খুঁজুন
                               
, ,
           

মহামারি আকারে ছড়িয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৭:১৯ অপরাহ্ণ
মহামারি আকারে ছড়িয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার

রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে ভয়ংকর ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। কাগজে-কলমে অলিখিত থাকলেও ২০০১ সালে রাজধানীর উত্তরায় ‘ক্র্যাব’ বা ‘কাঁকড়া গ্রুপ’ তৈরির মাধ্যমে প্রথম ‘গ্যাং কালচার’ প্রথা সাধারণ মানুষের নজরে আসে। র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্যে জানা যায়, দেশজুড়ে ২৫০টি কিশোর গ্যাংয়ের ৫ হাজার সদস্য এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

জানা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের ৮টি অপরাধ বিভাগের ৫০টি থানা এলাকায় আছে একাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ। কোনো কোনো থানায় ডজনখানেক গ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মোহাম্মদপুর, আদাবর, হাতিরঝিল, আগারগাঁও, মিরপুর, দারুসসালাম, পল্লবী, ভাসানটেক, উত্তরা, বাড্ডা-রামপুরা, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ি এলাকায় তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতায় আতংকিত সাধারণ মানুষ। কব্জি কাটা গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, চিল গ্রুপ, পটেটো গ্রুপ, রক্তচোষা জনি গ্রুপ, পায়তারা গ্রুপ, কাটিং গ্রুপসহ অসংখ্য গ্যাং অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন বা অফলাইন দুই প্ল্যাটফর্মেও চলে তাদের নানান কার্যক্রম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের ভয়ংকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভিডিও বা ছবি নিজেরাই ছড়িয়ে দেয় নেট দুনিয়ায়। এলাকাভিত্তিক শীর্ষ সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ হাত ধরেই শুরু হয় এদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ।

সন্ত্রাসের জনপদ হিসাবে এখন আলোচনায় মোহাম্মদপুর। সেখানে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের রাজত্ব। দিন কিংবা রাত যখন যেভাবে চাচ্ছে তারা দিচ্ছে সশস্ত্র মহড়া। চাঁদার দাবিতে বা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ অনেক। পাটালী গ্রুপ, ভাইস্তা বিল্লাল গ্রুপ, মাউরা সোহেল গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপসহ ২৫টি কিশোর অপরাধ গ্রুপ। যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে কমপক্ষে ১৫ জন ‘বড় ভাই’। সম্প্রতি এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। কব্জি কাটা গ্রুপের আনোয়ার এখন কারাবন্দী। যদিও পুলিশের টানা অভিযানে অনেকে এখন এলাকা ছাড়া।

ঢাকা মেট্রোপলিটনপুলিশের মিডিয়া বিভাগের এডিসি নিয়াজ মেহেদী বলেছেন, ‘এসব কিশোর অপরাধীদের কার্যক্রম নজরদারিতে আছে। তারা যেমন অপরাধের কৌশল পরিবর্তন করে, তেমনি পুলিশও সেই কৌশল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

র‌্যাবের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছর ৩১ মে পর্যন্ত ৩২৪টি অভিযানে সারাদেশে ১৯২ গ্রুপের ১ হাজার ৭৯৩ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৪৪ জন কিশোরকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেছেন, ‘স্থানীয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব, অশোভন শব্দচয়ন আর নিজেদের ভয়ংকর প্রমাণ করতে অদ্ভুত সব নাম দিয়ে নিজেদের অপরাধ কার্যক্রম চালায় কিশোর গ্যাংগুলো।’

কালের আলো/এম/এএইচ

নীল চা পান করলে শরীরে কী হয়, জানুন উপকারিতা ও সতর্কতা

লাইফস্টাইল ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৪৬ অপরাহ্ণ
নীল চা পান করলে শরীরে কী হয়, জানুন উপকারিতা ও সতর্কতা

চায়ের প্রতি বাঙালির ভালোবাসা দীর্ঘদিনের। তবে লাল চা কিংবা দুধ চায়ের বাইরে এখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে নানা ধরনের ভেষজ পানীয়। এর মধ্যে অন্যতম অপরাজিতা ফুলের নীল চা। উজ্জ্বল নীল রং, সহজে রং বদলে যাওয়ার বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণের কারণে পানীয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু এই চা কি সত্যিই শরীরের নানা উপকার করে, নাকি এর গুণাগুণ নিয়ে রয়েছে অতিরঞ্জিত প্রচারণা?

