত্র’ তাঁর জীবদ্দশায় ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়; অন্য বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর।
তাঁর কবিতার ভাষা ছিল সহজ, সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ। ক্ষুধার্ত মানুষের বাস্তবতা বোঝাতে তাঁর বহুল উদ্ধৃত পঙ্ক্তি—‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ / পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’—বাংলা কবিতায় এক অনন্য উপমা হয়ে আছে।
অল্প বয়সেই সুকান্ত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর বয়স হয়েছিল ২০ বছর ৯ মাসেরও কম।
জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সাহিত্যকর্ম ছিল বিস্ময়করভাবে পরিণত। তাই সুকান্তকে শুধু ‘কিশোর কবি’ হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্বকে ছোট করে দেখা হয়। তিনি ছিলেন এমন এক কবি, যিনি নিজের সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে কবিতার ভাষায় ধারণ করেছিলেন।
সুকান্তের জন্মদিন ১৫ আগস্ট। তাই প্রতিবছর এই দিনে তাঁর জন্মস্মরণে ফিরে আসে সেই অকালপ্রয়াত কবির কথা—যিনি মাত্র দুই দশকের জীবনে বাংলা কবিতায় এমন এক স্বর তৈরি করেছিলেন, যা আজও ক্ষুধার্ত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array