ব্ল্যাক কফির যত উপকার, কতটা পান করবেন জেনে নিন
সকালের শুরুতে এক কাপ কফি অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। ঘুমঘুম ভাব কাটানো, কাজে মনোযোগ বাড়ানো কিংবা ব্যস্ত দিনের আগে সতেজ হতে কফির জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তবে দুধ-চিনি মেশানো কফির তুলনায় চিনি ও দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফি তুলনামূলক কম ক্যালরির এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।
ব্ল্যাক কফিতে ক্যাফেইনের পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। এতে অল্প পরিমাণে ভিটামিন বি-২, বি-৩, বি-৫, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামও পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণায় পরিমিত কফি পানের সঙ্গে শরীরের কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে কফিকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা জাদুকরী পানীয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং পরিমিত পরিমাণে পান করা এবং অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ ও ক্রিম এড়িয়ে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।
মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হতে পারে
কফির ক্যাফেইন মস্তিষ্ককে সাময়িকভাবে সতর্ক ও সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। ফলে ঘুমঘুম ভাব কমার পাশাপাশি মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়তে পারে।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে পারকিনসন্সসহ কিছু স্নায়ুবিক রোগের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ব্ল্যাক কফি খেলেই ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার্স থেকে মুক্তি পাওয়া যায়—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
ব্যায়ামের আগে কেন কফি জনপ্রিয়
ব্যায়ামের আগে অনেকেই এক কাপ ব্ল্যাক কফি পান করেন। এর প্রধান কারণ ক্যাফেইন। এটি শরীরকে সাময়িকভাবে সতর্ক ও সক্রিয় রাখার পাশাপাশি ব্যায়ামের সময় ক্লান্তি অনুভূত হতে কিছুটা দেরি করাতে পারে।
ক্যাফেইন অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বাড়াতে পারে, যার ফলে শারীরিক কর্মক্ষমতা ও সহনশীলতা কিছুটা বাড়তে পারে।
তবে শুধু ব্ল্যাক কফি খেলেই শরীরের অতিরিক্ত চর্বি দ্রুত গলে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। ওজন কমাতে সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালরি নিয়ন্ত্রণই মূল বিষয়।
লিভারের জন্য সম্ভাব্য উপকার
কফি নিয়ে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হলো লিভারের স্বাস্থ্য। বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে ফ্যাটি লিভার, লিভার ফাইব্রোসিস, সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ যৌগ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে লিভারের কোনো রোগ থাকলে শুধু কফির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। কফির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য সক্রিয় উপাদান এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই হৃদ্স্পন্দন বা রক্তচাপের সমস্যা থাকলে কফি পানের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার সঙ্গে সম্পর্ক
বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত কফি পান এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের তুলনামূলক কম ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কফিতে থাকা ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ও পলিফেনলের মতো উপাদান এতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে কফির সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি সিরাপ বা ক্রিম যোগ করলে এর ক্যালরি ও চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় চিনি ছাড়া কফি বেছে নেওয়া ভালো।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়?
কিছু গবেষণায় কফি পানকারীদের মধ্যে লিভার ও এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণা মূলত সম্পর্ক নির্দেশ করে। তাই কফি ক্যানসার প্রতিরোধ করে বা ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে কাজ করে—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
দিনে কতটা কফি পান করবেন?
ক্যাফেইনের নিরাপদ মাত্রা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন একটি প্রচলিত সীমা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এক কাপ কফিতে কত ক্যাফেইন থাকবে, তা কফির ধরন ও তৈরির পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
তাই সবার জন্য নির্দিষ্ট করে ‘প্রতিদিন চার কাপ’ কফি পান করার পরামর্শ দেওয়া যায় না। যে পরিমাণ কফি পান করলে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা বা বুক ধড়ফড় শুরু হয়, তার চেয়ে কম পরিমাণে থাকা উচিত।
সবার জন্য ব্ল্যাক কফি উপযোগী নয়
অতিরিক্ত ক্যাফেইনে অস্থিরতা, উদ্বেগ, বুক ধড়ফড়, পেটের অস্বস্তি এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বা ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে কফি পান করলে ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যারা নিয়মিত ওষুধ খান, হৃদ্স্পন্দন বা রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে কিংবা উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের কফি পানের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কীভাবে কফি পান করবেন?
কফির সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকার পেতে চাইলে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি সিরাপ ও ভারী ক্রিম এড়িয়ে চলা ভালো। চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি তুলনামূলক কম ক্যালরির পানীয়।
তবে সুস্থ থাকার জন্য শুধু কফির ওপর নির্ভর করা যাবে না। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সুস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি।
এক কাপ ব্ল্যাক কফি হয়তো আপনাকে সতেজ করতে পারে, কিন্তু সুস্থ থাকার আসল চাবিকাঠি হলো পরিমিতি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array