অপরাজিতা ফুল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিচিত উদ্ভিদ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণাতেও ফুলটির বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। প্রাথমিক কিছু গবেষণায় জারণরোধী কার্যকারিতা, রক্তে শর্করার পরিবর্তন, প্রদাহ এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মনে রাখতে হবে, অপরাজিতা চা কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়।

নীল রঙের পেছনে রয়েছে বিশেষ উপাদান
অপরাজিতা ফুলের আকর্ষণীয় নীল রঙের অন্যতম কারণ অ্যান্থোসায়ানিন। এটি উদ্ভিদে থাকা এক ধরনের প্রাকৃতিক রঞ্জক, যার জারণরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ফুলটিতে কুয়ারসেটিন, ক্যামফেরল ও মাইরিসেটিনের মতো আরও কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

নীল চায়ের বিশেষত্ব হলো, এতে লেবুর রস মেশালে রং বদলে বেগুনি কিংবা গোলাপি হয়ে যেতে পারে। লেবুর অম্লীয় উপাদানের প্রভাবে ফুলের রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসায় এমনটা ঘটে।

তবে শুধু রং কিংবা প্রাকৃতিক উপাদানের উপস্থিতি থেকেই কোনো পানীয়ের স্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মানুষের ওপর পরিচালিত নির্ভরযোগ্য গবেষণা।

শরীরের কোষের সুরক্ষায় কতটা কার্যকর?
শরীরে বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় অস্থিতিশীল অণু তৈরি হয়। এগুলো অতিরিক্ত জমলে কোষের ক্ষতি করতে পারে। এ ধরনের ক্ষতিকর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা জারণরোধী উপাদান।

২০১৮ সালে ১৫ জন সুস্থ পুরুষের ওপর পরিচালিত একটি ছোট গবেষণায় অপরাজিতা ফুলের নির্যাস পরীক্ষা করা হয়। এতে রক্তের জারণরোধী ক্ষমতার কয়েকটি সূচকে উন্নতির পাশাপাশি কোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সূচকে হ্রাস দেখা যায়।

গবেষণাটি আশাব্যঞ্জক হলেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং পরীক্ষার সময়কালও ছিল সীমিত। তাই নিয়মিত নীল চা পান করলে দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কি ভূমিকা আছে?
অপরাজিতা চায়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণার আরেকটি ক্ষেত্র হলো রক্তে শর্করার মাত্রা। ছোট একটি মানব গবেষণায় চিনি গ্রহণের সঙ্গে অপরাজিতা ফুলের নির্যাস নেওয়ার পর খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের বৃদ্ধিতে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।

তবে এই ফলকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। গবেষণাটি সীমিতসংখ্যক সুস্থ মানুষের ওপর করা হয়েছিল। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পানীয়টি কতটা কার্যকর বা নিরাপদ, তা জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের পরিবর্তে অপরাজিতা চা পান করা উচিত নয়।

প্রদাহ কমানোর সম্ভাবনা
শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থার একটি অংশ হলো প্রদাহ। আঘাত বা সংক্রমণের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

অপরাজিতা উদ্ভিদের নির্যাস নিয়ে প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় প্রদাহ কমানোর সম্ভাব্য প্রভাব দেখা গেছে। তবে প্রাণীর শরীরে পাওয়া ফল মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই অপরাজিতা চা বাত, সন্ধির ব্যথা কিংবা অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগ সারাতে পারে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

স্মৃতিশক্তি ও মানসিক প্রশান্তিতে উপকার?
লোকজ চিকিৎসায় অপরাজিতা ফুলের ব্যবহার নিয়ে স্মৃতিশক্তি, উদ্বেগ এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতার মতো বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে। ২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় উদ্ভিদটির প্রচলিত ব্যবহার ও এ-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়।

পরবর্তী কিছু পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণাতেও অপরাজিতার সম্ভাব্য স্নায়ুরক্ষাকারী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, মন শান্ত রাখা কিংবা উদ্বেগ কমানোর ক্ষেত্রে নীল চা কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিত করার মতো বড় পরিসরের গবেষণা এখনো সীমিত।

অর্থাৎ, সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে; কিন্তু একে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী?
অপরাজিতা ফুলে থাকা অ্যান্থোসায়ানিনসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার ক্ষেত্রেও গবেষণা হয়েছে। কিছু পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় রক্তের চর্বি, রক্তে শর্করা এবং জারণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে এসব ফল মানুষের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে প্রযোজ্য কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাই নীল চা হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করে বা হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখার নিশ্চয়তা দেয়—এমন দাবি করা যাবে না।

শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভেষজ পানীয়কে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করার উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়। অপরাজিতা চা নিয়েও এমন দাবি দেখা যায়। কিন্তু শরীর থেকে সব ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই চায়ের কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

মানবদেহে যকৃৎ ও বৃক্কসহ বিভিন্ন অঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই বর্জ্য ও বিপাকজাত পদার্থ অপসারণে কাজ করে। তাই শরীর পরিষ্কার করার অলৌকিক পানীয় হিসেবে নীল চাকে দেখার পরিবর্তে এর প্রাকৃতিক উপাদান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখা জরুরি।

চিনি ছাড়া পান করাই ভালো
অপরাজিতা ফুলের চা স্বাভাবিকভাবেই ক্যাফেইনমুক্ত ভেষজ পানীয় হিসেবে গ্রহণ করা যায়। ফলে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান এমন ব্যক্তিদের জন্য এটি একটি বিকল্প হতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি যোগ করলে পানীয়টির ক্যালরি বেড়ে যায়। তাই স্বাদ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিনি ছাড়া বা অল্প চিনি দিয়ে পান করা যেতে পারে। লেবুর রস যোগ করলে স্বাদের পাশাপাশি পানীয়টির রঙেও পরিবর্তন আসে।

যেকোনো ভেষজ পানীয়ের ক্ষেত্রেই ব্যক্তিভেদে সহনশীলতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ কোনো রোগ থাকলে, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করলে কিংবা গর্ভাবস্থায় এটি নিয়মিত বা ঘন নির্যাস আকারে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। অপরাজিতা চায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চমানের মানব গবেষণাও এখনো সীমিত।

সম্ভাবনা আছে, তবে প্রমাণের অপেক্ষা
নীল অপরাজিতা চায়ের আকর্ষণ শুধু এর দৃষ্টিনন্দন রঙে সীমাবদ্ধ নয়। এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক যৌগ বিজ্ঞানীদের আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রাথমিক গবেষণায় কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রমাণের বড় অংশই সীমিতসংখ্যক মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণা, পরীক্ষাগার কিংবা প্রাণীভিত্তিক পরীক্ষা থেকে এসেছে। তাই নীল চাকে অলৌকিক ওষুধ হিসেবে না দেখে ক্যাফেইনমুক্ত একটি ভেষজ পানীয় হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

কালের আলো/এসএ/জেএন

এক বছরে মৃত্যু ৫ হাজার, নাকি ৯ হাজার? সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যে বড় ফারাক

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৪১ অপরাহ্ণ
এক বছরে মৃত্যু ৫ হাজার, নাকি ৯ হাজার? সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যে বড় ফারাক

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, কতজন আহত হচ্ছেন—এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের ব্যবধান। কোনো সংস্থার হিসাবে এক বছরে নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজারের কিছু বেশি, আবার অন্য সংস্থার হিসাবে তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে নয় হাজার। তথ্যের এই অসামঞ্জস্যের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় সেন্ট্রাল ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা গেলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং প্রাণহানি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়।

এক বছরের দুর্ঘটনার হিসাবে বড় ব্যবধান
বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, একই বছরে ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।

আরেকটি পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৫৮৪টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই বছরের দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিসংখ্যানে এমন পার্থক্য সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নকে জটিল করে তুলছে।

২০২৪ সালেও মেলেনি মৃত্যুর হিসাব
২০২৪ সালের পরিসংখ্যানেও সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫ হাজার ৩৮০ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এ সংখ্যা ৮ হাজার ৫৪৩ জন। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ২৯৪ জন।

অর্থাৎ, একই বছরের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হিসাবেও সংস্থাভেদে কয়েক হাজার মানুষের ব্যবধান রয়েছে। দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, নথিভুক্তকরণ ও যাচাইয়ের পদ্ধতিতে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে এমন পার্থক্য তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবেও বড় পার্থক্য
দেশীয় সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাবেও বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে বড় ব্যবধান দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) *গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩* অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দেশীয় সরকারি হিসাবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক এ অনুমানের পার্থক্য দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও সমন্বয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও হিসাবের আওতা এক না হলে পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। তাই সড়ক নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র বুঝতে তথ্যের উৎস ও পদ্ধতি যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন প্রয়োজন জাতীয় সেন্ট্রাল ডাটাবেজ
যুব সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিসংখ্যানের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি। সেখানে প্রতিটি দুর্ঘটনার স্থান, সময়, ধরন, সংশ্লিষ্ট যানবাহন, সড়কের অবস্থা এবং নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণ করা হলে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ও ঝুঁকির কারণ শনাক্ত করা সহজ হবে।

এ ধরনের তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে কোন ধরনের সড়কে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কোন যানবাহন বেশি দুর্ঘটনায় জড়িত হচ্ছে এবং কোন পরিস্থিতিতে প্রাণহানি বাড়ছে—তা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তামূলক উদ্যোগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বিআরটিএ, পুলিশ ও হাসপাতালের তথ্য সমন্বয়ের প্রস্তাব
কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ কার্যকর করতে বিআরটিএ, পুলিশ, হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, দুর্ঘটনা নথিভুক্ত করার অভিন্ন মানদণ্ড প্রণয়ন এবং হতাহত ব্যক্তিদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই, বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচয় সুরক্ষিত রেখে নিয়মিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

জবাবদিহি ও কার্যকর পরিকল্পনায় গুরুত্ব
যুব সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের মতে, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা জানার মাধ্যম নয়; সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আহ্ছানিয়া মিশন ইয়ুথ ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িংয়ের সমন্বয়কারী মারজানা মুনতাহা, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের সদস্য মো. ইস্তিয়াক ইমন, মিশন গ্রিন বাংলাদেশের সদস্য মো. ইফরাত হোসাইন, স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয়কারী মো. আরমান হোসাইন রায়েদ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্ট সোসাইটির সদস্য নওশীন নাওয়ার আচল এ আহ্বান জানান। এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্ট সোসাইটি, লাল সবুজ সোসাইটি, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, আমরাই আগামী, ক্লাইমেট কানেক্টস ও বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে একটি কার্যকর জাতীয় সেন্ট্রাল ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমন্বিত, জবাবদিহিমূলক ও প্রমাণভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

গাজীপুরের গলার কাঁটা বিআরটি, এবার মহাসড়কে রূপান্তর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৯ অপরাহ্ণ
গাজীপুরের গলার কাঁটা বিআরটি, এবার মহাসড়কে রূপান্তর

১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলেছে, ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ যে বিশেষ বাস চালুর জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেই বাসই কখনো চালু হয়নি। উল্টো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথে যানজট ও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারের নতুন পরিকল্পনায় বিআরটি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে।

  • ১৪ বছরে ব্যয় ২৮১১ কোটি টাকা, চালু হয়নি বিশেষ বাস
  • স্টেশন-বিভাজক অপসারণ ও কোম্পানি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত
  • বিশেষ বাস আর চালুর পরিকল্পনা নেই; তিন থেকে ছয় লেনের মহাসড়ক ও চার লেনের উড়ালসড়ক নির্মাণে এগোবে সরকার

গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা পত্রে সভার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশও রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা অবকাঠামোকে কাজে লাগানো, সড়কের ব্যবহারযোগ্য জায়গা ফিরিয়ে আনা এবং যান চলাচল সহজ করার সুযোগ তৈরি করা।

বিশেষ বাসের পরিকল্পনা বাদ, সাধারণ মহাসড়কে গুরুত্ব
২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সমতল সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ। সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। যানজট ও ট্রাফিক সিগন্যাল এড়িয়ে দ্রুত যাত্রী পরিবহন করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। প্রকল্প চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী এই সেবা পাবেন বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজাবিশিষ্ট বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিন দফা সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

২০২৫ সালে চতুর্থবার প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প খুঁজে বের করা এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি বিকল্প বিবেচনা করা হয়েছিল। এগুলো হলো—প্রকল্প বাতিল করা, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিশেষ বাস চালু করা, বর্তমান অবকাঠামো রেখে বিশেষ ও বেসরকারি বাস চালানো এবং করিডরটি টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। শেষ পর্যন্ত প্রকল্প বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশেষ বাস চালুর জন্য আরও অর্থ ব্যয় ও পরিচালনাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিদ্যমান সড়ককে সাধারণ যানবাহনের উপযোগী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্টেশন ও বিভাজক সরিয়ে বাড়ানো হবে সড়কের ব্যবহারযোগ্যতা
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি বিআরটি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রী ওঠানামার জন্য কয়েকটি পদচারী-সেতুতে লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি বসানো হলেও সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের বিভাজক ও কিছু স্থানে লোহার বেড়া বসানো হয়েছে। এতে সাধারণ যানবাহনের চলাচলের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যান চলাচলে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কের বিন্যাস নতুনভাবে সাজানো হবে। এর ফলে সাধারণ যানবাহনের জন্য ব্যবহারযোগ্য জায়গা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।

স্টেশনগুলো অপসারণের পর লিফটসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি অন্য কোনো স্থানে ব্যবহার করা যায় কি না, তা বিবেচনা করছে সওজ। যন্ত্রপাতির অবস্থা, স্থানান্তরের ব্যয় ও পুনর্ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ব্যবহারযোগ্য সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব হবে। তবে শুধু লেন বাড়ালেই যানজট পুরোপুরি দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সড়কের বিভিন্ন অংশের সংযোগ, উড়ালসড়কের সক্ষমতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নির্মাণকাজ চলাকালে যানবাহন সচল রাখার ওপরও প্রকল্পের সুফল নির্ভর করবে।

নকশাগত ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতায় ব্যর্থ হয়েছিল প্রকল্প
বিআরটি প্রকল্পের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল বাসের দরজা ও স্টেশনের নকশার মধ্যে অসামঞ্জস্য। বাংলাদেশে প্রচলিত বাসের দরজা সাধারণত বাঁ দিকে থাকে। কিন্তু বিআরটি স্টেশনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে বাসের দরজা থাকতে হয় ডান দিকে। বিশ্বের অনেক বিআরটি ব্যবস্থায় ডান পাশের দরজাবিশিষ্ট বাস ব্যবহৃত হয়। কিন্তু গাজীপুরের জন্য এমন বাস চালু করলে সেগুলো করিডরের বাইরে বাংলাদেশের প্রচলিত সড়কে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারত না। ফলে আলাদা ধরনের বাস কেনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হতো।

এ ছাড়া বিআরটি বাস চালু হলেও গাজীপুরের যাত্রীদের বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে অন্য বাসে উঠতে হতো। ফলে পুরো যাত্রাপথে সরাসরি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন ছিল। প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দলও প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে। পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে দলটি গত বছরের অক্টোবরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যথাযথ কারিগরি যাচাইয়ের অভাব, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, জবাবদিহির দুর্বলতা, নকশাগত ত্রুটি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এ পরিস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের মূল্যায়নের সঙ্গে সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্তের মিল রয়েছে। এতে বোঝা যায়, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ধরে রাখার পরিবর্তে অবকাঠামোকে বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

গাজীপুরের জন্য বিকল্প গণপরিবহনও জরুরি
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক মনে করেন, বিআরটি প্রকল্পের সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে এটি বাতিল করাই সবচেয়ে ভালো। তবে ১৪ বছর ধরে গাজীপুরবাসীসহ এই পথে চলাচলকারী মানুষ যে দুর্ভোগ সহ্য করেছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প পরিবহন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিআরটি চালু হলেও গাজীপুরের যাত্রীদের বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে বাস বদল করতে হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি মনে করেন, প্রকল্পটি বাতিল করে সড়ককে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করা গেলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যবহারকারীরা সুবিধা পাবেন।

পাশাপাশি গাজীপুর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই রেলপথে তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে শুধু গাজীপুরের মানুষ নন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের যাত্রীরাও চলাচল করেন। তাই সড়কের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রেলভিত্তিক গণপরিবহনের সুযোগ তৈরি করা গেলে যাতায়াতের বিকল্প বাড়তে পারে।

তবে কমিউটার ট্রেন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সময়সূচি, পরিচালনাব্যবস্থা ও সড়কের সঙ্গে সংযোগ নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেনসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানিও হয়েছে। তাই প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের সময় সড়ক নিরাপত্তা ও জনদুর্ভোগ কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

কোম্পানি বিলুপ্তি, জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ
বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল তিনটি সরকারি সংস্থা—সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বাস পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়। বর্তমানে কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। বিশেষ বাস কেনা হয়নি বলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সীমিত ছিল। সরকার এখন কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম সওজের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শুরুর পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে থাকত। বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও আগে থেকে করা হয়নি। ব্যস্ত সড়কে নির্মাণকাজ চলার সময় যানবাহন সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।

বুয়েটের প্রতিবেদনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকাও পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। প্রকল্প বাতিলের পাশাপাশি এসব বিষয় যাচাই করা হলে ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা ও নকশাগত ত্রুটির কারণ নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা, কারিগরি যাচাই ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব।

এখন লক্ষ্য দ্রুত বাস্তবায়ন ও জনদুর্ভোগ কমানো
গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) অর্থায়ন করেছে। গ্লোবাল বিআরটি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং এসব ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় সোয়া তিন কোটি যাত্রী চলাচল করেন। ভারতের ১৩টি শহরে প্রায় ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করা হয়। চীন ও তাইওয়ানেও বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই ব্যবস্থা ব্যবহার করেন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, বিআরটি সফল করতে স্থানীয় সড়কব্যবস্থা, বাসের ধরন, স্টেশনের নকশা, যাত্রীদের গন্তব্য এবং অন্যান্য পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। গাজীপুর প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের অবকাঠামো পরিকল্পনায় এসব বিষয় শুরু থেকেই বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এখন সরকারের সামনে প্রধান কাজ হলো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্টেশন ও বিভাজক অপসারণ, মহাসড়কের নতুন বিন্যাস বাস্তবায়ন এবং উড়ালসড়ক সম্প্রসারণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি নির্মাণ ও অপসারণের সময় যান চলাচল সচল রাখা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতি কাজে লাগানো এবং প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে